ছোট গল্পের সন্ধানে || কলমে অয়ন

  • বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন

    আনন্দ, উদ্বেগ আর প্রত্যাশার গণ্ডি পেরিয়ে চতুর্থ বারের জন্য অপেক্ষা দায়িত্বের। সেই দায়ভার থেকেই জন্ম এই চতুর্থ সন্তানের। আগের বারের "মৃত্যু রহস্য"র পর ইয়ং ইন্সপেক্টর সৌমিলির ডাক পড়েছে এক জটিল সমস্যার সমাধানে। গ্রাম বাংলার এক সুন্দর প্রকৃতির প্রেক্ষাপটে ঘটে চলেছে অদ্ভুত সব ঘটনা। যাকেই সে সন্দেহের তালিকায় আনছে, হঠাৎ করে সে-ই খুন হয়ে যাচ্ছে। সৌমিলি কি পারবে এই কেস সলভ করতে❓ তারই গল্প বলতে প্রকাশিত হচ্ছে আমার চতুর্থ বই "আই ক্যান্ডি" এবারের কলকাতা বইমেলা ২০২৫ এ ক্লিক করুন

  • বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন

    প্রথম বারের আনন্দ আর দ্বিতীয় বারের উদ্বেগের গণ্ডি পেরিয়ে তৃতীয় বারের জন্য অপেক্ষা প্রত্যাশার। সেই থেকেই জন্ম এই তৃতীয় সন্তানের। আগের বারের "পায়ে পায়ে রহস্য" র সাফল্যের পর ইয়ং ইন্সপেক্টর সৌমিলি সমাধান করে ফেলেছে আরও কিছু জটিল কেস। তারই গল্প বলতে প্রকাশিত হচ্ছে আমার তৃতীয় নতুন গল্পের বই "মৃত্যু রহস্য" এবারের কলকাতা বইমেলা ২০২৪ এ। আশা করি এই বই আমার পাঠকদের আনন্দ দেবে বিশদে জানতে ক্লিক করুন

  • কেনার জন্য ক্লিক করুন

    আজকের দুনিয়ায় টেকনোলজিও যত উন্নত হয়েছে, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে নিত্য নতুন অপরাধের ধরণ। একজন ইয়ং ইন্সপেক্টর কিভাবে কেসের পর কেসের কিনারা করবে, তারই বেশ কিছু ঝলক থাকবে পাঠকদের সামনে। বিশদে জানতে ক্লিক করুন

  • কেনার জন্য ক্লিক করুন

    মুঠোফোনের দুনিয়ায় আমার প্রথম বই শব্দের স্বরলিপি এনে দেবে একরাশ মুক্ত বাতাস। বিশদে জানতে ক্লিক করুন

  • প্রতি সপ্তাহে নতুন গল্প

    গল্প পড়ার থেকে শুনতে বেশি ভালবাসেন? বাচ্ছারা রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময় গল্প শুনতে চায়? তাহলে দেরী না করে সাবস্ক্রাইব করে রাখুন ইউটিউব চ্যানেলটা, আর বেল আইকন টা প্রেস করতে ভুলবেন না। আসছে প্রতি শুক্রবার রাত ৯ টায়। সঙ্গে থাকুন।

  • #ভোকাট্টা#

    চারপাশের আকাশে শুধু রঙ বেরঙের ঘুড়ি। এখনকার মত নানারকমের ক্যামেরা না থাকলেও ছবি গুলো উজ্জ্বল হয়ে থাকত স্মৃতির মণিকোঠায়। মাঝে মাঝে তারস্বরে চিৎকার, “ভো কাট্টা!

  • #অরণ্যে দুই রাত্রি#

    কথায় বলে বাঙালির পায়ের তলায় সর্ষে। কিন্তু এই বিগত দেড় বছরের করোনা পরিস্তিতিতে সবার মত তারাও হয়ে পড়েছিল ঘরবন্দি। তাই এখন একটু পরিস্তিতি ঠিক হতেই সবাই আবার বেড়িয়ে পড়েছে কাছে পিঠে। সেই রকমই একটা উইকএন্ড ডেসটিনেশনের কথা

