তো মৈনাক ওই প্রথম দলের লোক। একান্নবর্তী বাড়িতে কাজের লোকের অভাব যেমন নেই, ফুট কাটার ও নেই। ছোটখাটো প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ করে মৈনাক। আর বাড়ির কাকা জ্যেঠার সংসারের ছোটখাটো ফাই ফরমাস খেটে কিছু এক্সট্রা আমদানি করে। যদিও এই লকডাউন এর বাজারে, সব টাই প্রায় বন্ধ। তাই কিপটামি টা একটু বেড়েছে। এই যেমন, চা বানালে দু চামচের জায়গায় এক দেড় চামচ চা, মুড়ি খেলে একটু পিয়াজ কুচি না দিলে মুখে রুচতো না যার, সে এখন শুকনো মুড়িও বিন্দাস খেয়ে নিচ্ছে। সবথেকে প্রবলেম হচ্ছে সুখটানে। প্রথমত, স্থানের অভাব, আগে ছাদে ওর সমবয়সি ভাইবোন ছাড়া কেউই যেত না খুব একটা, এখন তো সারা বাড়ির আড্ডাখানা ওটাই। দ্বিতীয়ত, উপকরণের। যা বেশি রেটে বিক্রি হচ্ছে, মাঝে মৈনাক ভেবেছিল বিড়ি খাবে। কিন্তু সেটা না করে এখন দিনে ১-২পিস করে খাওয়া, যাতে বেশিদিন টানতে পারে। তো এই বাজারে বাড়িতে কাজের লোকের আসা তো বন্ধ, তাই মৈনাক কে মাঝে মধ্যে সাহায্য করতে হয় মা কে।
সেদিন মা ওকে বলেছিল যে, সব কাজই তো চলে যাচ্ছে, শিখা মানে ওদের কাজের মাসি কে আর না রাখলেও চলে। কিন্তু মৈনাক কিছুদিন করেই বুঝতে পেরেছে ওদের কাজের মাসী মাইনেটা বাড়ানো উচিৎ। এত কাজ করে খুবই কম টাকায়, উপরন্তু মায়ের মুখ তো উপরি পাওনা। কিন্তু নিজের কাজ টা থাকলে তবে না অন্যের দিকে চাইতে পারবে।
শিখার ভাবনা: শিখা, মানে যার কথা আগে বললাম, খেটে খাওয়া মানুষ, বর ছেড়ে চলে গেছে অনেকদিন। পাঁচ বাড়ি কাজ করে সংসার চালায়, ছেলে মেয়েকে পড়ায় ও। অনেকে সাহায্য করে পুরোনো বই খাতা দিয়ে। তো প্রথম দিকে যখন সব বাড়ি থেকে ফোন করে বললো, শিখা এখন কাজে এসো না, মাসের শেষে মাইনে টা নিয়ে যেও। এতবছর কাজের অভিজ্ঞতায় এরকম কোনোদিন হয়নি। প্রথম প্রথম বেশ মজা লাগতো ওর। বেশ আরামে আছে, ওদের পাড়ায় লোকাল পার্টির নেতারা চাল ডাল ও দিয়ে গেছে। কিন্তু কিছুদিন পর বুঝতে পারে, এটা আগামীদিনের সর্বনাশ ডেকে আনছে। কাছের দুটো বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে এলেও দূরের গুলো থেকে আনতে যেতে পারেনি। আর এখন তো প্রায় ২ মাসের ওপর হতে চললো, এতদিন ধরে নিজেরা কাজ করে নিলে আর কি দরকার পড়বে শিখা দের? কাল একবার মানসী বৌদির বাড়ি যাবে ও।
মৈনাকের মা: এই দুর্দিন যে কবে যাবে। ছেলেটার উপার্জনই সব ভরসা। বুঝতে পারি ভিতরে ভিতরে অনেক ভাবনা চিন্তা করে। বাবার ওষুধ, সংসারের জিনিস, কাজের লোকের মাইনে। কাজের লোক টাকে বাদ দেওয়াই যায়, এখন প্রায় ২-৩ মাস তো চলছে সবই। একটু কষ্ট হলেও ঠিক ম্যানেজ করে নেবে মানসী। আর ছেলের ও বয়স হচ্ছে, একটু গুছিয়েই বিয়ে দিতে হবে ওর।
পরদিন সকাল, মৈনাকের বাণী: মা, শিখা মাসী এসেছে, আমি মাইনে দিয়ে দিচ্ছি, তুমি একবার এসে কথা বলে যাও। দুশো টাকা বেশি দিয়ে দিল ও।
মা চিৎকার করে বললো, ওকে একটু দাঁড়াতে বল, আমার কথা আছে।
মা এলে শিখা বললো, বৌদি, কাজের লোকের দিন তো শেষ হতে চললো গো। জমানো পুঁজি দিয়ে চাল, ডাল, তেল, নুন তুলেছি। যা লাগবে ফোন করে দিও, এসে দিয়ে যাবো। দাদাবাবু, এই এক্সট্রা ২০০ টাকা টা রাখো, ওটা ওই মাল দিয়ে যাওয়ার সময় এক্সট্রা ২০ টাকা করে নেবো। ডেলিভারি না কি একটা বলে না, সেই চার্জ, হাসতে লাগলো প্রাণ খুলে।
সবার মনের কথা কোথাও যেন এক হয়ে যায়। সবাই মিলে নতুন পথ খুঁজে একে অন্যের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে চলতে হবে এই সম্মুখসমরে। জীবনের এই যুদ্ধে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর রোজনামচা টিভি চ্যানেলের উপভোগ্য না হলেও হৃদয়বিদারক বটে।
©Ayan












