কথায় বলে বাঙালির পায়ের তলায় সর্ষে। কিন্তু এই বিগত দেড় বছরের করোনা
পরিস্তিতিতে সবার মত তারাও হয়ে পড়েছিল ঘরবন্দি। তাই এখন একটু পরিস্তিতি ঠিক হতেই
সবাই আবার বেড়িয়ে পড়েছে কাছে পিঠে। সেই রকমই একটা উইকএন্ড ডেসটিনেশনের কথা বলব এই
পর্বে।
পুজোর ঠিক আগেই হঠাৎ ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান হল আমার বেশিরভাগ ট্যুরের সাথী
বন্ধুর পরিবারের সঙ্গে। জায়গাটা নির্বাচন ছিল আগেই, অনেকের ঘোরার ছবি দেখে একটা
আকর্ষণ ছিলই। কিন্তু রুম বুকিং করতে গিয়ে বিভিন্ন হোটেলে ফোন করতে গিয়ে বুঝলাম
আমরা অনেক লেট করে ফেলেছি। তবুও, আশা না ছেড়ে চেষ্টা করতে থাকি দুজনেই। ফল ও পাওয়া
গেল হাতেনাতে। একটা রিসর্ট পাওয়া গেল, যদিও পুজোর উইক বলে একটু বাজেট বেড়ে গেল রুম
রেন্টে, কিন্তু পড়ে পাওয়া দুই খানা রুম হাতছাড়া করতে মন করল না কারোরই। অনেকদিন পর
ঘুরতে যাওয়ার উত্তেজনায় তখন ছটপট করছি আমরা।
কিন্তু বিধি বাম, যাওয়ার এক সপ্তাহ আগে বন্ধু হয়ে পড়ল অসুস্থ। তাই, ঠিক করলাম
ক্যানসেলই করে দেব। প্রসঙ্গত বলে রাখি, এই রিসর্টেই মার্চে একবার যাওয়ার প্ল্যান
হয়েছিল, কিন্তু সেটাও বুকিং এর পর ভিন্ন কারণে বানচাল হয়। তাই, বাড়ির লোকের মনে এই
চিন্তা এল, এটায় বোধহয় বাঁধা আছে, হবে না আর যাওয়া এখন। তখনই ঠিক করলাম, যাবই
তাহলে।
গন্তব্য ঝাড়গ্রাম, হাওড়া থেকে প্রায় ৩ ঘণ্টার মানে ১৫০ কিলোমিটারের জার্নি,
কলকাতা থেকে আরও আধ ঘণ্টা বেশি। সকাল ৭ টায় যাত্রা শুরু করলাম তিনজনে, সঙ্গী
আমাদের ড্রাইভার দাদা। মনের মধ্যে একটা বিসন্নতা ছিল বন্ধু না যাওয়ার জন্য, কিন্তু
ধীরে ধীরে ষষ্ঠীর সকাল সেই ক্লান্তি দূর করে দিল।
ধীরে ধীরে ইট কাঠের বেড়াজাল ফেলে এগিয়ে চললাম আমরা। মাঝে কোলাঘাটের কাছে গাড়ি
দাঁড় করিয়ে ব্রেকফাস্ট করে নিলাম, সঙ্গে ভাঁড়ের চা। এখানে বলে রাখি, এই এলাকায়
পাবেন একাধিক সস্তা থেকে মাঝারি ধরনের রেস্তোরাঁ। যেকোনো একটি তে সেরে ফেলতে পারেন
পেটের ফুয়েল। পথে পড়বে ৩ টে টোল ট্যাক্স। প্রথমটা ধুলাগড়, পড়বে ১১০ টাকা (ওয়ান
ওয়ে), তারপর ডেবরা পড়বে ৬৫ টাকা (ওয়ান ওয়ে), আর লোধাশুলি ঢোকার একটু আগে আর একটা
টোল ট্যাক্স পড়বে ৭০ টাকা (ওয়ান ওয়ে)। যেহেতু ১ রাত্রি ২ দিনের ট্রিপ করলে সব
দেখতে পাবেন না, তাই রিটার্ন টোল ট্যাক্সের সুবিধা পাবেন না। ফেরার সময়ও সেম ফেয়ার
দিতে হবে।
লোধাশুলি মোড় থেকে ডানদিকে ঢুকলেই একরাশ প্রকৃতি ঝাঁপিয়ে পড়বে সামনে। দুপাশের
ঘন শালবন, তার মাঝ দিয়ে পথ গিয়েছে এঁকে বেঁকে। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, লোধাশুলি
