নারী ও নাড়ি
একদিনই কি নারী দিবস? একদিন নারীদের শ্রদ্ধা জানিয়ে দিলেই কি তাদের প্রকৃত মর্যাদা প্রদর্শন করা হয়? আজকের নারীরা কি সেটাই চায়?
এই তো সেদিন এক শিক্ষিত মহিলা আওয়াজ তুললেন নিজের স্বামীর বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতনের। কত শত নারী ধর্ষিতা হয়ে নির্বাক থেকে যায় সামাজিক অবমাননার বেড়াজালে।
এখনো কান পাতলেই শোনা যায় কত নাবালিকার বিয়ে রুখে দেওয়ার ঘটনা। আরো কত বালিকা পারে না সেই সাহস জুগিয়ে পরিবারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার।
কত শত অভাবী পিতা মাতা থামিয়ে দিতে বাধ্য হয় কন্যার পড়াশোনা যাতে অন্তত নিজের অন্য পুত্র সন্তানকে দিতে পারে শিক্ষার আলো। অথচ সেই পুত্রই পরে বাবা মাকে ঘর ছাড়া করতে পিছপা হয় না।
আজও কত যোগ্য নারীর উন্নতির পিছনে খোঁজা হয় কোনো দুরূহ অভিসন্ধির গল্প। যেন নিজের যোগ্যতায় কখনোই সে বাড়তে না পারে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে। সব ক্ষেত্রে যেন থাকতেই হবে ঊর্ধ্বতনের ঘৃণ্য স্পর্শ।
এখনো ছেলেমেয়ের ভালো কিছু প্রাপ্তির কৃতিত্ব জোটে পিতাদেরই। অথচ কারোর খারাপ হয়ে যাওয়ার একশো শতাংশ দায়ভার বর্তায় মায়েদের ঘাড়ে।
ডাবল ইঞ্জিনের জমানায় সংসারের রেল গাড়ি ছুটেছে দ্রুত। কিন্তু আজও ওই মেয়েটাকে কাজের শেষে নিজেকেই করে দিতে হয় পরিবারের জন্য চা জলখাবার। যদিও বেটার হাফ একদিন সেইসব করলেই ধন্য ধন্য পরে যায় চারদিকে। এটা শুধু নিজের বাড়ি নয়, শ্বশুরবাড়িও জয়গান গেয়ে ওঠে জামাইয়ের এহেন কৃতিত্বে।
এইসব কিন্তু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এখনও এগুলোরই প্রাধান্য বেশি উন্নত সমাজের বুকে। চলুন না "মানসের ছেলের থেকে বেরিয়ে তুলে ধরি মাধবীর ছেলের কৃতিত্ব।" ওপরের ঘটনাবলীর উল্টোপুরান হলেই পাওয়া যাবে আসল নারী দিবসের সার্থকতা।
টিল দ্যেন, মুভ টুওয়ার্ডস দ্যাট গোল। আসুন, সকলে মিলে গড়ে তুলি নারীর বাসযোগ্য পৃথিবী।
* ছবি ঋণ: হোয়াটসঅ্যাপ
রচনার তারিখ: ৮ই মার্চ ২০২৩
বার্ধক্যের বসন্ত
- কি হে, কি খবর?
- একটু দাঁড়ান, একজনের কাটছি। তারপরই আপনার। ততক্ষণ আজকের পেপার টা পড়ুন।
দুটো পাড়ার পরের মোড়ের সেলুনে এসে দিব্বি আড্ডা মারেন শ্যামল বাবু। ছেলে মেয়ের ব্যস্ত সংসারে কথা বলার লোকের যে বড়ই অভাব। তাই, এই সব দোকান বাজারে কিছুটা সময় কাটিয়ে নিজেকে টাইমের বাঁধনে আটকে রাখেন আর কি। চাকরি জীবনে সময়ের অভাব পূরণ হয়ে গেছে এই অবসর পরবর্তী কালে।
- কেন কাকু, কোথাও যাবেন নাকি?
