ছোট গল্পের সন্ধানে || কলমে অয়ন


Best Bangla Books to Buy in 2024

#শ্বাসরুদ্ধ পুজোর কলকাতা#


আজ মহা ষষ্ঠী!! শেষ কয়েক বছর ধরে মহালয়ার পর থেকেই ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে পড়ছে সবাই। যাতে আনন্দ টা একটু বেশি সময় ধরে রাখতে পারে।

কলকাতায় যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যায় এই সময়ে। বাড়তি দায়িত্ব নেয় মেট্রো রেল। আজকাল তো মেট্রো স্টেশন অনুযায়ী পুজো পরিক্রমার গাইড বেরোয়। এবারে আবার অষ্টমীতে উদ্বোধন হবে ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রোর কিছুটা যাত্রাপথ। তাই পুলিশ প্রশাসনের ওপর চাপ কিছুটা বেশি।

এইমাত্র মিটিং করে বেরোলো সৌমিলি সেন। নরমাল ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের মিটিং, পুজোর চাপ, আচমকা কোনো টেররিস্ট অপারেশন হলে কি কর্তব্য সেসব নিয়েই জেনারেল মিটিং। এই মিটিং এ সুমির উপস্থিতি ইন্সপেক্টর, হোমিসাইড হিসাবেই। সাম্প্রতিক কেস গুলোর সাফল্য ওকে লালবাজারের অলিন্দে পরিচিতি দিয়েছে সহজে। ও ছাড়াও যদিও আরো কিছু বিচক্ষণ অফিসাররা ডাক পেয়েছে এখানে। এবার থানায় ফিরে সবাইকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে নিজের কাজকর্ম শেষ করতে থাকে সুমি, কাল থেকে ২ দিনের ছুটি নিয়েছে। এবার দেশের বাড়ি শ্রীরামপুরে যাওয়ার প্ল্যান করেছে ও।

একমাস আগে: তিন বন্ধু বসিরহাট সীমান্ত দিয়ে ঢুকে পড়ে পশ্চিমবঙ্গে। দায়িত্ব অনেক ওদের, এবারের পুজো সাকসেসফুল করতে হবে যে। ঠিকানা লেখা জায়গাতে পৌঁছতে কোনো অসুবিধা হলনা ওদের। কাল থেকে প্ল্যান অনুযায়ী কাজ শেষ করতে হবে, সময় কম।