মোড়ের ফ্লাইওভার টা ধরবেন না, নিচের আন্ডারপাস দিয়ে ডানদিকে যেতে হবে। গুগুল বাবা
এখানে ধোকা দিতে পারে আপনাকে। আমরা যে রিসর্টে ছিলাম, সেটা পেরিয়ে ঢুকতে হবে
ঝাড়গ্রাম শহরে। ঘড়িতে দেখলাম ১০.৩০ টা বেজেছে। আর হোটেলের চেক-ইন টাইম ১১.৩০ টা।
তাই হোটেল মুখো না হয়ে পাড়ি দিলাম প্রথম স্পটের দিকে।
গন্তব্য সাবিত্রি মন্দির। এটা প্রায় ৩৫০ বছর পুরনো। রয়েছে পাথরের দেবী
সাবিত্রির মূর্তি। এই মন্দির চত্বরেই চলছিল দুর্গা পুজো। তাই এটাও একটা উপরি
পাওনা। মন্দিরের মধ্যে বেশ কিছু সুন্দর ছবিও তোলা হল। তারপর আবার যাওয়া হল পরের
গন্তব্যে।
এবার পৌঁছলাম ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি। সত্যি বলতে যেরকম মনে মনে কল্পনা করেছিলাম তার
খুব একটা মিল পেলাম না। প্রথমত, যদি আপনি ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্যুরিজমের ঝাড়গ্রাম
রাজবাড়ি থাকার জন্য বুক না করে থাকেন, তাহলে এখন আর ভিতরে প্রবেশ করতে দেয় না। মেইন
গেটের বাইরে থেকেই ছবি তুলে ফিরত আসতে হবে আপনাকে। যদিও ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি টুরিস্ট
কমপ্লেক্সও বেশ ভালোই শুনেছি। বিশদ পাবেন আমার ইউটিউব চ্যানেলের এর ভিডিওর (দেখুন পর্ব ১)
ডেসক্রিপশনে। এদিক ওদিকে কিছু ফ্রেম বন্দি করে ঘড়িতে দেখি ১১.৩০ বাজতে চলেছে। রওনা
দিই রিসর্টের দিকে। আসার পথে ওই দুপাশের শালের জঙ্গলের মধ্যের রাস্তায় ফটোস্যুটও
চলল কিছুক্ষণ।
একটু পরেই আমরা পৌঁছলাম আরণ্যক রিসর্টে। বেশ অনেকটা জায়গা নিয়ে লাস্ট ইয়ারেই
তৈরি হয়েছে এটা। আর এই মনোরম পরিবেশের জন্য খুব তাড়াতাড়ি পরিচিতি পেয়েছে এরা। গাড়ি
পার্ক করার ও সুবন্দোবস্ত আছে এখানে। ড্রাইভারের রুমও অ্যাভেলেবেল ৫০০ টাকায়। খুব
তাড়াতাড়ি দিয়ে দিল আমাদের গ্রাউন্ড ফ্লোরের রুম। সামনেই পুল, চারদিক খুব সুন্দর
করে সাজানো। ঘরে গিয়ে স্নান করে ফ্রেশ হয়েই সবাই মিলে গেলাম লাঞ্চ করতে। মাঝে এসেই
একবার অর্ডারটা করে গিয়েছিলাম। খাওয়ার জায়গাটা ছোট হলেও বেশ গোছানো।
খাওয়ার পরেই প্রায় ২.৩০ টে নাগাদ আবার বেড়িয়ে পড়লাম। প্রথমে গেলাম চিল্কিগড়
রাজবাড়ি দেখতে। এটা প্রায় ২২-২৩ কিলোমিটার দূর। পৌঁছতে সময় লাগলো প্রায় ৪০ মিনিট।
কিন্তু এই ভগ্নপ্রায় রাজবাড়ি দেখেও নিরাশ হতে হল। এই বাড়ির একদিক এখনো মেইনটেন হয়,
যেদিকে গভর্নমেন্টের একটা অফিস আছে। সেদিকে টুরিস্ট নট অ্যালাওড। অন্যদিকে পুরনো
মন্দির। সামনে একটা বিরাট মাঠ, আশপাশের বাচ্ছারা খেলে বেড়াচ্ছে সেখানে।
কিছুটা সময় এখানে কাটিয়ে গেলাম কনক দুর্গা মন্দির দেখতে। চিল্কিগড় থেকে মিনিট
