অনেকক্ষণ ধরে ফোনটা বাজছে, ঘুম চোখে বিরক্ত হয়ে অভ্রকে ঝাঁকুনি দেয় রিনি।
"ফোনটা ধরো না, কতক্ষণ ধরে বাজছে।"
রবিবারের বাজারে এত সকাল সকাল
ফোন করছে কে আবার। ব্যাজার মুখে বিছানা থেকে নামে অভ্র। গিন্নির নিয়মে এখন
মোবাইলটা ঘুমানোর সময়ে বিছানায় আর রাখা যায় না। প্রায় ঘুমন্ত অবস্থায় ফোনটা ধরে
ও।
"হ্যালো!!"
"ভাই, এখন থেকে আমি মুক্ত কদিন। একটা
বসার প্ল্যান করা যাক।" বলে উঠল সাম্য
"মানে?"
"আরে তন্দ্রা কয়েক দিনের জন্য বাপের বাড়ি গেল। এই ওলাতে তুলেই তোকে কল
করছি।" না বোঝার জন্য যে ও খুব বিরক্ত, সেটা গলার স্বরে বুঝতে পারল অভ্র।
"তুই এর
জন্য রবিবার সকাল ৭টার সময় কল করে আমার ঘুম হারাম করছিস?" বেশ জোরেই কথাটা বলল ও।
"কে ফোন করেছে, সকাল সকাল চিৎকার করছো? একদিন একটু লেট করে উঠি বলে তোমার সহ্য হচ্ছে না।" রিনি বলে উঠল।
ফোন টা কানে নিয়েই ব্যালকনি তে
বেরিয়ে গেল অভ্র। সকাল থেকেই ম্যাডামের মুড অফ হয়ে গেলে মুশকিল।
ওদিকে সাম্য বলেই চলেছে, "আরে আগে ভাগে তোদের কে কল করছি
যাতে সুযোগ টা মিস না হয়। কজন হয় দেখে সেই মত বাজার দোকান টা সেরে নেব।"
অনেকদিন হল কারোর সাথে দেখা সাক্ষাৎ আর হয়ে ওঠেনা।
আগে তাও অফিস ফেরতা কোথাও কোথাও বসত ওরা। একটু আড্ডা মেরে ডিনার করে ফিরত। অভ্র
সাধারণত বাড়িতে বলে গেলেও অনেক বন্ধুরা ঢপ মারতেই বেশী অভ্যস্ত ছিল। তাই অনেক সময়
ফেসবুকে ছবিও দিতে পারত না। সাম্য হল এই গোত্রের পাবলিক। যদিও বউদের সঙ্গে নিয়েও
মাঝে মধ্যে আসর বসত ওদের। কিন্তু এই ওয়ার্ক ফ্রম হোমের বাজারে সবাই আরও জড়িয়ে
পড়েছে, পার্সোনাল টাইম আর ওয়ার্ক
টাইমের কোনও বিভাজন বিশেষ থাকছে না। সবাই কম বেশী ফ্রাস্টেটেট, ডিপ্রেসড। তাই মনে মনে বেশ খুশি
হল অভ্র।
"তা কবে
বসবি ভেবেছিস?"
"শুভসঃ
শীঘ্রম!! তোর কবে হবে বল, কাল বা পরশু।"
"পরশু
কর, তাহলে কাল একটু কাজ গুছিয়ে
নেব। একটু দেরী করে গেলেও দরকার হলে তোর ওখানেই রাত টা কাটিয়ে ফিরব।"
"বেশ, তাহলে বাকিদের ফোন করে কনফার্ম
করছি পরশু। আর হ্যাঁ, রিনি যেন আবার মহিলা মহলে পার্টির খবর দেয় না। তুমিও তো শালা বউ কে কিছু না
বলে থাকতে পারো না, পেট পাতলা মাল।"
"আরে
তুই চাপ নিস না তো। রিনি অতশত মাইন্ড করে না, ওকে বলতে বারণ করে দেব। একটু বলবে হয়ত আমায়, বেশ তো তোমরা এনজয় করবে। হতে
পারে আমার সাথে চলেই গেল তোর বাড়িতে।" বলেই হাসতে থাকে অভ্র
"না, ভুলেও রিনিকে আনবি না। তাহলে
কিন্তু গেট থেকেই বাড়ি পাঠিয়ে দেব।"
খানিক পরে রিনি ঘুম থেকে উঠলে
দুজনে একসাথে চা নিয়ে বসল ব্যালকনিতে।
"কে, ফোন করেছিল গো?"