চোখ টিপে জানতে চায় ছোটু। শ্যামল বাবু শত ভিড় থাকলেও ছোটুর হাতে ছাড়া কাটবেন না। আর ছোটুও বেশ হাসি মশকরা করে এই সব বৃদ্ধ জনতার সঙ্গে। ওদের জীবনে একটু ভালোবাসার ছোঁয়াচ আনার চেষ্টায়। হয়তো অনেক ছোটবেলায় হারানো বাবাকে কোথাও মনে মনে স্মরণ করে সে।
- আরে শাশুড়ি, মানে ছেলের শাশুড়ি আসবে। তাই, আর কি! হেঁ হেঁ!
- ওহ, তাই বলুন। তা, কাকিমা আছেন তো?
- আরে, না রে ভায়া। করোনা কাটিয়ে দিয়েও গত বছর হঠাৎ করেই পগারপার।
- ঠিক আছে, ঠিক আছে। আপনাকে টেনশন করতে হবে না। এমন পালিশ করে দেবো যে কাকিমাও এলে চিনতে পারবে না।
- আরে সেই বয়স কি আছে? এককালে কতজনের যে হৃদয় ভেঙেছে আমার দাক্ষিণ্যে, সে গল্প শোনাব আরেকদিন। এখন নাও হাত চালাও, বেশি দেরি হলে বেয়ানকে রং মাখানোর চান্স টাও চলে যাবে।
নিউজপেপারটা মুড়ে রেখে চেয়ারের দিকে এগিয়ে যান শ্যামল বাবু।
রচনার তারিখ: ৮ই মার্চ ২০২৩
মায়ার বাঁধন
সকাল সকাল বাস স্ট্যান্ডে ও দাঁড়িয়ে আছে শার্টেল ধরার জন্যে। আজকাল অ্যাপ নির্ভর এই যানবাহনই অফিস পৌঁছানোর নির্ঝঞ্ঝাট উপায়। যদিও প্রযুক্তির মায়ার বন্ধনে অনেক সময়েই যে বিভ্রাট দেখা যায় তা কখনো কখনো শিরপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আজ তেমনই এক দিন। সাত সকালে মিটিংয়ের জন্য আজ একটু আগের শার্টেলই বুক করেছিল ময়ূখ। কিন্তু এবার দেরি হলে অপর্ণা দি কে গুল গল্প দিতে হবে। এমনিতেই টাইমে যাওয়ার সুনাম তো নেই। তাই ঠিক কারণ বললেও কেউ বিশ্বাস করে না।
তো এরকম পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ পিঠে একটা জোরালো চাপড়। পিছন ঘুরে একটা চার অক্ষর দিতে যাব, দেখি তন্ময়।
"আরে ভাই কি খবর? মুখ টা সকাল থেকেই এরকম বিগড়ে কেন?" সিগারেটে সুখ টান মারতে মারতে বলে ওঠে। তারপর সিগারেট টা বাড়িয়ে কাউন্টারের জন্য দেয়।
"না রে, এসব ছেড়ে দিয়েছি অনেকদিন হল।" ওর দিকে তাকিয়ে বলে ময়ূখ।
"কি বলিস রে? স্কুল কলেজে বাপের পকেট মেরে প্রায় চেন স্মোকার ময়ূখ বলছে এই কথা। দাঁড়া দাঁড়া একটু চিমটি কেটে দেখে নি। তা, এটা কত নম্বর বার ছাড়লি?" বেশ অবাক হয়েই বলল তন্ময়
"এটাই প্রথম আর পার্মানেন্ট। আসলে একটা ঘটনার পর.....আর সে তো তোর ক্ষেত্রেও খাটে। রামকৃষ্ণ স্কুলের ফার্স্ট বয় বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে দেখলে হারাধন বাবু থেকে সেই আর বি স্যর, সবাই অক্কা পাবে।" ময়ূখ বলে ওঠে
বলতে বলতেই একটা গাড়ি এসে দাঁড়ায় তন্ময়ের সামনে। তন্বী আধুনিকা এক মায়াবী পরী যেন নেমে আসে গাড়ি থেকে।
