ছোট গল্পের সন্ধানে || কলমে অয়ন

  • বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন

    আনন্দ, উদ্বেগ আর প্রত্যাশার গণ্ডি পেরিয়ে চতুর্থ বারের জন্য অপেক্ষা দায়িত্বের। সেই দায়ভার থেকেই জন্ম এই চতুর্থ সন্তানের। আগের বারের "মৃত্যু রহস্য"র পর ইয়ং ইন্সপেক্টর সৌমিলির ডাক পড়েছে এক জটিল সমস্যার সমাধানে। গ্রাম বাংলার এক সুন্দর প্রকৃতির প্রেক্ষাপটে ঘটে চলেছে অদ্ভুত সব ঘটনা। যাকেই সে সন্দেহের তালিকায় আনছে, হঠাৎ করে সে-ই খুন হয়ে যাচ্ছে। সৌমিলি কি পারবে এই কেস সলভ করতে❓ তারই গল্প বলতে প্রকাশিত হচ্ছে আমার চতুর্থ বই "আই ক্যান্ডি" এবারের কলকাতা বইমেলা ২০২৫ এ ক্লিক করুন

  • বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন

    প্রথম বারের আনন্দ আর দ্বিতীয় বারের উদ্বেগের গণ্ডি পেরিয়ে তৃতীয় বারের জন্য অপেক্ষা প্রত্যাশার। সেই থেকেই জন্ম এই তৃতীয় সন্তানের। আগের বারের "পায়ে পায়ে রহস্য" র সাফল্যের পর ইয়ং ইন্সপেক্টর সৌমিলি সমাধান করে ফেলেছে আরও কিছু জটিল কেস। তারই গল্প বলতে প্রকাশিত হচ্ছে আমার তৃতীয় নতুন গল্পের বই "মৃত্যু রহস্য" এবারের কলকাতা বইমেলা ২০২৪ এ। আশা করি এই বই আমার পাঠকদের আনন্দ দেবে বিশদে জানতে ক্লিক করুন

  • কেনার জন্য ক্লিক করুন

    আজকের দুনিয়ায় টেকনোলজিও যত উন্নত হয়েছে, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে নিত্য নতুন অপরাধের ধরণ। একজন ইয়ং ইন্সপেক্টর কিভাবে কেসের পর কেসের কিনারা করবে, তারই বেশ কিছু ঝলক থাকবে পাঠকদের সামনে। বিশদে জানতে ক্লিক করুন

  • কেনার জন্য ক্লিক করুন

    মুঠোফোনের দুনিয়ায় আমার প্রথম বই শব্দের স্বরলিপি এনে দেবে একরাশ মুক্ত বাতাস। বিশদে জানতে ক্লিক করুন

  • প্রতি সপ্তাহে নতুন গল্প

    গল্প পড়ার থেকে শুনতে বেশি ভালবাসেন? বাচ্ছারা রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময় গল্প শুনতে চায়? তাহলে দেরী না করে সাবস্ক্রাইব করে রাখুন ইউটিউব চ্যানেলটা, আর বেল আইকন টা প্রেস করতে ভুলবেন না। আসছে প্রতি শুক্রবার রাত ৯ টায়। সঙ্গে থাকুন।

  • #ভোকাট্টা#

    চারপাশের আকাশে শুধু রঙ বেরঙের ঘুড়ি। এখনকার মত নানারকমের ক্যামেরা না থাকলেও ছবি গুলো উজ্জ্বল হয়ে থাকত স্মৃতির মণিকোঠায়। মাঝে মাঝে তারস্বরে চিৎকার, “ভো কাট্টা!

  • #অরণ্যে দুই রাত্রি#

    কথায় বলে বাঙালির পায়ের তলায় সর্ষে। কিন্তু এই বিগত দেড় বছরের করোনা পরিস্তিতিতে সবার মত তারাও হয়ে পড়েছিল ঘরবন্দি। তাই এখন একটু পরিস্তিতি ঠিক হতেই সবাই আবার বেড়িয়ে পড়েছে কাছে পিঠে। সেই রকমই একটা উইকএন্ড ডেসটিনেশনের কথা

  • কেনার জন্য ক্লিক করুন

    মুঠোফোনের দুনিয়ায় আমার প্রথম বই শব্দের স্বরলিপি এনে দেবে একরাশ মুক্ত বাতাস। বিশদে জানতে ক্লিক করুন


Best Bangla Books to Buy in 2024

#মেরি ক্রিসমাস#

 

merry christmas, bangla golpo


“কাল থেকে আর তোমাকে আসতে হবে না।“ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে অতসীকে বলে ঘরে ঢুকল মিঠু

আয়নার সামনে টাই টা ঠিক করতে করতে অরিজিৎ জিজ্ঞাসা করল “সাত সকালে হলো টা কি? তুমি কি বেরবে না? একে সকাল সকাল বিদায় করছ যে।”

“এত মিথ্যে কথা বলে, আর এখন তো আবার চুরিও করছে। হাতে নাতে ধরে ফেলেছি বলে সে কি তড়পানি ওর। তোমার আর কি? তুমি তো সেই সেম টাইমেই বেরিয়ে যাবে, আমার জন্য কি আর ছুটি নেবে? তোমার টাইম মত সব পেলেই তো হল।”

অরিজিৎ বুঝল আকাশ খুবই মেঘলা আজ, ঘূর্ণিঝড় আসতে চলেছে। কাজের লোকের পুরো ঝাড় টা আজ পড়বে ওর ওপরেই। তাড়াতাড়ি টিফিনবক্সটা তুলে নিয়ে মেয়েকে টা টা করে বেরিয়ে পড়ল। মিঠুকে বলল কিছু লাগলে ফোন করো। মিঠু আড়চোখে কটমট করে তাকাল শুধু।

মেয়েকে নিয়ে থাকতে ভালই বাসে মিঠু। কিন্তু হঠাৎ করে ছুটি নিলেই অফিসে ঝামেলা হয়, আজ আবার কিছু একটা বলতে হবে। কিছু মিথ্যে বললেই দেখেছে ঠিক কদিন পরে সেই একই কারণে আবার ছুটি নিতে হয়। সামন্ত দা কে একটা এসএমএস করে রাখল। এবার হাতের কাজ গুলো গুছিয়ে মেয়েকে নিয়ে বসল একটু। দেখতে দেখতে মেয়ের বয়স ছয় বছর হয়ে গেল। আর কিছুদিন পর থেকে ওর নিজেরই একটা জগৎ তৈরি হয়ে যাবে। সেই জন্য অনেকবার ভেবেও চাকরিটা ছাড়েনি ও। অতসীকে রাগের মাথায় বের করে দিলেও এবার সারাদিন মেয়েকে সামলাবে কে? মা কেও কি ফোন করে আসতে বলবে একবার। থাক, কাউকে না পেলে মা কে জানাবে। এমনিতেই ভাই রাগ করে বেশি আমার বাড়ি আসতে হলে। তখন ওর বউকেই হাত পুড়িয়ে রান্না করতে হয় আর কি। পটের বিবির নখের একটু নোংরাও থাকলে চলে না। একটু পরে একবার শ্যামলিদের বাড়িতে গিয়ে কাজের লোকের খোঁজ করে আসতে হবে।

এরপর মেয়েকে স্নান খাওয়া করিয়ে, নিজে স্নান করে ঠাকুর কে মালা ধূপ দিয়ে রেডি হয় মিঠু। উলটোদিকের ফ্ল্যাটের রিমলিকে একটু ফ্ল্যাটে বসতে বলে ঘুরে আসবে ভাবে। মেয়েও খেলনা নিয়ে খেলতে শুরু করে। কিন্তু বেরোনোর সময় দেখে রিমলিদের ফ্ল্যাটে তালা দেওয়া। ঠিক করে, মেয়েকে নিয়েই যাবে।

ঘরে ঢুকতেই মেয়ে বায়না করতে শুরু করে যে ও কোথাও যাবে না, ঘরেই খেলবে। মিঠু বলে, “তোকে তাহলে বাইরে থেকে চাবি দিয়ে যাব। থাকতে পারবি তো? আমি এক্ষুনি ফিরে আসব।”

“ঠিক আছে মাম্মাম, আমি তো বড় হয়ে গেছি নাকি? অতসী আন্টিও তো কাল থেকে আসবে না বললে, তখন আমায় একাই থাকতে হবে তো। একটু প্র্যাকটিস করে রাখি।”

“ওরে আমার পাকা বুড়ি রে। ঠিক আছে, চুপটি করে থেকো। আমি এক্ষুনি চলে আসব।” মনে মনে ভাবে, মেয়ে আমার বড় হয়ে গেল। এই প্রথম একা রাখছে বলে মন টা একটু খচখচ করলেও ভাবল, এক্ষুনি তো যাবে আর আসবে। বাইরে বেরিয়ে দরজায় চাবি দিয়ে বেরিয়ে যায় ও।   

একটু পরেই ডোরবেলটা বাজল একবার। ছুটতে ছুটতে দরজার কাছে গিয়ে ছোট্ট বাচ্ছাটা হাঁক পাড়ে, “কে এসেছ? এখন কেউ নেই বাড়িতে, পরে এসো।” কিন্তু ওর অসাবধানতায় কখন যে ঠাকুরের প্রদীপটা পড়ে গিয়ে আগুন লেগে গেল বুঝতে পারল না সে।

বাইরের সেলসম্যান টা পরের ফ্ল্যাটের বেল মারে। একটু পরেই ওই পাশের বন্ধ দরজা থেকে ভয়ার্ত চিৎকার ওই বাচ্চাটার।

“বাঁচাও, বাঁচাও !!!”