দশেকের পথ। এখানে গাড়ি পার্কিং এর আলাদা ফি আছে। গাড়ি রেখে একটা সুন্দর দুপাশে
গাছে মোড়া পথ দিয়ে যেতে হয় মন্দির প্রাঙ্গনে। দুদিকে অনেক ভেষজ গাছগাছালি, তার
মাঝে অনেক হনুমানও বসে থাকে ওখানে। তাই খাবার, মোবাইল, ক্যামেরা একটু সাবধানে নিয়ে
যাবেন। পুরনো মন্দিরটি ভগ্নপ্রায় যা তৈরি হয়েছিল প্রায় ৫০০ বছর আগে। সামনেই তৈরি
হয়েছে নতুন মন্দির, রয়েছে পুজো দেওয়ার ব্যবস্থাও। কনক মানে সোনার তৈরি মূর্তি যা
এখানকার বিশেষত্ব, উচ্চতা মাত্র ২ ফুট মত। একটা শান্ত ভাব আছে চারদিকে। মন্দির
চত্বরে কিন্তু অনেক হনুমান আছে, তাই নিজের ব্যাগ ও জিনিসপত্র সাবধানে নিয়ে যাবেন।
মন্দিরের পিছনের দিক দিয়েই চলে যাওয়া যায় কিছুটা নিচের দিকে। সিঁড়ি করা, ধাপে
ধাপে পা ফেলে পৌঁছে যাওয়া হল ডুলুং নদীর পাড়ে। প্রায় সূর্যাস্তের সময় পড়ন্ত রোদে
শোভা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। এসব দৃশ্য ফ্রেম বন্দি করে এবার ফেরার পালা। আজকের দিনের
এই স্পট টাই ম্যান অফ দ্য ম্যাচ। এর, এদিকে ফেরার পথে গিন্নির পাদুকা দেহ রেখেছিল,
তাই পরের গন্তব্য ম্যাপে সেট করতেই হল স্যু শপ, ভাগ্যক্রমে কাছেপিঠেই পাওয়া গেল
তার সন্ধান।
রিসর্টের ঘরে ফিরে ফ্রেশ হয়ে একটু স্ন্যাক্সের ব্যবস্থা করা হল। বাইরের লনে
একটু বসা হলেও মশার উপদ্রবে বেশিক্ষণ টেঁকা গেল না। জানা গেল, এরা রাত ৮ টার
মধ্যেই ডিনারের অর্ডার নিয়ে নেয়। রাতে রুমেই খাবার আনিয়ে নেওয়া হল। প্রথম দিন টা ঝুপ
করে কেটে গেল। দিনের বেলার গরমটা কখন যেন কেটে গিয়ে বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা আবহাওয়া হয়ে
গেছে।
সপ্তমীর সকাল, দ্বিতীয় দিনের সূচনা হল অ্যালার্মের ডাকে। দরজার বাইরেই সুন্দর
সকাল অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য। ঘরে রাখা চায়ের সরঞ্জাম দিয়ে চা তৈরি করে
তাড়াতাড়ি রেডি হওয়া হয় সেদিনের ট্রিপের জন্য। আর হ্যাঁ, এদের আর একটা স্পেশালিটি
সব ইউটেন্সিলে নিজেদের লোগো লাগানো, বেশ সুন্দর দেখতে সেই লোগো টাও। ডিটেইলস পাবেন
আমার ইউটিউব চ্যানেলে (দেখুন চ্যানেলের লিঙ্ক)
আমরা নিয়েছিলাম পুজো স্পেশাল প্যাকেজ, থাকা ছাড়া চার বারের ফুল খাওয়া দাওয়া
সমেত ব্যবস্থা। সেদিন যেহেতু অনেকটা সময় বেলপাহাড়ির দিকে যাবে আর ফিরতে দেরী হবে,
আগে থেকে জানিয়ে রাখলাম হোটেলের ম্যানেজারকে। খুবই সহযোগিতার সাথে জানালেন তিনি,
ফেরার এক ঘণ্টা আগে জানিয়ে দিতে আর দুপুর সাড়ে তিনতে পর্যন্ত খাওয়ার আয়োজন থাকবে।
ব্রেকফাস্টে লুচি, আলুরদম, পোহা, ব্রেড টোস্ট, এগ, জ্যুস ইত্যাদির সাথে ছিল