  • কেনার জন্য ক্লিক করুন

    মুঠোফোনের দুনিয়ায় আমার প্রথম বই শব্দের স্বরলিপি এনে দেবে একরাশ মুক্ত বাতাস। বিশদে জানতে ক্লিক করুন


Best Bangla Books to Buy in 2024

#মেরি ক্রিসমাস#

 

merry christmas, bangla golpo


“কাল থেকে আর তোমাকে আসতে হবে না।“ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে অতসীকে বলে ঘরে ঢুকল মিঠু

আয়নার সামনে টাই টা ঠিক করতে করতে অরিজিৎ জিজ্ঞাসা করল “সাত সকালে হলো টা কি? তুমি কি বেরবে না? একে সকাল সকাল বিদায় করছ যে।”

“এত মিথ্যে কথা বলে, আর এখন তো আবার চুরিও করছে। হাতে নাতে ধরে ফেলেছি বলে সে কি তড়পানি ওর। তোমার আর কি? তুমি তো সেই সেম টাইমেই বেরিয়ে যাবে, আমার জন্য কি আর ছুটি নেবে? তোমার টাইম মত সব পেলেই তো হল।”

অরিজিৎ বুঝল আকাশ খুবই মেঘলা আজ, ঘূর্ণিঝড় আসতে চলেছে। কাজের লোকের পুরো ঝাড় টা আজ পড়বে ওর ওপরেই। তাড়াতাড়ি টিফিনবক্সটা তুলে নিয়ে মেয়েকে টা টা করে বেরিয়ে পড়ল। মিঠুকে বলল কিছু লাগলে ফোন করো। মিঠু আড়চোখে কটমট করে তাকাল শুধু।

মেয়েকে নিয়ে থাকতে ভালই বাসে মিঠু। কিন্তু হঠাৎ করে ছুটি নিলেই অফিসে ঝামেলা হয়, আজ আবার কিছু একটা বলতে হবে। কিছু মিথ্যে বললেই দেখেছে ঠিক কদিন পরে সেই একই কারণে আবার ছুটি নিতে হয়। সামন্ত দা কে একটা এসএমএস করে রাখল। এবার হাতের কাজ গুলো গুছিয়ে মেয়েকে নিয়ে বসল একটু। দেখতে দেখতে মেয়ের বয়স ছয় বছর হয়ে গেল। আর কিছুদিন পর থেকে ওর নিজেরই একটা জগৎ তৈরি হয়ে যাবে। সেই জন্য অনেকবার ভেবেও চাকরিটা ছাড়েনি ও। অতসীকে রাগের মাথায় বের করে দিলেও এবার সারাদিন মেয়েকে সামলাবে কে? মা কেও কি ফোন করে আসতে বলবে একবার। থাক, কাউকে না পেলে মা কে জানাবে। এমনিতেই ভাই রাগ করে বেশি আমার বাড়ি আসতে হলে। তখন ওর বউকেই হাত পুড়িয়ে রান্না করতে হয় আর কি। পটের বিবির নখের একটু নোংরাও থাকলে চলে না। একটু পরে একবার শ্যামলিদের বাড়িতে গিয়ে কাজের লোকের খোঁজ করে আসতে হবে।

এরপর মেয়েকে স্নান খাওয়া করিয়ে, নিজে স্নান করে ঠাকুর কে মালা ধূপ দিয়ে রেডি হয় মিঠু। উলটোদিকের ফ্ল্যাটের রিমলিকে একটু ফ্ল্যাটে বসতে বলে ঘুরে আসবে ভাবে। মেয়েও খেলনা নিয়ে খেলতে শুরু করে। কিন্তু বেরোনোর সময় দেখে রিমলিদের ফ্ল্যাটে তালা দেওয়া। ঠিক করে, মেয়েকে নিয়েই যাবে।

ঘরে ঢুকতেই মেয়ে বায়না করতে শুরু করে যে ও কোথাও যাবে না, ঘরেই খেলবে। মিঠু বলে, “তোকে তাহলে বাইরে থেকে চাবি দিয়ে যাব। থাকতে পারবি তো? আমি এক্ষুনি ফিরে আসব।”

“ঠিক আছে মাম্মাম, আমি তো বড় হয়ে গেছি নাকি? অতসী আন্টিও তো কাল থেকে আসবে না বললে, তখন আমায় একাই থাকতে হবে তো। একটু প্র্যাকটিস করে রাখি।”