লোকটা বুঝতে পারেনা কি হয়েছে। নিচে গিয়ে আশেপাশের লোকজনকে জড়ো করে দেখতে পায় ওই ফ্ল্যাট থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী বেরছে। দু একজন মিলে ফ্ল্যাটের দরজার তালা ভাঙ্গার চেষ্টা করতে থাকে। একজন বলে ওদের কাজের লোক থাকে তো, সে কি নেই নাকি? কেউ একজন অরিজিৎ কে ফোন লাগায়, না পাওয়ায় ফোন করে মিঠুকে। শুনে তো মিঠুর হাত পা ঠাণ্ডা হওয়ার জোগাড়। হুড়মুড়িয়ে বাড়ির দিকে দৌড় দেয় ও। খবর যায় দমকলেও।

অতসী অন্য একটা কাজের খোঁজে গিয়েছিল আজই। সেখানেই কিছুটা সময় কাটিয়ে ফিরছে বাড়ি। আসলে এখন সবাই পরখ করে নিতে চায় কাজকর্ম পারে কিনা। ফেরার পথে বউদিদের বাড়ির সামনে দিয়েই ফিরতে হবে ওকে। বউদি ভালো ব্যবহার করলেও মাঝে মাঝে এত রাগ দেখাত না, তখনি মাথাটা খারাপ হয়ে যেত। কিন্তু ওই ছোট্ট বেবিকে মন থেকে দূরে সরাতে পারছে না ও। এরপর থেকে আর বাচ্ছার কাজ নেবে না, বড় মায়া পড়ে যায় ওদের ওপর।

ওদের ফ্ল্যাটের কাছে এসেই দেখে হুলুস্থুল অবস্থা। লোকমুখে ওই অবস্থা শুনে দৌড় লাগায় নিজের বাড়ির দিকে। বউদিকে ফোনে ধরার চেষ্টা করে, পায় না। দাদাকে ফোনটা লাগায় আর তাড়াতাড়ি আসতে বলে।

সকালে তাড়াহুড়ো করে বেরোনোর সময় বউদিদের ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবিটা দিয়ে আসেনি। ভেবেছিল বিকেলে কাজের শেষে ওদের দিয়ে আসবে। কে জানে না হলে হয়ত আবার চুরির দায়ে হাজতবাস করাবে।

চাবি নিয়ে এসে পড়িমড়ি করে উপরে উঠে ফ্ল্যাটের চাবি খোলে। তাড়াতাড়ি বের করে আনে ওর আদরের বেবিকে। পাড়ার লোকে ঘরে ঢুকে জল ঢেলে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে।

“কেন তুমি চলে গেছো আমায় ছেড়ে?” কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলে ওঠে বেবি।

কিছু বলতে পারে না ও। শুধু দুচোখ দিয়ে জলের ধারা বেরোতে থাকে। কি করে বোঝাবে এই শিশুকে যে এই পৃথিবীতে অনেক কঠিন বাস্তব অপেক্ষা করে থাকে অতসীদের মত মানুষদের জন্য।

পিঠে হাত রাখে মিঠু, দৌড়ে এসেই ওদের মিলন দৃশ্যে চোখ আটকায় ওর।

“মাম্মাম” বেবি এবার ছুটে আসে মিঠুর কাছে।

অতসীর হাতটা ধরে ক্ষমা চায় মিঠু, আর বেবির কাছে অতসীর হাত টা এগিয়ে দিয়ে বলে, “এই নাও তোমার ক্রিসমাসের উপহার। আজ থেকে অতসী মাসি তোমার।”

“ইয়ে”, চিৎকার করে ওঠে বেবি।

©Ayan

Share:

#বিকিকিনি#

Bengali Story Bikikini

বাবাই না? দূর থেকে দেখেই চিনেছে সমীর। আজকাল পার্কে এসে হাঁটার থেকে বেশি বসেই থাকতে হয়। হাঁটুর ব্যথাটা বেশ বেড়েছে ইদানীং। তখন এই পার্কের বেঞ্চিতেই বসে একটু লোকজনের খোঁজ খবর নেওয়া হয় আর কি।

কাছে আসতেই জিজ্ঞাসা করল “বাবাই, কেমন আছিস?”

“হ্যাঁ ভালো কিন্তু আপনি? ঠিক চিনলাম না তো!”

“আমি তোদের পাশের বাড়ি থাকতাম যখন তোরা সাহেব পাড়ায় থাকতিস। তুই তখন অনেক ছোট, আমাকে মনে নেই হয়ত তোর, সমীর কাকু। তোর বাবার সাথেও আমার যোগাযোগ ছিল। তা এখানে এলি কবে?”

“এই চার পাঁচ দিন হল।”

“তা এখন কি এখানেই থাকবি নাকি? তোর বাবা শেষ দিকে খুবই দুঃখ পেত। বলত, এত সব বানিয়ে একা আগলে রেখে কি লাভ? ছেলে মেয়েরা যদি কাছেই না থাকে, তাহলে কি জন্যই বা এত খেটেছি এককালে।“

“কি আর করা যাবে কাকু? এখানে চাকরি কোথায়? আর জানেনই তো দিনকালের অবস্থা। এখানকার সব বিক্রি করে চলে যাব পাকাপাকি।“

“সে কি রে? তোর বাবার অত শখের বাড়ি, আমরা তো জানি মানুষটা কিভাবে তিল তিল করে সঞ্চয় করে জমি কিনে সবটা করেছে। তোরা তখন কত ছোট। তোর মায়েরও শখ ছিল প্রচুর। মাঝে মাঝেই তোর বাবার সাথে কলকাতা গিয়ে নিয়ে আসত হরেক রকম ঘর সাজাবার জিনিস। আমার তো না ছিল তখন শখ, না ছিল তোর বাবার মত প্রথম থেকে সব গুছিয়ে রাখার অভ্যাস। তোর বাবার সাথে প্রতিদিন এই মর্নিং ওয়াকেই দেখা হত। তোদের নিয়ে কত গর্ব করত।”

একটু ইতস্তত করতে থাকে অনীশ মানে বাবাই। আজ পার্কে মর্নিং ওয়াক টা তো হলই না, উপরন্তু একগাদা সময় নষ্ট হচ্ছে বকবক করে। “কাকু, পরে আবার কথা হবে, আসছি।” বলেই ওনাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই পার্কের এক্সিট গেটের দিকে চলে গেল ও। তাড়াতাড়ি সব ব্যবস্থা করতে হবে। আজ একটা ব্রোকার একজনকে আনবে বলেছে সকালে। পনেরো দিনের জন্য ওয়ার্ক ফ্রম হোম ম্যানেজ করে এসেছে এখানে। তার মধ্যেই সব মিটিয়ে ফেলতে হবে ওকে।

বাড়িতে ফেরার কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্রোকার নিয়ে হাজির নতুন ক্রেতাকে। তাঁকে সব ঘুরিয়ে দেখিয়ে টাকাপয়সা নিয়ে আলোচনা করতেই কেটে গেল প্রায় একঘণ্টা। স্বস্তির কথা এটাই যে ওনার খুবই পছন্দ হয়েছে বাড়িটা। আর বাবা যেরকম শখ করে খুঁটিনাটি সব পছন্দ মত করেছিল, যে কারোর দেখলেই পছন্দ হবে এটা। এযাবৎ এই অঞ্চল জমজমাট হলেও বাবার মুখে শুনেছে যখন কিনেছিল জমিটা, এখানে প্রায় ধু ধু মাঠ। বন্ধুরা অনেকেই বারণ করেছিল কিন্তু। মা ও একদমই রাজি ছিল না এটায়। সমস্ত সঞ্চয় লাগিয়ে এই জায়গায় কিনতে মন চায়নি মায়ের, মায়ের যে শখ ছিল কলকাতায় ফ্ল্যাট। তাই, বাড়ি বানানোর সময় ও পরে বেশিরভাগ জিনিসই বাবা কলকাতা থেকে কিনে এনেছিল মায়ের পছন্দে। তখন ওসবের চল ছিল না এদিকে। যখন বাড়ি বানানো হয়, ওরা তখন খুবই ছোট, ক্লাস টু কি থ্রি, দিদি ফাইভ বোধহয়। তখনও আশেপাশে একটাও বাড়ি ছিল না। প্রায় বছর সাত-আট পরে আসতে আসতে গড়ে উঠেছে জনপদ। বাবার বন্ধুরা এলে মজা করে বলত, বউদি মনীশের ফার্ম হাউসে এসেছি। আড়ালে বন্ধুপত্নীরা বেশ ঈর্ষা করত মাকে। তখন মায়ের মধ্যে একটা ভাল লাগা কাজ করত। যদিও এসব আনন্দ বেশিদিন উপভোগ করতে পারেনি মা। কলেজে পড়ার সময়েই মা কে হারায় ও।

যাইহোক, এসব ভাবতে ভাবতে আজ অফিসের কাজে বেশ লেট করে ফেলেছে। তাড়াতাড়ি কাজ গুটিয়ে একবার অরুণের বাড়ি যেতে হবে সন্ধ্যায়। অরুণ ওর ছেলেবেলার বেস্ট ফ্রেন্ড, এখানেই একটা মুদিখানার দোকান করে গুছিয়ে বসেছে। ওকেই পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি করবে ভেবে রেখেছে ও। কারণ বারবার সব কাজে আসতে পারবে না এখানে। বিকেলের দিকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওর ও মনটা কেমন করছে বাড়ির জন্য। যতই হোক থাকে না এখানে, কিন্তু বেড়ে ওঠার ঘর বাড়ির মায়া কি কাটানো যায় এত সহজে? এরপর থেকে আর কখনো পার্মানেন্ট অ্যাড্রেস হিসেবে বলতে পারবেনা এটা। ও নিজেও কি প্রথমে ভেবেছিল এটা বেচবে? তারপর রুমি মানে ওর বউয়ের কথাতেই নিজের আবেগকে বসে আনে ধীরে ধীরে। মনে আছে প্রথম যেদিন রুমি বলেছিল বিক্রি করার কথা, কতই না ঝগড়া করেছিল ওর সাথে। পরে ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখে এটাই বেস্ট সলিউশন।

অরুণের বাড়িতেই আজ রাতে খাওয়ার জন্য বলেছে। আটটা নাগাদ কেক মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে ওর বাড়ি এলে অরুণও দোকান থেকে ওপরে উঠে আসে। বাড়ির তলাতেই দোকানটা। কাকু কাকিমাও থাকেন ওর সাথে। অনেকদিন বাদে দুই বন্ধুর আলাপচারিতার পর অরুন বলে ওঠে,

“সত্যিই কি বেচে দিবি বাড়িটা? আমাকে যে ভীষণ গুরু দায়িত্ব দিচ্ছিস তুই। আমার যদি সামর্থ্য থাকতো আমিই কিনে নিতাম এটা। কত ছোটবেলার স্মৃতি ওখানে। আমি তো তোদের বাড়িতেই পরে থাকতাম সবসময়। বিশ্বাস কর, তখন মনে হত আমাদের কেন এরকম সুন্দর বাড়ি নেই, আর তার সাথে থাকতো কাকিমার হাতের রান্না। আজ মনে হয়, এই বেশ ভালো আছি। সবাইকে নিয়ে সুখে দুঃখে। অন্তত শেষ জীবনে কেউ তো মুখে জল দেবার থাকবে।”

তারপর বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে ভুল টা বুঝতে পারে। কাকুর মৃত্যুর খবরটা অরুণই দিয়েছিল অনীশকে। কিন্তু তারপরের দিনেও আসতে পারেনি অনীশ। অফিসের কাজে আমেরিকায় ছিল তখন। আসতে লেগে গিয়েছিল আরও একটা দিন। এদিকে মরদেহ রাখার তেমন সুবিধা ছিল না বিশেষ। মুখাগ্নি টা করতে হয়েছিল অরুণকেই। তারপর বন্ধুর পিঠে হাত রেখে বলে, “কিছু মনে করিস না। তোকে আঘাত দিতে চাইনি।”