বেশ সুন্দর গোলাপজাম। খেতেও বেশ। পেট পুরে টিফিন করে ৮.৩০ নাগাদ বেরনো হল
বেলপাহাড়ির পথে। রিসর্ট থেকে প্রথম যাচ্ছি আমরা ঘাগরা জলপ্রপাত দেখতে। দুটো রাস্তা
আছে যাওয়ার, সময় আর ডিসটেন্স প্রায় একই, ৫৫ কিলোমিটার। আমরা নিলাম এস এইচ ৫ যাতে
রাস্তাটা ভালো পাওয়া যায়। কিছুটা এগুলোই দেখা গেল চোখ জুড়োনো সৌন্দর্যের মধ্যে
দিয়ে রাস্তা গেছে, দুপাশে ক্ষেত আর মাঝে মাঝে কাশফুলের বন। শহুরে আবর্জনার লেশ
মাত্র নেই এখানে। বেলপাহাড়ি পৌঁছতে লাগলো প্রায় এক ঘণ্টা। এবার সেখান থেকে ডানদিক
দিকে যেতে হবে ঘাগরার দিকে। এই দিকের রাস্তা কিন্তুটা রুক্ষ, ধুলো বালির মেঠো
রাস্তাও রয়েছে কিছুটা। অবশেষে পৌঁছলাম গন্তব্যে। নেমেই দেখি একজন জাওয়ান এসে
আমাদের নাম ধাম, গাড়ির ডিটেইলস নিয়ে গেল। বুঝলাম, জঙ্গলমহল এখন শান্ত হলেও
প্রশাসনের নজর রয়েছে চারদিকেই। একটু এগোতেই দেখলাম একদল স্নানের পোশাকে নেমে
যাচ্ছে ঝরনার নিচের দিকে যেটা প্রায় সরু নদীর মত, দেখা যায় গাড়ি পার্কিং এর জায়গা
থেকেই। বাম দিক দিয়ে একটু উঠতেই দেখি ভীষণ সুন্দর মন ভরানো ঘাগরা। জঙ্গলের মধ্যে
থেকে বেড়িয়ে এসেছে তারাফেনি নদী, পাথরের খাঁজ দিয়ে তীব্র গতিতে চলে যাচ্ছে জল।
পুরো জায়গাটাই পাথুরে, যেতে হবে পাথরের ওপর ভর করেই, মাঝে মাঝে বিশাল বিশাল গর্ত।
তাই বয়স্ক বা বাচ্ছা নিয়ে গেলে একটু সাবধানে উঠবেন এদিকে। এখানে অনেক ফটো তোলা হল।
আমাদের ড্রাইভার দাদাও বেশ এঞ্জয় করেছিল, বলছিল এটাতেই গতকাল এলে পারতেন ওই ভাঙ্গা
রাজবাড়ি না দেখে।
তো যাইহোক, পরের গন্তব্য তারাফেনি ড্যাম। ঘাগরা থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটারের
মধ্যেই তারাফেনি ড্যাম। দুপাশে সাজানো রেলিং দেওয়া রাস্তা। প্রায় দশটা লক গেট আছে
এখানে। বেশ কয়েকটা খোলা ছিল তখন। এই নদীর জলের কালার টা একটু ভিন্ন। একটু দূর থেকে
নদী ও ড্যাম টা দেখতে লাগছিল বেশ। সুন্দর ফটোজেনিক ভিউ আছে এখানে, সুন্দর মেমরি
সাথে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম পরের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। আর হ্যাঁ, এখানেও আমাদের সব
ডিটেইলস নথিবদ্ধ হল।
প্রসঙ্গত বলে রাখি খুব একটা দিক নির্দেশের সাইন বোর্ড চোখে পড়েনি এদিকে। তাই,
গুগুল ম্যাপের ভরসাতেই যাত্রা করতে হচ্ছিল। তাই মোবাইল টা ফুল চার্জ দিয়েই বেরোবেন
সকালে। আসলে এই অঞ্চল কিছুদিন হল পর্যটকের মুখ দেখছে, তাই আশা রাখি কিছুদিন পরে
নিশ্চয়ই এদিকে নজর দেবে ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্যুরিজম। এরপর যাচ্ছি খান্দারানি লেক,
দূরত্ব তারাফেনি থেকে প্রায় পনেরো কিলোমিটার। জায়গাটা আমলাশোল, শেষের দিকের কিছুটা