“ওরে আমার পাকা বুড়ি রে। ঠিক আছে, চুপটি করে থেকো। আমি এক্ষুনি চলে আসব।” মনে মনে ভাবে, মেয়ে আমার বড় হয়ে গেল। এই প্রথম একা রাখছে বলে মন টা একটু খচখচ করলেও ভাবল, এক্ষুনি তো যাবে আর আসবে। বাইরে বেরিয়ে দরজায় চাবি দিয়ে বেরিয়ে যায় ও।   

একটু পরেই ডোরবেলটা বাজল একবার। ছুটতে ছুটতে দরজার কাছে গিয়ে ছোট্ট বাচ্ছাটা হাঁক পাড়ে, “কে এসেছ? এখন কেউ নেই বাড়িতে, পরে এসো।” কিন্তু ওর অসাবধানতায় কখন যে ঠাকুরের প্রদীপটা পড়ে গিয়ে আগুন লেগে গেল বুঝতে পারল না সে।

বাইরের সেলসম্যান টা পরের ফ্ল্যাটের বেল মারে। একটু পরেই ওই পাশের বন্ধ দরজা থেকে ভয়ার্ত চিৎকার ওই বাচ্চাটার।

“বাঁচাও, বাঁচাও !!!”

লোকটা বুঝতে পারেনা কি হয়েছে। নিচে গিয়ে আশেপাশের লোকজনকে জড়ো করে দেখতে পায় ওই ফ্ল্যাট থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী বেরছে। দু একজন মিলে ফ্ল্যাটের দরজার তালা ভাঙ্গার চেষ্টা করতে থাকে। একজন বলে ওদের কাজের লোক থাকে তো, সে কি নেই নাকি? কেউ একজন অরিজিৎ কে ফোন লাগায়, না পাওয়ায় ফোন করে মিঠুকে। শুনে তো মিঠুর হাত পা ঠাণ্ডা হওয়ার জোগাড়। হুড়মুড়িয়ে বাড়ির দিকে দৌড় দেয় ও। খবর যায় দমকলেও।

অতসী অন্য একটা কাজের খোঁজে গিয়েছিল আজই। সেখানেই কিছুটা সময় কাটিয়ে ফিরছে বাড়ি। আসলে এখন সবাই পরখ করে নিতে চায় কাজকর্ম পারে কিনা। ফেরার পথে বউদিদের বাড়ির সামনে দিয়েই ফিরতে হবে ওকে। বউদি ভালো ব্যবহার করলেও মাঝে মাঝে এত রাগ দেখাত না, তখনি মাথাটা খারাপ হয়ে যেত। কিন্তু ওই ছোট্ট বেবিকে মন থেকে দূরে সরাতে পারছে না ও। এরপর থেকে আর বাচ্ছার কাজ নেবে না, বড় মায়া পড়ে যায় ওদের ওপর।

ওদের ফ্ল্যাটের কাছে এসেই দেখে হুলুস্থুল অবস্থা। লোকমুখে ওই অবস্থা শুনে দৌড় লাগায় নিজের বাড়ির দিকে। বউদিকে ফোনে ধরার চেষ্টা করে, পায় না। দাদাকে ফোনটা লাগায় আর তাড়াতাড়ি আসতে বলে।

সকালে তাড়াহুড়ো করে বেরোনোর সময় বউদিদের ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবিটা দিয়ে আসেনি। ভেবেছিল বিকেলে কাজের শেষে ওদের দিয়ে আসবে। কে জানে না হলে হয়ত আবার চুরির দায়ে হাজতবাস করাবে।

চাবি নিয়ে এসে পড়িমড়ি করে উপরে উঠে ফ্ল্যাটের চাবি খোলে। তাড়াতাড়ি বের করে আনে ওর আদরের বেবিকে। পাড়ার লোকে ঘরে ঢুকে জল ঢেলে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে।

“কেন তুমি চলে গেছো আমায় ছেড়ে?” কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলে ওঠে বেবি।

কিছু বলতে পারে না ও। শুধু দুচোখ দিয়ে জলের ধারা বেরোতে থাকে। কি করে বোঝাবে এই শিশুকে যে এই পৃথিবীতে অনেক কঠিন বাস্তব অপেক্ষা করে থাকে অতসীদের মত মানুষদের জন্য।