“ঠিকই বলেছিস তো। এত পড়াশোনা করে লাভ টা কি হয়েছে বল। বাবার ওই শেষ সময়ে না থাকতে পারাটা আজও আমায় প্রচুর কষ্ট দেয়। তবু তুই ছিলিস বলে বেয়ারিশ লাশ হয়নি।”

“বাদ দে ওসব কথা। সব বিক্রি হয়ে গেলে তোর ওখানে যাব কিন্তু সপরিবারে। থাকা খাওয়া ঘোরার ব্যবস্থা তোর।” এরপর ওকে একটু এগিয়ে দিয়ে আসে আর কিছু লাগলেই জানাতে বলে রাখে।

পরদিন বেশ কিছু ফোন এলেও ও বাড়ি বিক্রি হয়ে গেছে বলে জানিয়ে দেয় তাদের। দুপুরের দিকে ওই প্রথম দিনের ভদ্রলোক ফোন করে জানান যে এই বাড়ি উনি কিনবেন না। কারণ জানাতে বললে কিছু বলতে চান না উনি। অনেক করে রিকোয়েস্ট করার পর বলেন, এই বাড়িতে সুইসাইডের কেস টা বেমালুম চেপে গিয়েছিলেন দেখছি।

হঠাৎ করে ফিরে আসে অনেক বছর আগের একটা সকাল। যেদিন ঘুম থেকে উঠেই দেখেছিল ওর ক্লাস ইলেভেনে পড়া দিদির ঝুলন্ত দেহ। মনে হল অনেকদিন পর কেউ যেন কবর থেকে খুঁড়ে নিয়ে এল সেই অভিশপ্ত দিন টাকে। চুপ করে বসে পরে ও।

একটু ধাতস্ত হয়ে ভাবতে থাকে কেউ তো তেমন জানত না ঘটনা টা। আশেপাশে পাড়া প্রতিবেশিও তো ছিল না তেমন। খুব কাছের কিছু লোকজনই জানত এটা। এখনকার বাসিন্দারা তো কেউই জানার কথা নয়। তাহলে বিক্রিতে বাঁধা দিচ্ছে কে? অরুণ কি?

একটু মাথাটা ঠাণ্ডা করে ফোন করে অরুণকে। সব জানিয়ে জিজ্ঞাসা করে, “তুই কি কাউকে বলেছিস?”

“তুই কি পাগল? তোর মনে না থাকতে পারে দিদি আমাকেও ভাইফোঁটা দিত আর দিদির ওই ঘটনার পর আমি মাস খানেক তোদের বাড়ি যেতে পারিনি। তুই আমাকে সন্দেহ করছিস?”

“সেটা নয়। কিন্তু তুই ও তো বাড়িটা বেচতে দিতে চাস না। যাগ গে, বাদ দে। আচ্ছা, সমীর কাকু বলে কাউকে চিনিস? বাবার বন্ধু, বলল আমাদের পুরনো পাড়ায় থাকতো। সেদিন মর্নিং ওয়াকের সময় পার্কে দেখে নিজেই চিনতে পারলেন। অথচ, আমি মনে করতেই পারলাম না।”

“না তো। তোর সাথে আমার পরিচয় তো ওই ক্লাস ফাইভ থেকে। তার আগেই তো তোরা এই বাড়িতে চলে এসেছিস। আর একজন নেবে না বলেছে বলে তুই এত চিন্তা করিস না। দেখি আমি আর কোন ব্রোকার জোগাড় করতে পারি কিনা। আর সমীর বলে এই তল্লাতে একজনকেই চিনি, যে স্ট্যাম্প কাকু নামে পরিচিত। ওনার কাছে যা সব স্ট্যাম্প আছে না। তোকে একদিন নিয়ে যাব ওর কাছে। তোর পুরনো কালেকশনটা আছে এখনও?”

“না রে। ওসব শখ আহ্লাদ কবেই মরে গেছে।” মুখে বললেও মনের কোনে পুরনো স্ট্যাম্প জোগাড়ের হিড়িক গুলো ভিড় করে এল।

“ঠিক আছে, এখন রাখছি। পরে কল করব। সময় পেলে বাড়ি চলে আসিস।”

সন্ধ্যে থেকে ফোন খুঁজে বের করে যাদের বাড়ি বিক্রি হয়ে গেছে বলে বারণ করেছিল, তাদের আবার আসার কথা বলল অনীশ। পরের কয়েকদিন তারা এসে দেখে গেলেও দিন কয়েক পরেই সবাই রিজেক্ট করতে থাকে বিভিন্ন অজুহাতে। মন টা বেশ খারাপ হয়ে যায় ওর। মনে আসতে থাকে বেশ কিছু কুসংস্কার। ভাবতে থাকে বাবা, মা, দিদি সবাই বোধহয় বেচতে দিতে চায়না এটাকে।

শুক্রবার সন্ধ্যায় অরুণ আসবে বলে ওর বাড়িতে। রাতে একটু খাওয়ার আরেঞ্জমেন্ট করে ও। অরুণ আসার একটু আগেই একজনের কল আসে ওর মোবাইলে। সে জানায়, কাল বাড়িটা দেখতে আসবে। এবার আর টাইম ওয়েস্ট করতে চায় না অনীশ। আগে থেকেই ক্রেতা কে জানিয়ে দেয় বাড়ির পুরনো কাহিনী। ওর বাবার পরম যত্নে তৈরি বাড়িকে আর কাউকে রিজেক্ট করতে দেবে না ও। উনি আর কিছু না বলে পরের দিন আসবেন বলেন।

অরুণ আসার পর বেশ আনন্দের সাথে খবরটা জানায় ওকে। অরুণ বলে, “তোর জন্যও একটা সারপ্রাইজ আছে। কাল বিকাল টা ফাঁকা রাখিস।” দুজনে বেশ জমাটি আড্ডা দেয়।

পরদিন দশটা নাগাদ বেল বাজে অনীশের “আনন্দ নিকেতন” এ। ওর বাবার দেওয়া নাম এই বাড়ির।

“আপনি? আসুন আসুন” আগন্তুক সেই সমীর কাকু। এই অসময়ে ওনাকে দেখে একটু বিরক্ত হয় ও। একটু পরেই আবার ওই বাড়ির সম্ভাব্য ক্রেতার আসার কথা।

“আমিই ফোন করেছিলাম তোমায় কাল।”

এবার একটু অবাক হওয়ার পালা অনীশের, “আপনিই বাড়ি টা কিনতে চান বলে ফোন করেছিলেন?”

“হ্যাঁ, তোমার থেকে এই বাড়ি বিক্রির খবর টা পাওয়ার পর থেকেই মন টা আনচান করছিল। যা কিছু জমানো ছিল সব জোগাড় না করে তোমাকে জানাতে পারছিলাম না। তুমি যাতে ভেবে না বোসো তোমার বাবার বন্ধু হয়ে আমি অন্যায় সুবিধা নিয়ে কম দামে কিনে নিতে চাইছি। তাই তুমি যা দর দিয়েছ তাতেই নেব। তুমি বাকি সব কাগজপত্রের ব্যবস্থা কর। আর তোমার অ্যাডভানস আমি দিন তিনেক পর দিয়ে যাব। এর মধ্যে আবার অন্য কাউকে দিয়ে দিও না যেন।”

“ঠিক আছে। চলুন, বাড়িটা ঘুরে দেখাই।”

“এ বাড়ির আর কি দেখাবে? এর প্ল্যান হবার থেকেই আমি ছিলাম তোমার বাবার সঙ্গী। মাঝে বেশ কিছু বছর সরকারি ট্রান্সফারের চাকরির জন্য থেকেছি এদিক ওদিক। কিন্তু রিটায়ার করার পর এখানেই ফিরে এসেছি। তাই তোমাদের বড় হওয়া টা আমার চাক্ষুষ হয়নি। কিন্তু তোমার বাবার থেকে গল্পে আর ছবিতে সবই দেখেছি। আসি এবার। আমাকে জানিও সব রেডি হলে।”

ওনাকে একটু জলযোগ সহকারে আপ্যায়ন করে উকিল বাবুকে কল করে সব রেডি করতে বলে ও। দেখতে দেখতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়। হঠাৎ হুড়মুড় করে বাড়িতে আসে অরুণ।

“এখনো রেডি হোসনি? তাড়াতাড়ি বের হ।”

তড়িঘড়ি রেডি হয়ে ওর বাইকের পিছনে যেতে যেতে জিজ্ঞাসা করে, “আমরা যাচ্ছি কোথায়?”

“চল না আগে?”

প্রায় মিনিট কুড়ি পরে পৌঁছয় গন্তব্যে। একটা পুরনো বাড়ির সামনে এসে বেল বাজায় অরুণ। অনীশ কে বলে, তোকে সেই স্ট্যাম্প কাকুর কথা বলেছিলাম না, কাল রেল ব্রিজের দিক থেকে ফেরার পথে ওনার সাথে দেখা। বললাম আমার এক বন্ধুকে আনব আপনার কালেকশন দেখাতে। বলল আজই আনতে, পরে নাকি আর হবে না।

“এসো ভিতরে এসো”, দরজা খুলে বেরলেন বাড়ির কর্তা।

আরও একবার অবাক হওয়ার পালা অনীশের। “আপনি?”

“তুই চিনিস নাকি স্ট্যাম্প কাকু কে?” অরুণ জিজ্ঞাসা করে।

“আলাপপরিচয় সব ভিতরে ঢুকে করো।“ বসার ঘরে বসিয়ে উনি আনতে গেলেন ওনার কালেকশন।

“আরে ইনিই তো সেই বাবার বন্ধু সমীর কাকু, তোকে বলেছিলাম না। আজ সকালে ইনিই এসে বাড়িটা কিনবেন বলেও জানিয়ে গেলেন“, অনীশ বলে উঠল।

“ইনি অত টাকা পেলেন কি করে? শুনেছি তো সরকারি চাকরি করতেন। যদিও সংসারে তো আর কেউ নেই।” অরুণ বলল।

“তোমাদের চিন্তার কোন কারণ নেই। কাকু কোন চুরি ডাকাতি করে বাড়ি টা কিনছে না। এই আমার সারা জীবনের স্ট্যাম্প কালেকশন। এগুলোকে বিদায় করেই অন্য সম্পদে হাত দিচ্ছি। যতই হোক আমার বন্ধুর প্রথম স্বপ্নের সাথী। আর একটা কথা তোমাদের জানিয়ে রাখা ভালো, তোমাদের পুরনো খদ্দেরদের আমিই বিদায় করেছি ওই ব্রোকারের সাহায্যে। তাই ওই দুঃস্বপ্নের ঘটনাটা আমাকে বলতে হয়েছিল। আমাকে মাপ করো। একটু টাইম বাই করেছি টাকাপয়সা জোগাড় করতে। যদিও ব্রোকার টাকে একটু বেশি লোভ দেখাতে হয়েছিল।”