রাস্তা বেশ খারাপ এখানে। তাই পৌঁছতে সময় লাগলো একটু বেশি। কিন্তু নেমেই দেখি কি
অপূর্ব দৃশ্য। সামনে পাহাড়, চারদিকে জঙ্গল আর মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে নদী। তার ওপরে
রয়েছে ড্যাম। ড্যামের ওপরের ব্রিজটায় দাঁড়িয়ে সামনে তাকালে মনে হয় যেন রাস্তা টা
গিয়ে মিশেছে ওই পাহাড়ের নিচের জঙ্গলে। ততক্ষণে সূর্য প্রায় মধ্য গগনে। এখান থেকে
এবার পাড়ি দেওয়ার পালা পরের গন্তব্যে।
যাচ্ছি আমরা হুদহুদি জলপ্রপাত দেখতে। একে লোকাল লোকেরা ধাঙ্গিকুসুম জলপ্রপাতও
বলে। যথারীতি গুগুল ম্যাপে লোকেশান দিয়ে কিছুদুর এগিয়ে দেখছি রাস্তা ক্রমস্যই সরু
হতে থাকছে। আশেপাশে লোকজনের দেখা নেই তেমন। কিছুদূর গিয়ে স্থানীয় লোকেদের থেকে
জানলাম আছে একটা ঝরনা, কিন্তু লোকাল ভাষায় কেউই তাকে হুদহুদি বা ধাঙ্গিকুসুম নামে বলছে
না, শুধুই বলে আছে আগে একটা ঝরনা। বেশ কিছু টা আরও এগোতে থাকলাম জঙ্গলের মধ্যে
দিয়েই, রাস্তা আরও সরু হয়েছে, ড্রাইভার দাদার ভরসায় কিছুটা এগিয়ে একটা চায়ের দোকান
পেলাম। সেখানে জনৈক একজন জানাল, সামনের রাস্তা বাইক গেলেও গাড়ি যাওয়ার জন্য
উপযুক্ত নয়। তবুও আর একটু এগোতে থাকলাম গুগুলের ভরসায়। মধ্য দুপুরের ঘন জঙ্গলেও
একটা গা ছমছম ভাব আসতে থাকল। চারদিকে কেউ নেই, শুধু সরু রাস্তা দিয়ে গাড়িটা
যাচ্ছে, ইতিমধ্যে এতটাই সরু হয়ে গেছে যে, গাড়ির জানলা দিয়ে দুপাশের গাছ ও ঢুকে
যাচ্ছে মাঝে মধ্যে। এবার মোবাইল নেটওয়ার্কও দেহ রাখল। আর ভরসা পাওয়া গেল না
এগোনোর। গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে চললাম বেলপাহাড়ির দিকে। আবার মোবাইলে ইন্টারনেট
কানেক্টিভিটি আসতে বুঝলাম গুগুল বাবা ওনার টেকনলজি দিয়ে দ্রুততম রাস্তা দেখাতে
গিয়ে এই কেচ্ছাটা করেছেন। আপনাদের জন্য দেওয়া রইল ম্যাপের লিঙ্ক ও ছবি আমার ইউটিউব
চ্যানেলে (দেখুন ভিডিও)। যাতে আপনাদের একই ভোগান্তি না হয়।
এবার বেলপাহাড়ি হয়ে গেলাম হুদহুদির দিকে। এই রাস্তাটা খান্দারানি লেক থেকে
বেলপাহাড়ি মোরে আসার ঠিক আগেই যে ডানদিকের রাস্তা টা ঢুকছে, সেটা ধরতে হবে। দূরত্ব
প্রায় ২৫ কিলোমিটার, কিন্তু সময় লাগলো পাক্কা একঘণ্টা। প্রায় দুটোর সময় পৌঁছলাম
ওখানে, আর একটা নাম ও আছে ধাঙ্গিকুসুম ভিউ পয়েন্ট। এরপর পাথুরে সরু হাঁটা পথ ধরে
ফাইনালি এসে পড়লাম ফল্সে। মাঝে হেঁটে আসার পথে পড়েছে একটা নদীর স্রোত। পাথর
বিছানো রাস্তা পেরিয়ে নামতে হয়েছে নিচে প্রায় এক কিলোমিটার মত। ওখানে গিয়ে ঝরনার
পাড়ে অনেক ছবি তোলা হল। তারপর ওপরে ওঠার সময়ে পেটে ছুঁচো ডাকতে শুরু করে দিয়েছে।