পিঠে হাত রাখে মিঠু, দৌড়ে এসেই ওদের মিলন দৃশ্যে চোখ আটকায় ওর।

“মাম্মাম” বেবি এবার ছুটে আসে মিঠুর কাছে।

অতসীর হাতটা ধরে ক্ষমা চায় মিঠু, আর বেবির কাছে অতসীর হাত টা এগিয়ে দিয়ে বলে, “এই নাও তোমার ক্রিসমাসের উপহার। আজ থেকে অতসী মাসি তোমার।”

“ইয়ে”, চিৎকার করে ওঠে বেবি।

©Ayan

Share:

#বিকিকিনি#

Bengali Story Bikikini

বাবাই না? দূর থেকে দেখেই চিনেছে সমীর। আজকাল পার্কে এসে হাঁটার থেকে বেশি বসেই থাকতে হয়। হাঁটুর ব্যথাটা বেশ বেড়েছে ইদানীং। তখন এই পার্কের বেঞ্চিতেই বসে একটু লোকজনের খোঁজ খবর নেওয়া হয় আর কি।

কাছে আসতেই জিজ্ঞাসা করল “বাবাই, কেমন আছিস?”

“হ্যাঁ ভালো কিন্তু আপনি? ঠিক চিনলাম না তো!”

“আমি তোদের পাশের বাড়ি থাকতাম যখন তোরা সাহেব পাড়ায় থাকতিস। তুই তখন অনেক ছোট, আমাকে মনে নেই হয়ত তোর, সমীর কাকু। তোর বাবার সাথেও আমার যোগাযোগ ছিল। তা এখানে এলি কবে?”

“এই চার পাঁচ দিন হল।”

“তা এখন কি এখানেই থাকবি নাকি? তোর বাবা শেষ দিকে খুবই দুঃখ পেত। বলত, এত সব বানিয়ে একা আগলে রেখে কি লাভ? ছেলে মেয়েরা যদি কাছেই না থাকে, তাহলে কি জন্যই বা এত খেটেছি এককালে।“

“কি আর করা যাবে কাকু? এখানে চাকরি কোথায়? আর জানেনই তো দিনকালের অবস্থা। এখানকার সব বিক্রি করে চলে যাব পাকাপাকি।“

“সে কি রে? তোর বাবার অত শখের বাড়ি, আমরা তো জানি মানুষটা কিভাবে তিল তিল করে সঞ্চয় করে জমি কিনে সবটা করেছে। তোরা তখন কত ছোট। তোর মায়েরও শখ ছিল প্রচুর। মাঝে মাঝেই তোর বাবার সাথে কলকাতা গিয়ে নিয়ে আসত হরেক রকম ঘর সাজাবার জিনিস। আমার তো না ছিল তখন শখ, না ছিল তোর বাবার মত প্রথম থেকে সব গুছিয়ে রাখার অভ্যাস। তোর বাবার সাথে প্রতিদিন এই মর্নিং ওয়াকেই দেখা হত। তোদের নিয়ে কত গর্ব করত।”

একটু ইতস্তত করতে থাকে অনীশ মানে বাবাই। আজ পার্কে মর্নিং ওয়াক টা তো হলই না, উপরন্তু একগাদা সময় নষ্ট হচ্ছে বকবক করে। “কাকু, পরে আবার কথা হবে, আসছি।” বলেই ওনাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই পার্কের এক্সিট গেটের দিকে চলে গেল ও। তাড়াতাড়ি সব ব্যবস্থা করতে হবে। আজ একটা ব্রোকার একজনকে আনবে বলেছে সকালে। পনেরো দিনের জন্য ওয়ার্ক ফ্রম হোম ম্যানেজ করে এসেছে এখানে। তার মধ্যেই সব মিটিয়ে ফেলতে হবে ওকে।