অনীশ ইতিমধ্যে ডুবে গেছে কাকুর স্ট্যাম্প কালেকশনে। পাতার পর পাতা দেখে চলেছে, দুচোখে অপার বিস্ময়।

“এগুলো কি অলরেডি বিক্রি করে দিয়েছেন?” মুখ না তুলেই জিজ্ঞাসা করে অনীশ

“একজনের সাথে কথা হয়ে আছে, দিন তিনেক পর ফুল পেমেন্ট করবেন।”

“এগুলো কি আমাকে বিক্রি করবেন?” জানতে চায় অনীশ

সম্মতি জানান সমীর কাকু। নীরবে বিকিকিনি সম্পন্ন হয় দুজনের দুই অমুল্য সম্পদের।

©Ayan

Share:

#অরণ্যে দুই রাত্রি#

bangla short story blog অরণ্যে দুই রাত্রি


কথায় বলে বাঙালির পায়ের তলায় সর্ষে। কিন্তু এই বিগত দেড় বছরের করোনা পরিস্তিতিতে সবার মত তারাও হয়ে পড়েছিল ঘরবন্দি। তাই এখন একটু পরিস্তিতি ঠিক হতেই সবাই আবার বেড়িয়ে পড়েছে কাছে পিঠে। সেই রকমই একটা উইকএন্ড ডেসটিনেশনের কথা বলব এই পর্বে।

পুজোর ঠিক আগেই হঠাৎ ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান হল আমার বেশিরভাগ ট্যুরের সাথী বন্ধুর পরিবারের সঙ্গে। জায়গাটা নির্বাচন ছিল আগেই, অনেকের ঘোরার ছবি দেখে একটা আকর্ষণ ছিলই। কিন্তু রুম বুকিং করতে গিয়ে বিভিন্ন হোটেলে ফোন করতে গিয়ে বুঝলাম আমরা অনেক লেট করে ফেলেছি। তবুও, আশা না ছেড়ে চেষ্টা করতে থাকি দুজনেই। ফল ও পাওয়া গেল হাতেনাতে। একটা রিসর্ট পাওয়া গেল, যদিও পুজোর উইক বলে একটু বাজেট বেড়ে গেল রুম রেন্টে, কিন্তু পড়ে পাওয়া দুই খানা রুম হাতছাড়া করতে মন করল না কারোরই। অনেকদিন পর ঘুরতে যাওয়ার উত্তেজনায় তখন ছটপট করছি আমরা।

কিন্তু বিধি বাম, যাওয়ার এক সপ্তাহ আগে বন্ধু হয়ে পড়ল অসুস্থ। তাই, ঠিক করলাম ক্যানসেলই করে দেব। প্রসঙ্গত বলে রাখি, এই রিসর্টেই মার্চে একবার যাওয়ার প্ল্যান হয়েছিল, কিন্তু সেটাও বুকিং এর পর ভিন্ন কারণে বানচাল হয়। তাই, বাড়ির লোকের মনে এই চিন্তা এল, এটায় বোধহয় বাঁধা আছে, হবে না আর যাওয়া এখন। তখনই ঠিক করলাম, যাবই তাহলে।

গন্তব্য ঝাড়গ্রাম, হাওড়া থেকে প্রায় ৩ ঘণ্টার মানে ১৫০ কিলোমিটারের জার্নি, কলকাতা থেকে আরও আধ ঘণ্টা বেশি। সকাল ৭ টায় যাত্রা শুরু করলাম তিনজনে, সঙ্গী আমাদের ড্রাইভার দাদা। মনের মধ্যে একটা বিসন্নতা ছিল বন্ধু না যাওয়ার জন্য, কিন্তু ধীরে ধীরে ষষ্ঠীর সকাল সেই ক্লান্তি দূর করে দিল।

ধীরে ধীরে ইট কাঠের বেড়াজাল ফেলে এগিয়ে চললাম আমরা। মাঝে কোলাঘাটের কাছে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ব্রেকফাস্ট করে নিলাম, সঙ্গে ভাঁড়ের চা। এখানে বলে রাখি, এই এলাকায় পাবেন একাধিক সস্তা থেকে মাঝারি ধরনের রেস্তোরাঁ। যেকোনো একটি তে সেরে ফেলতে পারেন পেটের ফুয়েল। পথে পড়বে ৩ টে টোল ট্যাক্স। প্রথমটা ধুলাগড়, পড়বে ১১০ টাকা (ওয়ান ওয়ে), তারপর ডেবরা পড়বে ৬৫ টাকা (ওয়ান ওয়ে), আর লোধাশুলি ঢোকার একটু আগে আর একটা টোল ট্যাক্স পড়বে ৭০ টাকা (ওয়ান ওয়ে)। যেহেতু ১ রাত্রি ২ দিনের ট্রিপ করলে সব দেখতে পাবেন না, তাই রিটার্ন টোল ট্যাক্সের সুবিধা পাবেন না। ফেরার সময়ও সেম ফেয়ার দিতে হবে।

লোধাশুলি মোড় থেকে ডানদিকে ঢুকলেই একরাশ প্রকৃতি ঝাঁপিয়ে পড়বে সামনে। দুপাশের ঘন শালবন, তার মাঝ দিয়ে পথ গিয়েছে এঁকে বেঁকে। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, লোধাশুলি মোড়ের ফ্লাইওভার টা ধরবেন না, নিচের আন্ডারপাস দিয়ে ডানদিকে যেতে হবে। গুগুল বাবা এখানে ধোকা দিতে পারে আপনাকে। আমরা যে রিসর্টে ছিলাম, সেটা পেরিয়ে ঢুকতে হবে ঝাড়গ্রাম শহরে। ঘড়িতে দেখলাম ১০.৩০ টা বেজেছে। আর হোটেলের চেক-ইন টাইম ১১.৩০ টা। তাই হোটেল মুখো না হয়ে পাড়ি দিলাম প্রথম স্পটের দিকে।

গন্তব্য সাবিত্রি মন্দির। এটা প্রায় ৩৫০ বছর পুরনো। রয়েছে পাথরের দেবী সাবিত্রির মূর্তি। এই মন্দির চত্বরেই চলছিল দুর্গা পুজো। তাই এটাও একটা উপরি পাওনা। মন্দিরের মধ্যে বেশ কিছু সুন্দর ছবিও তোলা হল। তারপর আবার যাওয়া হল পরের গন্তব্যে।

এবার পৌঁছলাম ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি। সত্যি বলতে যেরকম মনে মনে কল্পনা করেছিলাম তার খুব একটা মিল পেলাম না। প্রথমত, যদি আপনি ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্যুরিজমের ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি থাকার জন্য বুক না করে থাকেন, তাহলে এখন আর ভিতরে প্রবেশ করতে দেয় না। মেইন গেটের বাইরে থেকেই ছবি তুলে ফিরত আসতে হবে আপনাকে। যদিও ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি টুরিস্ট কমপ্লেক্সও বেশ ভালোই শুনেছি। বিশদ পাবেন আমার ইউটিউব চ্যানেলের এর ভিডিওর (দেখুন পর্ব ১) ডেসক্রিপশনে। এদিক ওদিকে কিছু ফ্রেম বন্দি করে ঘড়িতে দেখি ১১.৩০ বাজতে চলেছে। রওনা দিই রিসর্টের দিকে। আসার পথে ওই দুপাশের শালের জঙ্গলের মধ্যের রাস্তায় ফটোস্যুটও চলল কিছুক্ষণ।  

একটু পরেই আমরা পৌঁছলাম আরণ্যক রিসর্টে। বেশ অনেকটা জায়গা নিয়ে লাস্ট ইয়ারেই তৈরি হয়েছে এটা। আর এই মনোরম পরিবেশের জন্য খুব তাড়াতাড়ি পরিচিতি পেয়েছে এরা। গাড়ি পার্ক করার ও সুবন্দোবস্ত আছে এখানে। ড্রাইভারের রুমও অ্যাভেলেবেল ৫০০ টাকায়। খুব তাড়াতাড়ি দিয়ে দিল আমাদের গ্রাউন্ড ফ্লোরের রুম। সামনেই পুল, চারদিক খুব সুন্দর করে সাজানো। ঘরে গিয়ে স্নান করে ফ্রেশ হয়েই সবাই মিলে গেলাম লাঞ্চ করতে। মাঝে এসেই একবার অর্ডারটা করে গিয়েছিলাম। খাওয়ার জায়গাটা ছোট হলেও বেশ গোছানো।  

খাওয়ার পরেই প্রায় ২.৩০ টে নাগাদ আবার বেড়িয়ে পড়লাম। প্রথমে গেলাম চিল্কিগড় রাজবাড়ি দেখতে। এটা প্রায় ২২-২৩ কিলোমিটার দূর। পৌঁছতে সময় লাগলো প্রায় ৪০ মিনিট। কিন্তু এই ভগ্নপ্রায় রাজবাড়ি দেখেও নিরাশ হতে হল। এই বাড়ির একদিক এখনো মেইনটেন হয়, যেদিকে গভর্নমেন্টের একটা অফিস আছে। সেদিকে টুরিস্ট নট অ্যালাওড। অন্যদিকে পুরনো মন্দির। সামনে একটা বিরাট মাঠ, আশপাশের বাচ্ছারা খেলে বেড়াচ্ছে সেখানে।

কিছুটা সময় এখানে কাটিয়ে গেলাম কনক দুর্গা মন্দির দেখতে। চিল্কিগড় থেকে মিনিট দশেকের পথ। এখানে গাড়ি পার্কিং এর আলাদা ফি আছে। গাড়ি রেখে একটা সুন্দর দুপাশে গাছে মোড়া পথ দিয়ে যেতে হয় মন্দির প্রাঙ্গনে। দুদিকে অনেক ভেষজ গাছগাছালি, তার মাঝে অনেক হনুমানও বসে থাকে ওখানে। তাই খাবার, মোবাইল, ক্যামেরা একটু সাবধানে নিয়ে যাবেন। পুরনো মন্দিরটি ভগ্নপ্রায় যা তৈরি হয়েছিল প্রায় ৫০০ বছর আগে। সামনেই তৈরি হয়েছে নতুন মন্দির, রয়েছে পুজো দেওয়ার ব্যবস্থাও। কনক মানে সোনার তৈরি মূর্তি যা এখানকার বিশেষত্ব, উচ্চতা মাত্র ২ ফুট মত। একটা শান্ত ভাব আছে চারদিকে। মন্দির চত্বরে কিন্তু অনেক হনুমান আছে, তাই নিজের ব্যাগ ও জিনিসপত্র সাবধানে নিয়ে যাবেন।  