ষষ্ঠীর দুপুর ২টা: তিনজন ছেলের দল ওদের শেষ ৫ দিনের কলকাতার আস্তানা ছেড়ে পা বাড়ালো নিজের নিজের গন্তব্যের উদ্দেশে।
ষষ্ঠীর সন্ধ্যা ৬টা: থানার বাইরেটা সেজে উঠেছে হরেকরকম আলোতে। একটা বছর ১৬-১৭র ছেলে গুটি গুটি পায়ে থানায় ঢুকে সাব ইন্সপেক্টর সুভাষের টেবিলে যায়। সব শুনে সুভাষ নিয়ে যায় ওকে ম্যাডামের কেবিনে।
"ম্যাডাম, একটু ব্যাপারটা শুনুন।"
"কি ব্যাপার? এই ছেলেটা কে?"
"বল তুই সব ম্যাডামকে, কোনো ভয় নেই।"
ছেলেটা বলল, "আমার নাম ছোটকা, একটা চা এর দোকান আছে গোপাল ব্যানার্জী লেনে। আজ দুপুর নাগাদ তিনজন ছেলে যারা উল্টোদিকের বাড়িটাতে থাকতো, বেরিয়ে যায়। প্রায় ঠিক সেইসময়েই ওদের ঘরের জানলা দিয়ে একটা কাগজ এসে পড়ে আমার দোকানের সামনে। আমি ওদের সেই মাত্র লক্ষ্য করেছিলাম বলে চিৎকার করে ডাকি, কিন্তু আমার ডাকের আগেই ওরা ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়ে যায়। তারপর কাগজ টা খুলে দেখি আমি। রেল লাইনের রুট ম্যাপ, কিছু জায়গা কালো করে দাগ কাটা। পিছনে কিছু হিজিবিজি, হঠাৎ কাহানি সিনেমাটার কথা মনে পড়ে যায় আমার। ভাবলাম, গিয়েই দেখি থানায়।" দম নিয়ে একটু জল চায় ছেলেটা।
এবার সুমি বলে ওঠে, "কিন্তু তুমি যে এটা নিজে করে এখানে মস্করা করতে আনোনি, কেমন করে বুঝবো সেটা?"
একটু থমকে যায় ছেলেটা। "ম্যাডাম, আপনাদের যা খুশি ভাবতে পারেন, এই জন্যই শালা কারোর ভালো করতে নেই আজকাল।" বেরিয়ে যায় সে।
ছেলেটার পিছনে পাঠাও কাউকে সুভাষ, আর বাড়িটা দেখে এসে রিপোর্ট দাও আমায়। ততক্ষনে সুমি একবার লালবাজারে আপডেট নেয় কোনো নতুন ইনফরমেশন এসেছে কিনা। কিছু না থাকায় ও আপাতত কিছু জানায় না ওখানে। আসলে নিজে কনফার্ম না হলে জানাবে না কাউকে।
একটু পরে সুভাষ জানায়, ঘরে সন্দেহজনক কিছুই নেই, কিন্তু অতিরিক্ত পরিষ্কার তিনজন পুরুষের ঘরের তুলনায়। চায়ের দোকানের ছেলেটাকে নিয়ে এসে তিনজনের স্কেচ বানাতে বলে। আর লালবাজারে আপডেট দিয়ে ফ্যাক্স করে দিতে বলে।
একটু খচ খচ করতে থাকে সুমির মনটা। ম্যাপটা কোথাকার, আদপেও কি কোনো রহস্য আছে, নাকি অযথা চিন্তা করে পুজোর ছুটির দফারফা করছে সে।
হাওড়া শিয়ালদহ ট্রেনের আর মেট্রোর রুট দেখে ওই কাগজের মিল খোঁজার চেষ্টা করে, কিন্তু কিছুই মেলেনা। হঠাৎ মনে পড়ে নতুন রুট টার কথা, কিন্তু কোনো ম্যাপ পায়না ওদের ডেটাবেস এ। ফোন লাগায় মি: দত্ত কে, যিনি আজকের সকালের মিটিং টার হোস্ট ছিলেন ফ্রম ক্রাইম ব্রাঞ্চ। উনি জানান কিছুক্ষনের মধ্যেই পাঠাচ্ছেন।
একটু ব্রেক নিয়ে টেবিল থেকে উঠে পড়ে, মা কে ফোন লাগায়। একটু পরে মি: দত্ত পাঠানো ম্যাপ দেখে মেলানোর চেষ্টা করে, কাগজের সাথে হুবহু মিলে যায় দুটো পয়েন্ট। সেক্টর ৫ আর শিয়ালদহ স্টেশন। যার মধ্যেই চালু হতে চলেছে ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রোর আপাত রুট।