বাড়িতে ফেরার কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্রোকার নিয়ে হাজির নতুন ক্রেতাকে। তাঁকে সব ঘুরিয়ে দেখিয়ে টাকাপয়সা নিয়ে আলোচনা করতেই কেটে গেল প্রায় একঘণ্টা। স্বস্তির কথা এটাই যে ওনার খুবই পছন্দ হয়েছে বাড়িটা। আর বাবা যেরকম শখ করে খুঁটিনাটি সব পছন্দ মত করেছিল, যে কারোর দেখলেই পছন্দ হবে এটা। এযাবৎ এই অঞ্চল জমজমাট হলেও বাবার মুখে শুনেছে যখন কিনেছিল জমিটা, এখানে প্রায় ধু ধু মাঠ। বন্ধুরা অনেকেই বারণ করেছিল কিন্তু। মা ও একদমই রাজি ছিল না এটায়। সমস্ত সঞ্চয় লাগিয়ে এই জায়গায় কিনতে মন চায়নি মায়ের, মায়ের যে শখ ছিল কলকাতায় ফ্ল্যাট। তাই, বাড়ি বানানোর সময় ও পরে বেশিরভাগ জিনিসই বাবা কলকাতা থেকে কিনে এনেছিল মায়ের পছন্দে। তখন ওসবের চল ছিল না এদিকে। যখন বাড়ি বানানো হয়, ওরা তখন খুবই ছোট, ক্লাস টু কি থ্রি, দিদি ফাইভ বোধহয়। তখনও আশেপাশে একটাও বাড়ি ছিল না। প্রায় বছর সাত-আট পরে আসতে আসতে গড়ে উঠেছে জনপদ। বাবার বন্ধুরা এলে মজা করে বলত, বউদি মনীশের ফার্ম হাউসে এসেছি। আড়ালে বন্ধুপত্নীরা বেশ ঈর্ষা করত মাকে। তখন মায়ের মধ্যে একটা ভাল লাগা কাজ করত। যদিও এসব আনন্দ বেশিদিন উপভোগ করতে পারেনি মা। কলেজে পড়ার সময়েই মা কে হারায় ও।

যাইহোক, এসব ভাবতে ভাবতে আজ অফিসের কাজে বেশ লেট করে ফেলেছে। তাড়াতাড়ি কাজ গুটিয়ে একবার অরুণের বাড়ি যেতে হবে সন্ধ্যায়। অরুণ ওর ছেলেবেলার বেস্ট ফ্রেন্ড, এখানেই একটা মুদিখানার দোকান করে গুছিয়ে বসেছে। ওকেই পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি করবে ভেবে রেখেছে ও। কারণ বারবার সব কাজে আসতে পারবে না এখানে। বিকেলের দিকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওর ও মনটা কেমন করছে বাড়ির জন্য। যতই হোক থাকে না এখানে, কিন্তু বেড়ে ওঠার ঘর বাড়ির মায়া কি কাটানো যায় এত সহজে? এরপর থেকে আর কখনো পার্মানেন্ট অ্যাড্রেস হিসেবে বলতে পারবেনা এটা। ও নিজেও কি প্রথমে ভেবেছিল এটা বেচবে? তারপর রুমি মানে ওর বউয়ের কথাতেই নিজের আবেগকে বসে আনে ধীরে ধীরে। মনে আছে প্রথম যেদিন রুমি বলেছিল বিক্রি করার কথা, কতই না ঝগড়া করেছিল ওর সাথে। পরে ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখে এটাই বেস্ট সলিউশন।

অরুণের বাড়িতেই আজ রাতে খাওয়ার জন্য বলেছে। আটটা নাগাদ কেক মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে ওর বাড়ি এলে অরুণও দোকান থেকে ওপরে উঠে আসে। বাড়ির তলাতেই দোকানটা। কাকু কাকিমাও থাকেন ওর সাথে। অনেকদিন বাদে দুই বন্ধুর আলাপচারিতার পর অরুন বলে ওঠে,

“সত্যিই কি বেচে দিবি বাড়িটা? আমাকে যে ভীষণ গুরু দায়িত্ব দিচ্ছিস তুই। আমার যদি সামর্থ্য থাকতো আমিই কিনে নিতাম এটা। কত ছোটবেলার স্মৃতি ওখানে। আমি তো তোদের বাড়িতেই পরে থাকতাম সবসময়। বিশ্বাস কর, তখন মনে হত আমাদের কেন এরকম সুন্দর বাড়ি নেই, আর তার সাথে থাকতো কাকিমার হাতের রান্না। আজ মনে হয়, এই বেশ ভালো আছি। সবাইকে নিয়ে সুখে দুঃখে। অন্তত শেষ জীবনে কেউ তো মুখে জল দেবার থাকবে।”