মন্দিরের পিছনের দিক দিয়েই চলে যাওয়া যায় কিছুটা নিচের দিকে। সিঁড়ি করা, ধাপে ধাপে পা ফেলে পৌঁছে যাওয়া হল ডুলুং নদীর পাড়ে। প্রায় সূর্যাস্তের সময় পড়ন্ত রোদে শোভা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। এসব দৃশ্য ফ্রেম বন্দি করে এবার ফেরার পালা। আজকের দিনের এই স্পট টাই ম্যান অফ দ্য ম্যাচ। এর, এদিকে ফেরার পথে গিন্নির পাদুকা দেহ রেখেছিল, তাই পরের গন্তব্য ম্যাপে সেট করতেই হল স্যু শপ, ভাগ্যক্রমে কাছেপিঠেই পাওয়া গেল তার সন্ধান।

রিসর্টের ঘরে ফিরে ফ্রেশ হয়ে একটু স্ন্যাক্সের ব্যবস্থা করা হল। বাইরের লনে একটু বসা হলেও মশার উপদ্রবে বেশিক্ষণ টেঁকা গেল না। জানা গেল, এরা রাত ৮ টার মধ্যেই ডিনারের অর্ডার নিয়ে নেয়। রাতে রুমেই খাবার আনিয়ে নেওয়া হল। প্রথম দিন টা ঝুপ করে কেটে গেল। দিনের বেলার গরমটা কখন যেন কেটে গিয়ে বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা আবহাওয়া হয়ে গেছে।

সপ্তমীর সকাল, দ্বিতীয় দিনের সূচনা হল অ্যালার্মের ডাকে। দরজার বাইরেই সুন্দর সকাল অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য। ঘরে রাখা চায়ের সরঞ্জাম দিয়ে চা তৈরি করে তাড়াতাড়ি রেডি হওয়া হয় সেদিনের ট্রিপের জন্য। আর হ্যাঁ, এদের আর একটা স্পেশালিটি সব ইউটেন্সিলে নিজেদের লোগো লাগানো, বেশ সুন্দর দেখতে সেই লোগো টাও। ডিটেইলস পাবেন আমার ইউটিউব চ্যানেলে (দেখুন চ্যানেলের লিঙ্ক)

আমরা নিয়েছিলাম পুজো স্পেশাল প্যাকেজ, থাকা ছাড়া চার বারের ফুল খাওয়া দাওয়া সমেত ব্যবস্থা। সেদিন যেহেতু অনেকটা সময় বেলপাহাড়ির দিকে যাবে আর ফিরতে দেরী হবে, আগে থেকে জানিয়ে রাখলাম হোটেলের ম্যানেজারকে। খুবই সহযোগিতার সাথে জানালেন তিনি, ফেরার এক ঘণ্টা আগে জানিয়ে দিতে আর দুপুর সাড়ে তিনতে পর্যন্ত খাওয়ার আয়োজন থাকবে।

ব্রেকফাস্টে লুচি, আলুরদম, পোহা, ব্রেড টোস্ট, এগ, জ্যুস ইত্যাদির সাথে ছিল বেশ সুন্দর গোলাপজাম। খেতেও বেশ। পেট পুরে টিফিন করে ৮.৩০ নাগাদ বেরনো হল বেলপাহাড়ির পথে। রিসর্ট থেকে প্রথম যাচ্ছি আমরা ঘাগরা জলপ্রপাত দেখতে। দুটো রাস্তা আছে যাওয়ার, সময় আর ডিসটেন্স প্রায় একই, ৫৫ কিলোমিটার। আমরা নিলাম এস এইচ ৫ যাতে রাস্তাটা ভালো পাওয়া যায়। কিছুটা এগুলোই দেখা গেল চোখ জুড়োনো সৌন্দর্যের মধ্যে দিয়ে রাস্তা গেছে, দুপাশে ক্ষেত আর মাঝে মাঝে কাশফুলের বন। শহুরে আবর্জনার লেশ মাত্র নেই এখানে। বেলপাহাড়ি পৌঁছতে লাগলো প্রায় এক ঘণ্টা। এবার সেখান থেকে ডানদিক দিকে যেতে হবে ঘাগরার দিকে। এই দিকের রাস্তা কিন্তুটা রুক্ষ, ধুলো বালির মেঠো রাস্তাও রয়েছে কিছুটা। অবশেষে পৌঁছলাম গন্তব্যে। নেমেই দেখি একজন জাওয়ান এসে আমাদের নাম ধাম, গাড়ির ডিটেইলস নিয়ে গেল। বুঝলাম, জঙ্গলমহল এখন শান্ত হলেও প্রশাসনের নজর রয়েছে চারদিকেই। একটু এগোতেই দেখলাম একদল স্নানের পোশাকে নেমে যাচ্ছে ঝরনার নিচের দিকে যেটা প্রায় সরু নদীর মত, দেখা যায় গাড়ি পার্কিং এর জায়গা থেকেই। বাম দিক দিয়ে একটু উঠতেই দেখি ভীষণ সুন্দর মন ভরানো ঘাগরা। জঙ্গলের মধ্যে থেকে বেড়িয়ে এসেছে তারাফেনি নদী, পাথরের খাঁজ দিয়ে তীব্র গতিতে চলে যাচ্ছে জল। পুরো জায়গাটাই পাথুরে, যেতে হবে পাথরের ওপর ভর করেই, মাঝে মাঝে বিশাল বিশাল গর্ত। তাই বয়স্ক বা বাচ্ছা নিয়ে গেলে একটু সাবধানে উঠবেন এদিকে। এখানে অনেক ফটো তোলা হল। আমাদের ড্রাইভার দাদাও বেশ এঞ্জয় করেছিল, বলছিল এটাতেই গতকাল এলে পারতেন ওই ভাঙ্গা রাজবাড়ি না দেখে।

তো যাইহোক, পরের গন্তব্য তারাফেনি ড্যাম। ঘাগরা থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যেই তারাফেনি ড্যাম। দুপাশে সাজানো রেলিং দেওয়া রাস্তা। প্রায় দশটা লক গেট আছে এখানে। বেশ কয়েকটা খোলা ছিল তখন। এই নদীর জলের কালার টা একটু ভিন্ন। একটু দূর থেকে নদী ও ড্যাম টা দেখতে লাগছিল বেশ। সুন্দর ফটোজেনিক ভিউ আছে এখানে, সুন্দর মেমরি সাথে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম পরের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। আর হ্যাঁ, এখানেও আমাদের সব ডিটেইলস নথিবদ্ধ হল।

প্রসঙ্গত বলে রাখি খুব একটা দিক নির্দেশের সাইন বোর্ড চোখে পড়েনি এদিকে। তাই, গুগুল ম্যাপের ভরসাতেই যাত্রা করতে হচ্ছিল। তাই মোবাইল টা ফুল চার্জ দিয়েই বেরোবেন সকালে। আসলে এই অঞ্চল কিছুদিন হল পর্যটকের মুখ দেখছে, তাই আশা রাখি কিছুদিন পরে নিশ্চয়ই এদিকে নজর দেবে ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্যুরিজম। এরপর যাচ্ছি খান্দারানি লেক, দূরত্ব তারাফেনি থেকে প্রায় পনেরো কিলোমিটার। জায়গাটা আমলাশোল, শেষের দিকের কিছুটা রাস্তা বেশ খারাপ এখানে। তাই পৌঁছতে সময় লাগলো একটু বেশি। কিন্তু নেমেই দেখি কি অপূর্ব দৃশ্য। সামনে পাহাড়, চারদিকে জঙ্গল আর মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে নদী। তার ওপরে রয়েছে ড্যাম। ড্যামের ওপরের ব্রিজটায় দাঁড়িয়ে সামনে তাকালে মনে হয় যেন রাস্তা টা গিয়ে মিশেছে ওই পাহাড়ের নিচের জঙ্গলে। ততক্ষণে সূর্য প্রায় মধ্য গগনে। এখান থেকে এবার পাড়ি দেওয়ার পালা পরের গন্তব্যে।

যাচ্ছি আমরা হুদহুদি জলপ্রপাত দেখতে। একে লোকাল লোকেরা ধাঙ্গিকুসুম জলপ্রপাতও বলে। যথারীতি গুগুল ম্যাপে লোকেশান দিয়ে কিছুদুর এগিয়ে দেখছি রাস্তা ক্রমস্যই সরু হতে থাকছে। আশেপাশে লোকজনের দেখা নেই তেমন। কিছুদূর গিয়ে স্থানীয় লোকেদের থেকে জানলাম আছে একটা ঝরনা, কিন্তু লোকাল ভাষায় কেউই তাকে হুদহুদি বা ধাঙ্গিকুসুম নামে বলছে না, শুধুই বলে আছে আগে একটা ঝরনা। বেশ কিছু টা আরও এগোতে থাকলাম জঙ্গলের মধ্যে দিয়েই, রাস্তা আরও সরু হয়েছে, ড্রাইভার দাদার ভরসায় কিছুটা এগিয়ে একটা চায়ের দোকান পেলাম। সেখানে জনৈক একজন জানাল, সামনের রাস্তা বাইক গেলেও গাড়ি যাওয়ার জন্য উপযুক্ত নয়। তবুও আর একটু এগোতে থাকলাম গুগুলের ভরসায়। মধ্য দুপুরের ঘন জঙ্গলেও একটা গা ছমছম ভাব আসতে থাকল। চারদিকে কেউ নেই, শুধু সরু রাস্তা দিয়ে গাড়িটা যাচ্ছে, ইতিমধ্যে এতটাই সরু হয়ে গেছে যে, গাড়ির জানলা দিয়ে দুপাশের গাছ ও ঢুকে যাচ্ছে মাঝে মধ্যে। এবার মোবাইল নেটওয়ার্কও দেহ রাখল। আর ভরসা পাওয়া গেল না এগোনোর। গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে চললাম বেলপাহাড়ির দিকে। আবার মোবাইলে ইন্টারনেট কানেক্টিভিটি আসতে বুঝলাম গুগুল বাবা ওনার টেকনলজি দিয়ে দ্রুততম রাস্তা দেখাতে গিয়ে এই কেচ্ছাটা করেছেন। আপনাদের জন্য দেওয়া রইল ম্যাপের লিঙ্ক ও ছবি আমার ইউটিউব চ্যানেলে (দেখুন ভিডিও)। যাতে আপনাদের একই ভোগান্তি না হয়।

এবার বেলপাহাড়ি হয়ে গেলাম হুদহুদির দিকে। এই রাস্তাটা খান্দারানি লেক থেকে বেলপাহাড়ি মোরে আসার ঠিক আগেই যে ডানদিকের রাস্তা টা ঢুকছে, সেটা ধরতে হবে। দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার, কিন্তু সময় লাগলো পাক্কা একঘণ্টা। প্রায় দুটোর সময় পৌঁছলাম ওখানে, আর একটা নাম ও আছে ধাঙ্গিকুসুম ভিউ পয়েন্ট। এরপর পাথুরে সরু হাঁটা পথ ধরে ফাইনালি এসে পড়লাম ফল্‌সে। মাঝে হেঁটে আসার পথে পড়েছে একটা নদীর স্রোত। পাথর বিছানো রাস্তা পেরিয়ে নামতে হয়েছে নিচে প্রায় এক কিলোমিটার মত। ওখানে গিয়ে ঝরনার পাড়ে অনেক ছবি তোলা হল। তারপর ওপরে ওঠার সময়ে পেটে ছুঁচো ডাকতে শুরু করে দিয়েছে।