সুমি ইনফর্ম করে লালবাজারে, আর সুভাসকে ফোর্স নিয়ে চলে যেতে বলে ওই রুটের প্রতিটি স্টেশনে। নতুন রুটের মধ্যে হামলা হলে সবচেয়ে ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে শিয়ালদহ র। সব কিছুর পরেও কোনোমতেই কোনো সন্দেহজনক কিছুই পাওয়া যায় না কোনো স্টেশন থেকেই। কবে কোথায় কি হতে যাচ্ছে, সব কিছু ই অজানা।রাত পোহালেই সপ্তমী, ঘুম নেই সুমির। যে করেই হোক আটকাতেই হবে সম্ভাব্য বিপদ।
ভোর থেকেই কলা বৌ স্নান করানোর ভিড়। ৯টায় মিটিং ডেকেছেন লালবাজারে, থাকবে মেট্রো রেল ও শিয়ালদহ ডিভিশনের ম্যানেজাররা। থাকবেন মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয়। ইতিমধ্যে সমস্ত থানায় পাঠানো হয়েছে তিনজনের ছবি, কিন্তু কোথাও থেকে কোনো আপডেট নেই। লালবাজারের বক্তব্য এই ঘটনার নিষ্পত্তির আগে নতুন রুটের উদ্বোধন না করার, কিন্তু বাকিরা চায় না আর দেরি হোক। দরকার হলে রুট কমিয়ে ফুলবাগানে শেষ করা যাবে যাত্রাপথ।
এ টি এস টিম আসতে চলেছে, সৌমিলী ছাড়াও ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের সুমন আছে ওদের সাহায্য করতে।
ইতিমধ্যে খবর আসে বসিরহাট থানা থেকে, একজন লোকাল লোক এদের মধ্যে একজনকে সপ্তাহ খানেক আগে দেখেছে। টিম চলে যায় ওদিকে আরো ইনফরমেশন পেতে।
সুমি ইন্টারনেট থেকে জানতে চেষ্টা করে আগামী ক দিন এই মেট্রো রুটের আশপাশে পুজো ছাড়াও কোনো বড়ো ইভেন্ট আছে কিনা।
দেখে সিটি সেন্টারের কাছে একটা বিখ্যাত গায়িকার পারফরম্যান্স আছে কাল, শেষ হবে ৯টা নাগাদ। আর অষ্টমীর দিন আছে সল্টলেক স্টেডিয়ামে মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গলের সুপার কাপের ফাইনাল ম্যাচ। শেষ ৭টা নাগাদ। যদি শিয়ালদহ টার্গেট না হয়, তাহলে এই দুটো সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে ভিড় বেশি হবে বলে।
ইতিমধ্যে বসিরহাট অঞ্চলে খোঁজ পাওয়া যায় সেই ঠিকানার যেখানে আস্তানা গেরেছিল এরা। ঘর তল্লাশি চালিয়ে পাওয়া যায় কিছু সিভিল ইঞ্জিনীরিংয়ের সরঞ্জাম।
পুরো এলাকার ভূগর্ভের ম্যাপ নিয়ে বসে গোটা টিম। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ আর পি ডব্লিউ ডি র আধিকারিকের ডাক পড়ে। ওনারা জানান, মাটির নিচে যে সুয়েজিং সিস্টেম আছে, সেটা প্রায় এই মেট্রোর রুট ই ফলো করেছে। সৌমীলি বলে, এলাকার সব জায়গার আন্ডারগ্রাউন্ড চেক পয়েন্ট ভেরিফাই করতে। টিম ওই অঞ্চলে পৌঁছে যায়। কিন্তু এত বড় এলাকা খুঁজতে রাত কেটে যায়, ভোরের দিকে আশার সঞ্চার করে বেঙ্গল কেমিক্যলস এর কাছের টিম। একজনকে গ্রেফতার করেছে তারা সন্দেহজনক ভাবে ঘোরাঘুরি করার জন্য। ওই এলাকা চষে বেড়িয়ে পাওয়া যায় একটা নতুন খোঁড়া সুড়ঙ্গ। যেটার একটা কানেক্ট করে আছে বেঙ্গল কেমিক্যালসের ফ্যাক্টরি, আর একটা ফুলবাগান মেট্রো স্টেশন। সুমির টিম যায় ওই লোকেশনে।