তারপর বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে ভুল টা বুঝতে পারে। কাকুর মৃত্যুর খবরটা অরুণই দিয়েছিল অনীশকে। কিন্তু তারপরের দিনেও আসতে পারেনি অনীশ। অফিসের কাজে আমেরিকায় ছিল তখন। আসতে লেগে গিয়েছিল আরও একটা দিন। এদিকে মরদেহ রাখার তেমন সুবিধা ছিল না বিশেষ। মুখাগ্নি টা করতে হয়েছিল অরুণকেই। তারপর বন্ধুর পিঠে হাত রেখে বলে, “কিছু মনে করিস না। তোকে আঘাত দিতে চাইনি।”

“ঠিকই বলেছিস তো। এত পড়াশোনা করে লাভ টা কি হয়েছে বল। বাবার ওই শেষ সময়ে না থাকতে পারাটা আজও আমায় প্রচুর কষ্ট দেয়। তবু তুই ছিলিস বলে বেয়ারিশ লাশ হয়নি।”

“বাদ দে ওসব কথা। সব বিক্রি হয়ে গেলে তোর ওখানে যাব কিন্তু সপরিবারে। থাকা খাওয়া ঘোরার ব্যবস্থা তোর।” এরপর ওকে একটু এগিয়ে দিয়ে আসে আর কিছু লাগলেই জানাতে বলে রাখে।

পরদিন বেশ কিছু ফোন এলেও ও বাড়ি বিক্রি হয়ে গেছে বলে জানিয়ে দেয় তাদের। দুপুরের দিকে ওই প্রথম দিনের ভদ্রলোক ফোন করে জানান যে এই বাড়ি উনি কিনবেন না। কারণ জানাতে বললে কিছু বলতে চান না উনি। অনেক করে রিকোয়েস্ট করার পর বলেন, এই বাড়িতে সুইসাইডের কেস টা বেমালুম চেপে গিয়েছিলেন দেখছি।

হঠাৎ করে ফিরে আসে অনেক বছর আগের একটা সকাল। যেদিন ঘুম থেকে উঠেই দেখেছিল ওর ক্লাস ইলেভেনে পড়া দিদির ঝুলন্ত দেহ। মনে হল অনেকদিন পর কেউ যেন কবর থেকে খুঁড়ে নিয়ে এল সেই অভিশপ্ত দিন টাকে। চুপ করে বসে পরে ও।

একটু ধাতস্ত হয়ে ভাবতে থাকে কেউ তো তেমন জানত না ঘটনা টা। আশেপাশে পাড়া প্রতিবেশিও তো ছিল না তেমন। খুব কাছের কিছু লোকজনই জানত এটা। এখনকার বাসিন্দারা তো কেউই জানার কথা নয়। তাহলে বিক্রিতে বাঁধা দিচ্ছে কে? অরুণ কি?

একটু মাথাটা ঠাণ্ডা করে ফোন করে অরুণকে। সব জানিয়ে জিজ্ঞাসা করে, “তুই কি কাউকে বলেছিস?”

“তুই কি পাগল? তোর মনে না থাকতে পারে দিদি আমাকেও ভাইফোঁটা দিত আর দিদির ওই ঘটনার পর আমি মাস খানেক তোদের বাড়ি যেতে পারিনি। তুই আমাকে সন্দেহ করছিস?”

“সেটা নয়। কিন্তু তুই ও তো বাড়িটা বেচতে দিতে চাস না। যাগ গে, বাদ দে। আচ্ছা, সমীর কাকু বলে কাউকে চিনিস? বাবার বন্ধু, বলল আমাদের পুরনো পাড়ায় থাকতো। সেদিন মর্নিং ওয়াকের সময় পার্কে দেখে নিজেই চিনতে পারলেন। অথচ, আমি মনে করতেই পারলাম না।”

“না তো। তোর সাথে আমার পরিচয় তো ওই ক্লাস ফাইভ থেকে। তার আগেই তো তোরা এই বাড়িতে চলে এসেছিস। আর একজন নেবে না বলেছে বলে তুই এত চিন্তা করিস না। দেখি আমি আর কোন ব্রোকার জোগাড় করতে পারি কিনা। আর সমীর বলে এই তল্লাতে একজনকেই চিনি, যে স্ট্যাম্প কাকু নামে পরিচিত। ওনার কাছে যা সব স্ট্যাম্প আছে না। তোকে একদিন নিয়ে যাব ওর কাছে। তোর পুরনো কালেকশনটা আছে এখনও?”