"হ্যালো হ্যালো, পুরো যে গিলে খাচ্ছিস যে। এটা আমার বউ বস।" প্রায় সামনে হাত নেড়ে বলে ওঠে তন্ময়। নিজের নির্বোধ ব্যবহারে নিজেই লজ্জায় পড়ে যায় ময়ূখ। মুহূর্তের স্থবিরতা কাটিয়ে বলে ওঠে, "আরে এরকম স্বর্গের দেবী মর্ত্যে নেমে তোর ওপর প্রকট হলে, ঘোর কাটাতে সময় লাগবে বৈকি।" বলেই হেসে ব্যাপারটা হালকা করে দেয়।
তন্ময় বলে, "ও সকালে মেয়েকে স্কুলে নামিয়ে ফিরে এলে আমি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাই। চল, তোকে কোথায় নামাবো? তারপর আমি বেরিয়ে যাব দোকানে। আর যেতে যেতে শুনব কি একটা ঘটনা বলছিলিস, সেটা।"
গাড়িতে উঠে ময়ূখ ভাবতে থাকে পুরোনো অনেক কথা। ওদের বাবা মায়েদের কাছে তন্ময় ছিল রত্ন। মধ্যম মেধার ময়ূখদের কাছে তন্ময় ছিল ঈর্ষার কারণও। সেই তন্ময় আজ বড় কোনো চাকরি করার বদলে ব্যবসা করছে। নিশ্চয়ই অভাবের কারণ নেই। তন্ময়ের ডাকে সম্বিত ফেরে ময়ূখের।
বলে ফেলে ওর সিগারেট ছাড়ার ঘটনা। "তোর মনে আছে ঋতু কে? সেই স্কুলের পর কমলা গার্লস থেকে সাইকেল করে ফিরতাম আমরা দুজনে। প্রেম ছিল ভরপুর। বসন্তের মতই গভীরে চলে গিয়েছিলাম অচিরেই। গ্র্যাজুয়েশনের পর পরই করে নিয়েছিলাম বিয়ে। আমি ঢুকেছিলাম একটা ছোট ফার্মে, আর ঋতু শুরু করেছিল টিউশনি। খুব তাড়াতাড়ি এসে গিয়েছিল ছোট্ট একটা ফুটফুটে মেয়ে। ভালই কাটছিল, তাল কাটল আমার আগের চাকরি গিয়ে। শুরু করলাম অতিরিক্ত নেশা করা। বেশ কিছুদিন সহ্য করার পর হাল ছাড়ল ঋতু। মেয়েকে নিয়ে সরে গেল আমার জীবন থেকে। আমার যখন বিবেক ফিরল, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ঋতুর ডিভোর্সের চিঠি আমার সিগারেট কে বিদায় করল।" চোখ মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল ময়ূখ।
গাড়িটা কখন যে এসে দাঁড়িয়েছে এ জে সি বসু রোডের সেমেটারি। কিছু বলার আগেই তন্ময় ওকে নামিয়ে নিয়ে এগিয়ে চলল সামনের দিকে। একটা স্মৃতি সৌধের কাছে এসে বলে উঠল, "মেরির তখন পাঁচ বছর বয়স। রোজকার মত সেদিনও মায়ের সাথেই স্কুলে এসেছিল। গাড়ি থেকে নেমে স্কুলে ঢোকানোর মুখে উল্টো দিক থেকে আসা একটা বেপরোয়া বাস চাপা দিয়ে যায় ওকে। স্পট ডেড, কিন্তু মেরির মা এখনো ওকে রোজ দিতে আসে স্কুলে। এভাবেই দুজনেই না থেকেও জড়িয়ে আছে আমার হৃদয়ে। তাই এখনও সময় আছে, ফিরে যাওয়ার একটা চেষ্টা করিস ভাই। তাতে নিজেকে অন্তত সান্ত্বনা দিতে পারবি।"
ময়ূখ জড়িয়ে ধরে তন্ময়কে। দুজনের অশ্রুধারায় নেমে আসে বসন্তের অকাল বর্ষণ।
রচনার তারিখ: ১লা মার্চ ২০২৩