"সাম্য।
ওই পরশু একটু ওর বাড়িতে আড্ডার জন্য বলছিল।"
"সেদিন
তন্দ্রা বলছিল মাল টা এত ল্যাদখোর হয়েছে যে পারলে অ্যাকোয়াগার্ড থেকে জলটাও
আরবান কোম্পানিকে ডাকিয়ে ভরায়। তা সে হঠাৎ সকালে উঠে আড্ডার আহ্বান করছে, তন্দ্রা নেই মনে হয় বাড়িতে।"
"তুমি
মহান, আমার শার্লক হোমস। এই জন্যই তোমাকে সাম্য এত
ভয় পায়। তুমি
আবার তোমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে এটা বলোনা। তোমার মত সবার বউ তো সমঝদার নয়।"
"থাক
থাক, সকাল সকাল আর বার খাওয়াতে হবে
না। অন্যদের বউদের মত তুমিও যদি একটু আমায় ভয় পেতে গো।"
"সেটা
হলে দুই ভীতু মিলে সংসার করতে কিভাবে?" মিচকে হাসতে থাকে অভ্র
"কি!!
আমি ভীতু, দাঁড়াও তোমার দেখাচ্ছি মজা।"
দুপুরের দিকে আবার ফোন করে
সাম্য। "গুরু, অল সেট। রজত আর তমাল ও আসছে। অনেকদিন পর চার জন মিলে মস্তি করা যাবে। চিকেন, চিংড়ি, ভেটকি ফিলে সব এনে রেখেছি। কাল
আমার কুক টাকে দিয়ে সব স্টাটার রেডি করিয়ে রাখব। রজত জলের ব্যবস্থা করবে। ওর
লাস্ট ট্যুর থেকে আনা বোতলটাও আনছে। তুই চলে আসিস তাড়াতাড়ি।"
"তুই
দেড় বছর বাইরে না বেরিয়ে এত এক্সাইটেট দেখিস যেন এর মধ্যেই হার্টফেল করে বসিস না।"
দুজনেই হাসতে থাকে। ওদের
চারজনের সেই স্কুল থেকে বন্ধুত্ব, প্রায় ৩০ বছরেও তা আগের মতই অটুট। ওদের মধ্যে তমালই যা বাউন্ডুলে রয়ে
গেল। না করল বিয়ে, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে চাকরি না করে ঢুকল বাবার প্রিন্টিং এর ব্যবসায়। এখন আবার
কি একটা এনজিও নিয়ে খুব মেতে থাকে। কখনও কখনও মনে হয় ওই বেশ ভাল আছে, নেই কোন পিছুটান, বাঁধনছাড়া জীবন।
দেখতে দেখতেই মঙ্গলবার উপস্থিত।
সন্ধ্যা পেরিয়েই সবাই হাজির হল সাম্যর বাড়িতে।
অভ্র ঢুকেছে সবার শেষে, ঘড়িতে প্রায় আটটা। আগেই বাকি
দুজন এসে অলরেডি এক পেগ চড়িয়ে ফেলেছে। অভ্র ঢুকতেই বেশ একটু লেগ পুল চলল।
"ভাই তুই কিন্তু বেশ আছিস। বউ না গার্লফ্রেন্ডের সাথে ঘর করিস বোঝা যায় না।
এখনও এত মাখো মাখো প্রেম যে ছেড়ে আসতে আটটা বাজিয়ে দিলি।" রজত বলল।
আধ ঘন্টার মধ্যেই এক প্লেট কাবাবও পগারপার। রজত আর সাম্যর শুরু হয়ে গেছে
দাম্পত্যের কুটকচালি। কাকে কত ওয়ার্ক ফর হোম করতে হচ্ছে, তাই নিয়েই চলছে দড়ি টানাটানি। একটা ফোন আসতে বারান্দায়
বেরিয়ে যায় তমাল। বাকিদের হুঁশ নেই সেদিকে। মিনিট খানেক পর ঘরে ঢুকে তমাল বলে, "আমাকে বেরোতে হবে এক্ষুনি। অভ্র
আমায় একটু ড্রপ করে দিতে পারবি বাঘাযতীনে?"