অনেকে বেলপাহাড়িতে লাঞ্চ করে আবার বাকিটা দেখে। আর কিছু জায়গা আছে যা আপনারা চাইলে যেতে পারেন যদি সময় থাকে। যেমন, কাঁকরাঝোড় জঙ্গল, লালজল কেভ, গাড্রাসিনি হিল। বলে রাখা ভালো, গাড্রাসিনি হিলে উঠতে সময় লাগবে ৪০ মিনিট মত। সঙ্গে বাচ্ছা বা বয়স্ক থাকলে না যাওয়াই ভালো। কিন্তু সময় আরও একদিন থাকলে যেতে পারেন এই স্থান গুলো। আর আমাদের মতই ঘুরতে হলে সাথে রাখুন জল আর শুকনো খাবার।

ম্যানেজারের কথা মত করে দিয়েছিলাম ফোন ফেরার একঘণ্টা আগেই। প্রায় চারটের দিকে রিসর্টে ফিরে একটু ফ্রেশ হয়েই যাই ওদের কনফেরেন্স হলে। ওখানেই এদের আজ থেকে সব বাফে মিলের আয়োজন। এত ঘোরাঘুরি করার পর এরকম বাহারি খাওয়ার ব্যবস্থা দেখে মন ভরে গেল। দু তিনতে পরিবারই এই সময়ে লাঞ্চ খেলো। এত খাওয়া দাওয়ার পর একটু শরীরটা বিছানা খুঁজছিল। টুক করে মেরে দিলাম একটা পাওয়ার ন্যাপ।

সন্ধ্যায় দরজায় নক করে বলে গেল যে চা কফির আয়োজন হয়েছে বাইরে। আমরা রিকোয়েস্ট করতে হাসিমুখে দিয়ে গেল ঘরে। এবার একটু সাজু গুজু করে চারদিকে ঘুরে ফটোসেশনের সময়, যতই হোক সপ্তমী বলে কথা। বেরিয়ে আবার দেখলাম রকমারি স্ন্যাক্সের আয়োজন। আবার চা সহযোগে খেতে খেতেই দেখি লোকাল আদিবাসী বৃন্দ পরিবেশিত একটা সুন্দর অনুষ্ঠান হতে চলেছে। কিছুটা বসে, কিছুটা ঘুরে কখন যে সময় কেটে গেল, বুঝতে পারলাম না। নটার দিকে ডিনার রেডি বলে জানিয়ে গেল ওরা।    

আবার রাতে একটা চমৎকার বাফে। সারাদিনের ক্লান্তি কেটে গেল শেষ ছয়-সাত ঘণ্টার সুন্দর খাবারের ব্যবস্থাপনায়। সুন্দর নিভৃত পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশে থাকতে ভালবাসলে অনায়াসে আসতে পারেন এই রিসর্টে।

পরদিন সকালে উঠে বেড টি খেয়ে একটু বাইরের লনে হাঁটাহাঁটি করে কিছু সুন্দর মুহূর্ত ফ্রেম বন্দি করলাম। আগামী দিনে যা স্মৃতি হয়ে থাকবে আমাদের। ম্যানেজারের সহায়তায় খুব তাড়াতাড়ি চেক আউটের সব কাজ শেষ করে ব্রেকফাস্ট বাফে তে গেলাম। আবারও ভিন্ন খাবারের আয়োজন অবাক করল। ব্যাগ গুছিয়ে এবার ফেরার পালা। ঝাড়গ্রাম থেকে ফেরার পথে কোলাঘাটের কাছে করে নিলাম লাঞ্চ। তারপর বৃষ্টি নামার আগে অষ্টমীর সন্ধ্যেতে ঢুকে পড়লাম নিজেদের বাসায়। যতই হোক, এবার একটু ঠাকুর দেখতে যেতে হবে না?

আরণ্যক রিসর্ট সম্পর্কে কিছু তথ্যঃ ঘরে প্রয়োজনীয় সব কিছুর ব্যবস্থা পাবেন, পারলে মশার জন্য অলআউট জাতীয় কিছু আনতে পারেন। আর এদের দরজার লকগুলি বেশ অদ্ভুত। অনেক জায়গা ট্রাভেল করলেও এই সিস্টেম আমি প্রথম দেখলাম। ওদের সাইটে দেব বিশদ রিভিউ। তার লিঙ্ক দিয়ে দেব ডেসক্রিপশনে।

©Ayan

Share:

#পুজোর গন্ধ#

 

পুজোর গন্ধ Bangla Choto Golpo

দৃশ্য ১

আবার একবছর পর বাবার দোকানে বিক্রি হচ্ছে ভালই। আসলে বাবার দোকান বলতে, বাবা ওই দোকানের কর্মচারী মাত্র। অনলাইন ক্লাসের দৌলতে আর পাড়ার ক্লাবের দাদাদের সাহায্যে নতুন মোবাইল ও ইন্টারনেট এসেছে হাতে। এবার বাবাকে আর জামা দিতে বলব না, বরং মায়ের জন্য আনতে বলব একটা লাল পাড় কাপড়। আগেরবারে আব্দার করেছিল মা। কিন্তু গতবারের মন্দার কারণে বাবার আর দেওয়া হয়নি ওটা।

তাই এবার ওই শাড়িটাই পরিয়ে দেব মায়ের ছবিতে। মা ও যে অভিমানে হঠাৎ চলে গেল পঞ্চমীর ভোরেই।


দৃশ্য ২

ঠাকুমা বলেছিল, মেয়েদের জন্মদিন পালন করতে নেই। কিন্তু মা বাবা ওসব কথায় পাত্তা দেয়নি কোনোদিন। প্রথম থেকেই পালন করেছে এই শুভ দিনটা। এবার আবার আঠারো হাওয়ার পালা। কিন্তু এই প্রথম ষষ্ঠীর দিনে পড়েছে মেয়েটার জন্মদিন। ওই দিন তো ছেলে মেয়ের কল্যানের জন্য উপোষ করতে হবে মা কে। আর মাকে ছাড়া পালন করবে কিভাবে এই দিনটা।

বাবার সাথে প্ল্যান করে ষষ্ঠীর ভোরেই সদলবলে রওনা হয় মুকুটমনিপুর। বাড়ির বাইরে ষষ্ঠীর নিয়ম চলবে না যে।


দৃশ্য ৩

সেজে গুজে ঘুরতে যাওয়া ছিল মেয়েটার প্রতি বছরের সপ্তমীর নিয়ম। এই দিনটা ছিল অনির্বাণের জন্য বরাদ্দ। আজও এই মধ্য চল্লিশে এই নিয়মের ব্যাতয় হয় না কোনো। কেউ কেউ আড় চোখে তাকালেও কিছু বলার সাহস পায় না।

কাউকে না পেলে একলাও বেরিয়ে পড়ে অন্তত এই দিনটায়, শুধু অনির্বাণ সাথে থাকে না আর।  


দৃশ্য ৪

রায় বাড়ির দুর্গা মন্ডপ। চারিদিকে হইহল্লা, আনন্দের আয়োজন। মাঝখানে চলছে অঞ্জলির প্রস্তুতি। রায় মশায় আজ বড়ই অবসন্ন। বাড়ির একমাত্র ছেলে প্রতিবার এই সময় বিদেশ থেকে এলেও এবার আসতে পারবে না জানিয়েছে, প্রথমবার।

অঞ্জলির আগেই ট্যাবে আসে ছেলের ফোন। “ঠাকুরের দিকে ক্যামেরা টা ধরো, অঞ্জলি দেব তো।” রাশভারি রায়মশায়ের আনন্দাশ্রুর সাক্ষী থাকে গোটা পরিবার।


দৃশ্য ৫

সারাবছর গাধার খাটুনি খাটলেও পুজোর সময় অনুপমকে ব্যাঙ্গালোরে আটকাতে পারত না কেউই। কিন্তু এবার আরথির টানে রয়ে গেছে দুদিন, পাড়ি দিয়েছে মুম্বাই। মুম্বাইয়ের আরথির সাথে মাস ছয়েকের প্রেম শুরু।

নবমীর দিন উবের করে এয়ারপোর্ট থেকে বাড়ি ফিরছে ও। সিগনালে দাঁড়ানো বাচ্ছা টার কাছ থেকে পুরো শিউলির ডালাটাই কিনে নিয়ে এগিয়ে দেয় আরথির দিকে, বানিজ্য নগরী থেকে লুট করা সৌন্দর্য কে সাজিয়ে দেয় শরতের উপহার। আর বাড়িতে অপেক্ষা করে আছে নবমীর পাঁঠার মাংস, নবমীর আপ্যায়নে কোন ত্রুটি থাকে না আর।


দৃশ্য ৬

দশমীর বিকেলে তীব্র হুড়োহুড়ি। ভাসানের জন্য মুটে পাওয়া যাচ্ছে না। এখনো অনেক পুরনো বাড়ির রীতি অনুযায়ী ঠাকুর বিসর্জন হয় এই মুটেদের কাঁধে চেপেই। শেষকালে পাওয়া যায় একদলকে, তাড়াতাড়ি নতুন গামছা কাঁধে দিয়ে তুলে ধরে প্রতিমাকে।

যাওয়ার পথে টুক করে বলি, কি ব্যাপার তোমাদের আজকাল পাওয়া যাচ্ছে না কেন? হাসিমুখে বলে, এবার ভালোই আমদানি হয়েছে। আগেরবার তো দুবেলা খাবারও জুটত না ঠিক করে, এবার সেখানে দুবেলাই ভোজ পেয়েছে পরিবার।

মাথা নত হয়ে আসে নিজেদের কামনা বাসনার প্রতি ঘৃণায়। বিদায় বেলায় দেবী অল্পেতে সন্তুষ্ট হওয়ার শিক্ষা দিয়ে যান।

©Ayan

Share:

#অভিশপ্ত বিজয়া#

 