“না রে। ওসব শখ আহ্লাদ কবেই মরে গেছে।” মুখে বললেও মনের কোনে পুরনো স্ট্যাম্প জোগাড়ের হিড়িক গুলো ভিড় করে এল।

“ঠিক আছে, এখন রাখছি। পরে কল করব। সময় পেলে বাড়ি চলে আসিস।”

সন্ধ্যে থেকে ফোন খুঁজে বের করে যাদের বাড়ি বিক্রি হয়ে গেছে বলে বারণ করেছিল, তাদের আবার আসার কথা বলল অনীশ। পরের কয়েকদিন তারা এসে দেখে গেলেও দিন কয়েক পরেই সবাই রিজেক্ট করতে থাকে বিভিন্ন অজুহাতে। মন টা বেশ খারাপ হয়ে যায় ওর। মনে আসতে থাকে বেশ কিছু কুসংস্কার। ভাবতে থাকে বাবা, মা, দিদি সবাই বোধহয় বেচতে দিতে চায়না এটাকে।

শুক্রবার সন্ধ্যায় অরুণ আসবে বলে ওর বাড়িতে। রাতে একটু খাওয়ার আরেঞ্জমেন্ট করে ও। অরুণ আসার একটু আগেই একজনের কল আসে ওর মোবাইলে। সে জানায়, কাল বাড়িটা দেখতে আসবে। এবার আর টাইম ওয়েস্ট করতে চায় না অনীশ। আগে থেকেই ক্রেতা কে জানিয়ে দেয় বাড়ির পুরনো কাহিনী। ওর বাবার পরম যত্নে তৈরি বাড়িকে আর কাউকে রিজেক্ট করতে দেবে না ও। উনি আর কিছু না বলে পরের দিন আসবেন বলেন।

অরুণ আসার পর বেশ আনন্দের সাথে খবরটা জানায় ওকে। অরুণ বলে, “তোর জন্যও একটা সারপ্রাইজ আছে। কাল বিকাল টা ফাঁকা রাখিস।” দুজনে বেশ জমাটি আড্ডা দেয়।

পরদিন দশটা নাগাদ বেল বাজে অনীশের “আনন্দ নিকেতন” এ। ওর বাবার দেওয়া নাম এই বাড়ির।

“আপনি? আসুন আসুন” আগন্তুক সেই সমীর কাকু। এই অসময়ে ওনাকে দেখে একটু বিরক্ত হয় ও। একটু পরেই আবার ওই বাড়ির সম্ভাব্য ক্রেতার আসার কথা।

“আমিই ফোন করেছিলাম তোমায় কাল।”

এবার একটু অবাক হওয়ার পালা অনীশের, “আপনিই বাড়ি টা কিনতে চান বলে ফোন করেছিলেন?”

“হ্যাঁ, তোমার থেকে এই বাড়ি বিক্রির খবর টা পাওয়ার পর থেকেই মন টা আনচান করছিল। যা কিছু জমানো ছিল সব জোগাড় না করে তোমাকে জানাতে পারছিলাম না। তুমি যাতে ভেবে না বোসো তোমার বাবার বন্ধু হয়ে আমি অন্যায় সুবিধা নিয়ে কম দামে কিনে নিতে চাইছি। তাই তুমি যা দর দিয়েছ তাতেই নেব। তুমি বাকি সব কাগজপত্রের ব্যবস্থা কর। আর তোমার অ্যাডভানস আমি দিন তিনেক পর দিয়ে যাব। এর মধ্যে আবার অন্য কাউকে দিয়ে দিও না যেন।”

“ঠিক আছে। চলুন, বাড়িটা ঘুরে দেখাই।”