ইতিমধ্যে বেজে গেছে প্রায় দুপুর ১২টা। অষ্টমীর অঞ্জলী দিয়ে দিকে দিকে ভিড় বাড়ছে হুড়মুড় করে। বিকেল ৫টায় অনুষ্ঠিত হবে ফুলবাগান স্টেশন থেকে মেট্রোর উদ্বোধন। কিছুটা সচেতন হতে শিয়ালদহ থেকে সরানো হয়েছে অনুষ্ঠান। হাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা।
গ্রেপ্তার হওয়া ছেলেটাকে অনেক জেরা করেও কিছুই বের করা যায় না, সে শুধু ওখানে পাহারার কাজে নিযুক্ত ছিল মোটা টাকার বিনিময়ে।
সৌমীলী আর সুমনের টিম দুটো ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় সুড়ঙ্গের দু দিকে। সুমি রা বেঙ্গল কেমিক্যালসের দিকে আর সুমনের দল স্টেশনের দিকে। ফ্যাক্টরির মধ্যে সুড়ঙ্গ টা শেষ হয়েছে একটা পরিত্যক্ত ব্লাস্ট ফার্নেসের কাছে। ওখানকার কর্মচারীদের কাছ থেকেও কোনো আশার আলো দেখতে পায় না ওরা। হঠাৎ সুমি খেয়াল করে সুড়ঙ্গের মাথার দিকে একটা আউটলেট আছে কিন্তু হাত ঢুকিয়ে পরিত্যক্ত মনে হয়। ও জানতে চায়, ওটার বাইরের দিক দিয়ে কোনো যোগাযোগ আছে কিনা। শোনা যায় অনেকদিন আগে ফার্ণেসের বর্জ্য পদার্থ ওই পথে বেরোত। কিন্তু নতুন নিয়মের পর এটা আর ইউজ করা হয় না।
সুমি জানতে চায়, কোনোভাবে কি ওটা আবার ইউজ করা সম্ভব? ওখানকার কর্মচারীরা জানায়, একমাত্র ল্যাব হেড ই বলতে পারবেন, কিন্তু উনি বোধহয় ছুটিতে আছেন। সুমির মনের খচখচানি দুর করতে অ্যাটেনডেন্স রেজিস্টার চেক করতে বলে। অনুমান নির্ভুল, দেখা যায় উনি ছুটিতে থাকলেও রাতের দিকে শেষ ৪-৫ দিন ওনার কার্ড ইউজ হয়েছে। কিছু একটা গন্ডগোল এখানেই আছে। লালবাজার কে আপডেট করে আর প্রপার টিম সেন্ড করতে বলে। অন্যদিকে সুভাষ কে বলে চলে যেতে ল্যাব হেড এর বাড়ি।
কিছুক্ষনের মধ্যেই এসে যায় লালবাজারের কেমিক্যাল অ্যান্ড রেডায়োলজি টিম। ওরা কিছুক্ষনের মধ্যেই বুঝতে পারে, ফ্যাক্টরির বর্জ্য নির্গমের পথ ঘুরিয়ে ফেলা হয়েছে ওই সুড়ঙ্গের মধ্যে, যা কাজ করতেও শুরু করে দিয়েছে ঠিক ৪ টে। যা কিছুক্ষনের মধ্যেই ভরিয়ে দেবে দূষিত গ্যাস এ। যা গ্রাস করে নেবে শহরের অধিকাংশ মানুষকে। সুমি জানতে চায়, এটা থামানোর রাস্তা কি? ওদের টিম চেষ্টা করতে থাকে আবার প্রপার চ্যানেলে দূষিত গ্যাসকে এনে ফেলার।
ওদিকে এ টি এস টিম আটকে রাখে ফুলবাগান স্টেশনে ঢোকার রাস্তা।
ল্যাব হেডের খোঁজ পাওয়া যায় বাড়িতে দড়ি বেঁধে রাখা অবস্থায়। ওনার সাহায্যেই জানা যায় আবার প্রপার চ্যানেলে দূষিত গ্যাস আনার প্রক্রিয়া। ফোনে টিম কে গাইড করে কাজ সম্পূর্ণ করেন তিনি।
হাঁফ ছেড়ে বাঁচল পুরো টিম। কিন্তু ওই তিনজন থেকে যায় অধরাই, হয়তো আবার কোনো বিপদ ঘটানোর চেষ্টা করবে তারা। কিন্তু এবারের মত বিপন্মুক্ত হয় দুর্গাপুজোর কলকাতা।
©Ayan
Share:

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মোট পৃষ্ঠাদর্শন

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Blogger দ্বারা পরিচালিত.