অভিশপ্ত বিজয়া Bangla Choto Golpo


অনেকদিন পর পুজোতে দু-তিনদিনের ছুটি পেয়েছে সুমি। অষ্টমীর রাতেই এসেছে মায়ের কাছে শ্রীরামপুরে। দশমী একাদশী কাটিয়ে দ্বাদশীর ভোরে আবার ফিরে যাবে কলকাতায়। এখন শ্রীরামপুর অনেক বদলে গেছে। গাছপালা কমে গড়ে উঠছে সেই কংক্রিটের জঙ্গল। তবে ওদের বাড়িটা গঙ্গার খুব কাছেই। পিছনের বাগানে আজও আছে আম, কাঁঠালের গাছ। তার পিছনেই গঙ্গার পার। ছোটবেলার অভ্যাস মতই নবমীর দুপুরে খাওয়ার পর বাগানে গাছের ছায়ায় বসে গল্পের বই পড়তে বসে সুমি। ওর এই একটা নেশা ছিল ছোটবেলা থেকেই। গোয়েন্দা গল্পের পোকা ছিল মাথায়। কিরীটী থেকে ফেলুদা, ব্যোমকেশ থেকে শবর, কিছুই বাদ যেত না ওর স্টক থেকে। পড়তে শুরু করলে কখন যে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যেত বুঝতে পারত না। হয়তো এই সুপ্ত বাসনা থেকেই ওর কর্মস্থল হয়ে উঠে পুলিশের চাকরি। এখন আবার হোমিসাইড ডিপার্টমেন্টে নাম ডাক হয়েছে ওর বেশ কিছু জটিল কেস সল্ভ করার জন্য।

“কিরে, বাড়িতে এলি কি গল্পের বই পড়ার জন্য? মায়ের সাথে কি একটুও কথা বলতে ইচ্ছা করে না?” ভিতর থেকে হাঁক দেন উমা দেবী।

“যাচ্ছি গো” আলগোছে ঘড়িতে দেখে চারটে বেজে গেছে। ভিতরে গিয়ে মায়ের সাথে কিছুক্ষণ গল্প করে ও। একটু পরে বাবা ঘরে এসে বলে, “কি সারাদিন ঘরে বসে আছিস? একটু পুজোর দিনে বাইরে বন্ধুদের সাথে আড্ডা মেরে আয় না।”

“ধুর, সারা সপ্তাহ দৌড়ঝাঁপ করে আর ভালো লাগে না। একটু মায়ের কোলে শুয়ে থাকি।”

“কিন্তু তোমার মত করিতকর্মা অফিসার যদি শুয়ে থাকে তাহলে তো চোর ডাকাতদের পোয়াবারো। হ্যাঁ রে, ইদানীং পেপারে দেখছিলাম খুব মাদক আটক হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়। স্কুল কলেজের ছেলেরা জড়িয়ে থাকছে। এবিষয়ে কিছু করছিস না কেন?”

“এটা আমার ডিপার্টমেন্টের বাইরে বাবা, যতক্ষণ না কেউ পরলোকে যাচ্ছে আমার এত্তিয়ারে আসে না।”

মা রেগে উঠে বলে, “এই তোমার শুরু হল, মেয়ের সাথে দুটো সুখ দুঃখের কথা বলছি সহ্য হচ্ছে না। সারাদিন ওই পেপারে মুখ গুঁজে বসে থাকো আর এখন মেয়েকে জ্বালাতে এলে।”

এসবের মাঝেই বেজে ওঠে সুমির ফোনটা।

“ইয়েস। …বলছি।… হু।… আচ্ছা।… কটার সময়।… ওকে।… ঠিক আছে। মিনিট পনেরো।“ ফোনটা রেখে বাবার দিকে তাকাল সুমি।

“একটা কেস এসেছে, বেরোতে হবে এখুনি। তোমার স্কুটি টা নিয়ে যাচ্ছি।”

মা হইহই করে ওঠে, “এই তো বললি ছুটি নিয়েছিস? এরকম করে আবার কেউ যায় নাকি?”

“আরে এই যাব আর এই আসব, ততক্ষণ বাবার সাথে একটু প্রেম করে নাও।”

“সব তোর বাবার জন্য, মেয়ের সাথে গল্প করছিলাম নজর দিল।”

চটপট তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ল সুমি। ফোন করেছিল মিস্টার সরকার ফ্রম নারকোটিক্স ডিভিশন, সুমির বস মিস্টার বসুর থেকে নাম্বার নিয়ে। সুমি স্পটের কাছাকাছি আছে জেনে ওকেই যাওয়ার অনুরোধ করে।

ছিমছাম উত্তরপাড়া এখন মল ও ফ্ল্যাটের কেন্দ্রস্থল। ঠিকানায় পৌঁছে দেখে অলরেডি এসে গেছে লোকাল থানার অফিসার। ওখানে যা ব্রিফিং পাওয়া গেল, তা থেকে জানা যায় কলেজ পড়ুয়া দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রের মৃত্যু, সিম্পটম দেখে মনে হচ্ছে ড্রাগ ওভারডোজ। ফরেনসিক টিম সব ডিটেলস নিতে থাকে। সুমির পরামর্শে কিছু এভিডেন্সও কালেক্ট করে। বিশেষ কিছু না পাওয়া গেলেও পাওয়া যায় একটা পিস্তল।

ইতিমধ্যে এসে যায় নারকোটিক্স টিম। গাড়ি থেকে নেমে এসে মিস্টার সরকার বলেন,

“গুড টু শি ইউ অ্যাটলাস্ট, মিস সৌমিলি সেন। দত্ত র মুখে আপনার অনেক প্রশংসা শুনেছি।“

“থ্যাংকস স্যার। ড্রাগ ওভার ডোজ মনে হলেও কিছু জিনিসে খটকা আছে। মার্ডারের অপশন টা নাকচ করা যাচ্ছে না। বাই দ্য ওয়ে, এই ঘটনার সাথে আপনার টিম কিভাবে ইনভল্ভ হল। এই ধরণের ঘটনাতেও তো এত তাড়াতাড়ি আপনারা ফিল্ডে আসেন না, আনলেস ইউ হ্যাভ সাম ইনফর্মেশন অলরেডি।“

“ব্র্যাভো। ইউ আর রাইট।”

ওনার বিস্তারিত কেস হিস্ত্রি শুনে সুমি যা বুঝল, বেশ কিছু মাস আগে থেকেই ওরা ঝাড়খণ্ড সংলগ্ন একটা ড্রাগ র‍্যাকেটের সন্ধান পায়। যারা বিভিন্ন ভাবে যুবক যুবতীদের মধ্যে এটা ছড়িয়ে দিচ্ছিল। সেই সুত্রেই বেশ কয়েকটা লিড আসে কিন্তু কাউকে ধরা যায় না। অবশ্য ওই সব সুত্র থেকেই গত পরশু পাওয়া যায় আর একজনের হদিস। যাকে গ্রেপ্তার করার পর, তার সাপ্লায়ার হিসাবে উঠে আসে এই মৃত ছেলেটির নাম। আজই পাওয়া যায় ঠিকানা আর তার কিছুক্ষণের মধ্যেই খবর আসে এই ইন্সিডেন্টের। তাই শুধু ড্রাগ ওভার ডোজ বলেও মনে হয় না এটা।

ছেলেটার নাম ময়ূখ ত্রিপাঠি। বাবা বড়বাজারের বিজনেসম্যান। পড়ত লিলুয়া অঞ্চলের একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে, তাই বেশিরভাগ সময়ে থাকতো এই ফ্ল্যাটেই। আরও জানা যায় মাঝে মধ্যেই বন্ধু বান্ধব নিয়ে পার্টি করত ফ্ল্যাটেই। কিন্তু কিছুদিন ধরে সেরকম কিছু হতে দেখেনি কেউ। আর আশপাশের কারোর সাথেই তেমন মিশত না। তবে ঘটনার কদিন আগে সকালে দুজন মাঝবয়সি লোক এসে ওর খোঁজ করে ফ্ল্যাটে গিয়েছিল। কিন্তু তাদের আজ কেউ দেখেনি এখানে।

ফ্ল্যাটের সিকিউরিটির কাছ থেকে বর্ণনা শুনে স্কেচ আঁকার ব্যবস্থা করে সুমি।

মিস্টার সরকার বলেন, “জানি আপনি ছুটিতে আছেন, তবুও জিজ্ঞাসা করছি আপনি কি আমাদের সাথে আসতে পারবেন কিনা?”

“শিওর, একটা কল করে আসছি।” মাকে ফোন করে জানায় সে কলকাতায় যাচ্ছে আর ফিরবে কখন বলতে পারছে না। লোকাল থানার একজন কনস্টেবলকে দিয়ে স্কুটি টা ফেরত পাঠায় বাড়িতে। ময়ুখের বাবা মা ও এসে যান এর মধ্যে। ওদের জিজ্ঞাসাবাদ করে বডি পোস্টমর্টেমে পাঠানো হয়। ফ্ল্যাট সিল করে ওখান থেকে সবাই একসাথে বেরিয়ে যায় কলকাতার নারকোটিক্স ডিপার্টমেন্টের উদেশ্যে।

মিস্টার সরকার বলতে থাকেন, “বাকি সব মিসিং লিঙ্ক থেকে এই একজনের নাম ধামই পাওয়া গিয়েছিল। সেটাও আর নেই। এরা মূলত টার্গেট করত বড়লোকের বখে যাওয়া ছেলে মেয়েদের আর খুব নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে কলকাতায় আসা পড়ুয়াদের। জুতোর মধ্যে, আংটির পাথরের মধ্যে এমনকি মেয়েদের অন্তর্বাসের মধ্যেও পাচার করত এগুলো। কেউ কেউ আবার এসব করতে করতে নিজেরাও পড়ে যেত এই নেশার কবলে।”

“কিন্তু আপনাদের এখানে আসার কথা নিশ্চয় ওদের মাথাদের কাছে পৌঁছে গেছিল। আর হয়ত কোনোভাবে ওরা বুঝতে পারে ছেলেটা সব বলে দিতে পারে। তাই তার আগেই শেষ করে দিল। কিন্তু কিভাবে জানল? আপনার টিম ছাড়া আর কেউ জানে এই অপারেশনের ব্যাপারে?” সুমি গম্ভীর মুখে জানতে চায়।

“নো, মিস সেন। আর আই ট্রাস্ট মাই টিম মোর দ্যান মাইসেলফ। তবে…”

“তবে?”

“না কিছু নয়, এভিডেন্স ছাড়া কিছু বলা আমার স্বভাব নয়।” টেক্সট করে টিম কে ওঁর ওপর নজরদারি লাগাতে বলে।

নারকোটিক্স ডিপার্টমেন্টের টেবিলে বসে আবার ব্রিফিং হয় পুরোটার। ইতিমধ্যে সুমির মারফৎ এসে যায় স্কেচের কপি। তৎক্ষণাৎ ক্রাইম ডেটা থেকে সার্চ করে পাওয়া যায় ওই দুজন সুপারি কিলারের হদিস। জানা যায় এরা জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিল কয়েক সপ্তাহ আগেই। আর এদের বিশেষত্ব হল, নতুন নতুন উপায়ে বিষ দিয়ে মার্ডার করা। তাই এদের নামে বহুদিন অনেক কেস থাকলেও এরা অনেকদিনই ধরা পড়েনি। এবারও ছাড়া পেয়েছে প্রমাণের অভাবেই। একটা দল বেরিয়ে যায় ওদের খোঁজার জন্য।

সুমি জিজ্ঞাসা করে, “আর একজনকে যে কাস্টডি তে নিয়েছিলেন, তার থেকে আর কিছু জানতে পারেননি এই ছেলেটার নাম ছাড়া?”