“এ বাড়ির আর কি দেখাবে? এর প্ল্যান হবার থেকেই আমি ছিলাম তোমার বাবার সঙ্গী। মাঝে বেশ কিছু বছর সরকারি ট্রান্সফারের চাকরির জন্য থেকেছি এদিক ওদিক। কিন্তু রিটায়ার করার পর এখানেই ফিরে এসেছি। তাই তোমাদের বড় হওয়া টা আমার চাক্ষুষ হয়নি। কিন্তু তোমার বাবার থেকে গল্পে আর ছবিতে সবই দেখেছি। আসি এবার। আমাকে জানিও সব রেডি হলে।”

ওনাকে একটু জলযোগ সহকারে আপ্যায়ন করে উকিল বাবুকে কল করে সব রেডি করতে বলে ও। দেখতে দেখতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়। হঠাৎ হুড়মুড় করে বাড়িতে আসে অরুণ।

“এখনো রেডি হোসনি? তাড়াতাড়ি বের হ।”

তড়িঘড়ি রেডি হয়ে ওর বাইকের পিছনে যেতে যেতে জিজ্ঞাসা করে, “আমরা যাচ্ছি কোথায়?”

“চল না আগে?”

প্রায় মিনিট কুড়ি পরে পৌঁছয় গন্তব্যে। একটা পুরনো বাড়ির সামনে এসে বেল বাজায় অরুণ। অনীশ কে বলে, তোকে সেই স্ট্যাম্প কাকুর কথা বলেছিলাম না, কাল রেল ব্রিজের দিক থেকে ফেরার পথে ওনার সাথে দেখা। বললাম আমার এক বন্ধুকে আনব আপনার কালেকশন দেখাতে। বলল আজই আনতে, পরে নাকি আর হবে না।

“এসো ভিতরে এসো”, দরজা খুলে বেরলেন বাড়ির কর্তা।

আরও একবার অবাক হওয়ার পালা অনীশের। “আপনি?”

“তুই চিনিস নাকি স্ট্যাম্প কাকু কে?” অরুণ জিজ্ঞাসা করে।

“আলাপপরিচয় সব ভিতরে ঢুকে করো।“ বসার ঘরে বসিয়ে উনি আনতে গেলেন ওনার কালেকশন।

“আরে ইনিই তো সেই বাবার বন্ধু সমীর কাকু, তোকে বলেছিলাম না। আজ সকালে ইনিই এসে বাড়িটা কিনবেন বলেও জানিয়ে গেলেন“, অনীশ বলে উঠল।

“ইনি অত টাকা পেলেন কি করে? শুনেছি তো সরকারি চাকরি করতেন। যদিও সংসারে তো আর কেউ নেই।” অরুণ বলল।

“তোমাদের চিন্তার কোন কারণ নেই। কাকু কোন চুরি ডাকাতি করে বাড়ি টা কিনছে না। এই আমার সারা জীবনের স্ট্যাম্প কালেকশন। এগুলোকে বিদায় করেই অন্য সম্পদে হাত দিচ্ছি। যতই হোক আমার বন্ধুর প্রথম স্বপ্নের সাথী। আর একটা কথা তোমাদের জানিয়ে রাখা ভালো, তোমাদের পুরনো খদ্দেরদের আমিই বিদায় করেছি ওই ব্রোকারের সাহায্যে। তাই ওই দুঃস্বপ্নের ঘটনাটা আমাকে বলতে হয়েছিল। আমাকে মাপ করো। একটু টাইম বাই করেছি টাকাপয়সা জোগাড় করতে। যদিও ব্রোকার টাকে একটু বেশি লোভ দেখাতে হয়েছিল।”

অনীশ ইতিমধ্যে ডুবে গেছে কাকুর স্ট্যাম্প কালেকশনে। পাতার পর পাতা দেখে চলেছে, দুচোখে অপার বিস্ময়।

“এগুলো কি অলরেডি বিক্রি করে দিয়েছেন?” মুখ না তুলেই জিজ্ঞাসা করে অনীশ

“একজনের সাথে কথা হয়ে আছে, দিন তিনেক পর ফুল পেমেন্ট করবেন।”

“এগুলো কি আমাকে বিক্রি করবেন?” জানতে চায় অনীশ

সম্মতি জানান সমীর কাকু। নীরবে বিকিকিনি সম্পন্ন হয় দুজনের দুই অমুল্য সম্পদের।

©Ayan

Share:

মোট পৃষ্ঠাদর্শন

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Blogger দ্বারা পরিচালিত.