"মানে, হলো টা কি? অল ওকে? এই তো এলি, এর মধ্যেই চলে যাবি?" এক নিঃশ্বাসে বলে ওঠে সাম্য।
"এনজিও
থেকে কল এসেছিল, পাঁচ ছটা বাচ্চাকে উদ্ধার করা
হয়েছে ওই অঞ্চল থেকে। এক্ষুনি ওদের ওখান থেকে নিয়ে খাওয়া দাওয়ার আর হোমের
ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের টিমের প্রায় সবাই আজ গেছিল সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এক
গ্রামে, কিন্তু সেখান থেকে ওরা কেউ
ফিরতে পারেনি। আমাকে তাই যেতে হবে এক্ষুনি, দেখি কি করা যায়।"
"এত
রাতে খাবার পাবি কোথায়? বলছি আমাদের জন্য যা খাবার আছে এখনও, সেটাই নিয়ে গেলে কেমন হয়?" জিজ্ঞেস করে অভ্র।
"মানে
আমরা কিছুই না খেয়ে এখন এসব বিলোতে বেরোবো? আর ইউ ক্রেজি? তুই না পারিস বটে!! একদিন আড্ডা দিতে বসে.."
চিবিয়ে চিবিয়ে বলল সাম্য
"আরে
আলবাত যাব, আমরা এতক্ষণ যা খেয়েছি সেটা
মোর দ্যান এনাফ্। অভ্র তুই গাড়িটা পার্কিং থেকে বের কর। ততক্ষণে আমরা খাবার প্যাক
করে নামছি।" লাফিয়ে ওঠে রজত
সাম্য কিছু বলার আগেই রজত বলে, "সহজে একটু সাহায্য করার সুযোগ
পেয়েছিস, ছাড়িস না।" চোখ টিপে ওকে
নিয়েই রান্নাঘরে ঢুকল ও।
এক দায়িত্বপরায়ণ
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যুবক, এক উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন বন্ধু, এক অদম্য উদ্যমী সহচর আর এক আপাতবিমুখ খাদ্যরসিককে
নিয়ে গাড়ি ছুটল দুর্বার গতিতে বাইপাস ধরে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা পৌঁছে
গেল ওখানে। কাজে লেগে গেল তমাল ও বাকিরাও। আনুষঙ্গিক কাজকর্ম মেটাতে গেল তমাল আর
অভ্র। রজত কাছের দোকান থেকে কিছু পরিষ্কার জামা কাপড়ের ব্যবস্থা করতে গেল।
একটু পরে ফিরে এসে ওরা দেখে, পরম মমতায় বাচ্চাগুলোকে খাইয়ে
দিচ্ছে সাম্য। ওদের সাথেই হাসছে, গল্প করছে।
টুক করে মোবাইলটা বের করে
দৃশ্যটা ক্যামেরাবন্দি করল অভ্র। সাম্যকে মাঝে রেখে সবার সেল্ফি। জুকারবার্গের
দেওয়ালে পোস্টালো "টুগেদার ফর আ কজ"। ট্যাগ করল তন্দ্রা সহ সকলকেই।
©Ayan
রচনার তারিখ: ১লা সেপ্টেম্বর ২০২১