অনেকে বেলপাহাড়িতে লাঞ্চ করে আবার বাকিটা দেখে। আর কিছু জায়গা আছে যা আপনারা
চাইলে যেতে পারেন যদি সময় থাকে। যেমন, কাঁকরাঝোড় জঙ্গল, লালজল কেভ, গাড্রাসিনি
হিল। বলে রাখা ভালো, গাড্রাসিনি হিলে উঠতে সময় লাগবে ৪০ মিনিট মত। সঙ্গে বাচ্ছা বা
বয়স্ক থাকলে না যাওয়াই ভালো। কিন্তু সময় আরও একদিন থাকলে যেতে পারেন এই স্থান গুলো।
আর আমাদের মতই ঘুরতে হলে সাথে রাখুন জল আর শুকনো খাবার।
ম্যানেজারের কথা মত করে দিয়েছিলাম ফোন ফেরার একঘণ্টা আগেই। প্রায় চারটের দিকে
রিসর্টে ফিরে একটু ফ্রেশ হয়েই যাই ওদের কনফেরেন্স হলে। ওখানেই এদের আজ থেকে সব
বাফে মিলের আয়োজন। এত ঘোরাঘুরি করার পর এরকম বাহারি খাওয়ার ব্যবস্থা দেখে মন ভরে
গেল। দু তিনতে পরিবারই এই সময়ে লাঞ্চ খেলো। এত খাওয়া দাওয়ার পর একটু শরীরটা বিছানা
খুঁজছিল। টুক করে মেরে দিলাম একটা পাওয়ার ন্যাপ।
সন্ধ্যায় দরজায় নক করে বলে গেল যে চা কফির আয়োজন হয়েছে বাইরে। আমরা রিকোয়েস্ট
করতে হাসিমুখে দিয়ে গেল ঘরে। এবার একটু সাজু গুজু করে চারদিকে ঘুরে ফটোসেশনের সময়,
যতই হোক সপ্তমী বলে কথা। বেরিয়ে আবার দেখলাম রকমারি স্ন্যাক্সের আয়োজন। আবার চা
সহযোগে খেতে খেতেই দেখি লোকাল আদিবাসী বৃন্দ পরিবেশিত একটা সুন্দর অনুষ্ঠান হতে
চলেছে। কিছুটা বসে, কিছুটা ঘুরে কখন যে সময় কেটে গেল, বুঝতে পারলাম না। নটার দিকে
ডিনার রেডি বলে জানিয়ে গেল ওরা।
আবার রাতে একটা চমৎকার বাফে। সারাদিনের ক্লান্তি কেটে গেল শেষ ছয়-সাত ঘণ্টার
সুন্দর খাবারের ব্যবস্থাপনায়। সুন্দর নিভৃত পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশে থাকতে
ভালবাসলে অনায়াসে আসতে পারেন এই রিসর্টে।
পরদিন সকালে উঠে বেড টি খেয়ে একটু বাইরের লনে হাঁটাহাঁটি করে কিছু সুন্দর
মুহূর্ত ফ্রেম বন্দি করলাম। আগামী দিনে যা স্মৃতি হয়ে থাকবে আমাদের। ম্যানেজারের
সহায়তায় খুব তাড়াতাড়ি চেক আউটের সব কাজ শেষ করে ব্রেকফাস্ট বাফে তে গেলাম। আবারও
ভিন্ন খাবারের আয়োজন অবাক করল। ব্যাগ গুছিয়ে এবার ফেরার পালা। ঝাড়গ্রাম থেকে ফেরার
পথে কোলাঘাটের কাছে করে নিলাম লাঞ্চ। তারপর বৃষ্টি নামার আগে অষ্টমীর সন্ধ্যেতে
ঢুকে পড়লাম নিজেদের বাসায়। যতই হোক, এবার একটু ঠাকুর দেখতে যেতে হবে না?
আরণ্যক রিসর্ট সম্পর্কে কিছু তথ্যঃ ঘরে প্রয়োজনীয় সব কিছুর ব্যবস্থা পাবেন,
পারলে মশার জন্য অলআউট জাতীয় কিছু আনতে পারেন। আর এদের দরজার লকগুলি বেশ অদ্ভুত।
অনেক জায়গা ট্রাভেল করলেও এই সিস্টেম আমি প্রথম দেখলাম। ওদের সাইটে দেব বিশদ
রিভিউ। তার লিঙ্ক দিয়ে দেব ডেসক্রিপশনে।
©Ayan