“না, সেটাও বেশ অন্যরকম। ছেলেটাকে দেখে গ্রামের গোবেচারা ভিতু বলেই মনে হয়েছে। ও ইদানীং ময়ুখের থেকে মাল নিয়ে কিছু কলেজ অঞ্চলের ত্রিফলার বাতিস্তম্ভের মধ্যে রেখে আসত। বিনিময়ে টাকা পেত। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ এই সাপ্লাই হয়নি আর তারপর ওকে গ্রেপ্তার। প্রচণ্ড ভয় পেয়ে আছে ছেলেটা। আমরা সিসিটিভি দেখে ওর কথা ভেরিফাই করেছি। মশাগ্রামে ওর বাড়ির ওপরেও নজর রাখা হয়েছে আর ভেরিফাই করা হয়েছে। ওকে আমরা ছেড়েও দিতে চেয়েছিলাম যাতে ওয়াচে রাখা যায়। কিন্তু পাগলের মত কান্নাকাটি করে বলে যে ময়ুখকে না ধরে আনলে ওকে না ছাড়তে। ময়ুখ নাকি জানতে পারলে ওকে জানে মেরে দেবে। ময়ুখের কাছে নাকি থাকে পিস্তল।”

“একবার ছেলেটার সাথে কথা বলতে পারি?”

“অবশ্যই।”

ছেলেটাকে দেখে নিরীহ বলে মনে হলেও কোন কারণে যেন একটু ভয়ে সিঁটিয়ে আছে বলে মনে হল সুমির।

“তোমার কোন ভয় নেই। তুমি আমাকে নির্ভাবনায় যা জানো বলতে পার। এই কথা অন্য কেউ জানবে না। তোমার ময়ুখ দা কে তুমি কবে থেকে কিভাবে চিনতে? তোমার বাড়ি তো মনে হয় বর্ধমানের মশাগ্রামে। ওখানকার হাই স্কুলে আমার জ্যাঠা মাস্টারমশাই ছিলেন।” এসব শুনে ছেলেটা একটু নড়ে বসে।

“বিশ্বাস করুন, আমি কিছু জানিনা। যা জানতাম সব ওদের বলে দিয়েছি। বছর খানেক আগে একটা কলেজ ফেস্টে পরিচয় হয়েছিল ময়ুখদার সাথে। ছোটবেলা থেকে অভাবের সাথে লড়াই করে আচমকা পাওয়া এত টাকার লোভ সামলাতে পারিনি। কিন্তু কিছুদিন ধরেই ময়ুখদা কে বলছিলাম এই লাইন ছেড়ে দেব।“

ময়ুখদা তখন বলেছিল, “এই লাইনে ঢোকা যায়, বেরনো যায় না। আমি নিজেও কি বেরোতে চাইনি? নেশার ঘোরে জড়িয়ে পড়েছিলাম। আর এ থেকেই চিন্তায় আমার হার্টের অসুখ হয়ে গেল। বাবুজি জানতে পারলে আমার মুখ দেখবে না কোনোদিন। আমি যদি কোনোদিন বেরোতে পারি তোকে সঙ্গে নিয়ে যাব। তোকে এই পাঁকে আনার দায়ভার আছে আমার।“ একটু দম নেই ছেলেটা।

"ঠিক আছে, আর কিছু মনে পরলে আমাকে ডাকতে বোলো।"

ওখান থেকে বেরিয়ে এসে মিস্টার সরকার কে জানায় যে, দুটো আরো সাইড হতে পারে, এক, ময়ুখ বেরোতে চাইছিল এথেকে, যার জন্য হয়ত থ্রেট পাচ্ছিল। হয়ত ওর পরের মাথার খবর বলে দেবে ভেবেছিল, যা ওর মৃত্যুর কারণ হল।

আর একটা কারণ হতে পারে, যেটা আমি একটু ভেরিফাই করে জানাচ্ছি আপনাকে। এই বলে সুমি বেরিয়ে রাস্তায় এসে গেল। নিউটাউনের এদিকে বেশি পুজো না হলেও দূর থেকে ভেসে আসছে ঢাকের আওয়াজ। কয়েকটা ফোন করে আপডেট নিল পোস্টমর্টেমের রিপোর্টের। তারপর ফোন লাগালো দত্তদা কে, ফরেন্সিক হেড আর সুমিকে বেশ স্নেহ করেন উনি।

“কি ব্যাপার, নবমীর দিনই বিজয়া টা সেরে নিচ্ছ নাকি?” টিপিকাল দত্ত দা সুলভ মস্করা।

“না না, কি যে বলেন, আমাদের আবার পুজো। বলছি, একটা পোস্টমর্টেম কেস গেছে নারকোটিক্স ডিপার্টমেন্টের বিকেলের পর, উত্তরপাড়া থানার রেফেরেন্সে। ওটা নিয়ে একটু আপনার হেল্প লাগবে।”

“ডিপার্টমেন্ট চেঞ্জ করে নিলে নাকি? আর আমাকে তো এমনি কখনো মনে পড়ে না। বলো, কি জানতে চাও?”

“আপাত দৃষ্টিতে ড্রাগ ওভার ডোজ মনে হচ্ছে। কিন্তু, ভিকটিমের হার্ট প্রবলেম ছিল। অন্য কোনো উপায়ে শরীরে কি বিষক্রিয়া ঘটানো সম্ভব, স্লো পয়জনের মাধ্যমে?”

“সম্ভব, কিন্তু শরীর না দেখে বলি কিভাবে? কাল এগারটায় ফোন কর, উত্তর পেয়ে যাবে।”

ইতিমধ্যে ওপরে এসে জানতে পারে ওই কিলারদের লোকেট করা গেছে। আসা করা যায় ভোরের আগেই পাখি জালে পড়বে। সুমি এবার মিস্টার সরকারকে বিদায় জানিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দেয়। পুজোর ভিড় কাটিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় মাঝরাত।

অভ্যাস মত ভোরের জগিং করে ফেরার পরই প্রথম কল আসে মায়ের। সব ঠিক আছে জানানোর সাথে সাথে দেখে মিস্টার সরকারের ফোন ওয়েটিং। ওনাকে ফোন করতে বলেন যে লোক দুটোকে ধরা গেছে, ও যেন তাড়াতাড়ি চলে আসে।

ইন্টারোগেশনের শুরুতে কিছুই বের করা যায় না ওদের থেকে। ওরা কলের মাধ্যমে কাজ পেয়েছিল জানায়, উত্তরপাড়ার ওই অ্যাড্রেসে গিয়ে টাকা আদায়ের জন্য শাঁসাতে গিয়েছিল জানায়। ওদের কল রেকর্ডিং থেকে পাওয়া যায় একটা নাম্বার যেটা থেকে কল এসেছিল ঘটনার আগের দিনও। টিম মোবাইল থেকে বের করে অটোমেটেড কল রেকর্ডিং। বিশেষ কিছু না পাওয়া গেলেও পিছনে শোনা যায় শুধু একটা নামকরা পুজোর অষ্টমীর অঞ্জলির আহ্বান।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সুমির কাছে ফোন আসে মিস্টার দত্তর। উনি যা বলেন তার মূল কথা হল, ময়ুখকে বিষ দেওয়া হয়েছিল কদিন আগেই। ওর পায়ের কাছে পাওয়া গেছে একটা ক্ষুদ্র সূচ ফোটানোর চিহ্ন। ওটা দিয়েই ইঞ্জেক্ট করা হয়েছে একটা বিশেষ রাসায়নিক, যা দুর্বল হার্টের পেসেন্টের কাছে স্লো পয়জনের মত। আর এর পরিনতি দেখে মনে হবে যেন ড্রাগ ওভার ডোজই। সুমি ওই রাসায়নিকের নাম টা নোট করে নেয়।

সুমি এসে পুরো ব্যাপারটা মিস্টার সরকারকে বলতেই আচমকাই চিৎকার করে ওঠেন উনি “ইয়েস। এবার সব পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে।“ টিমকে অপারেশনের জন্য তৈরি হতে বলেন। কয়েকটা ফোন করে কিছু জিনিস কনফার্ম করেন উনি। ওই রাসায়নিকের একটাই কোম্পানি আছে এখানে, যার কর্তা রাজ্যের এক প্রতাপশালী মন্ত্রী। এবার চাপ দিয়ে ওই দুজন লোকের থেকে আদায় করা যায় গোপন জবানবন্দি। ওরাও ওই পুরো মার্ডার উইপনের ব্যাপারটা বুঝে গেছে ভেবে কিছুটা হাল ছেড়ে দেয়। সিভিল ড্রেসে পুলিশ সিজ করে ওই কোম্পানির কারখানা। ওখানকার গোডাউন চেক করে পাওয়া যায় মাদকের এক বিশাল সম্ভার। অনেকদিন থেকে বিভিন্ন সুত্র থেকে খবর পেলেও নিশ্চিত প্রমাণ ছিল না মিস্টার সরকারের হাতে। সুমির এই যোগসূত্রই সাহায্য করে মিসিং লিঙ্কগুলো জুড়তে। বিভাগীয় মন্ত্রী হওয়ার জন্যই আগের খবরও লিক হয়ে যাচ্ছিল ওঁর নেটওয়ার্কে।

অন্যদিকে পুলিশ নিয়ে সবাই পাড়ি দেয় ওই বিখ্যাত পুজোর উদেশ্যে। সেখানে এখন দশমীর সিঁদুর খেলার আয়োজন। পুলিশ আসতে দেখে সবাই একটু থমকে যায়। মাঝে বসে থাকা রাশভারি পুজো কর্তা, রাজ্যের মন্ত্রী অজয় রানাডে।   

“ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট।”

বেশ কিছু বছর ধরে গড়ে ওঠা এই বিশাল সাম্রাজের পতন হল, যা যুবসমাজকে ধীরে ধীরে ঠেলে দিচ্ছিল মারণ নেশার দিকে। দশমীতে দেবীর বিসর্জনের সাথে সাথেই বিদায় হল এই ধুসর পৃথিবীর কিছু জঞ্জাল। সুমির ফোনে মেসেজ ঢুকল বসের, “বিজয়ার শুভেচ্ছা। থ্যাংকস ফর মেকিং মি প্রাউড। দুদিন ছুটি নিয়ে জয়েন করো।”

পুলিশের জিপটা দিল্লি রোড ধরে এগিয়ে চলল শ্রীরামপুরের দিকে। দশমীর রাত এখনো বাকি, ঘরে ফিরে বাবা মায়ের আশীর্বাদ নিতে হবে যে।

©Ayan

Share:

#গল্পদিদার আসর#

গল্পদিদার আসর

অনেকদিন ধরেই মায়ের কাছে মামারবাড়ি যাওয়ার আব্দার করছে অভি। ৬ মাস হল ওরা পুরনো বাড়ি ছেড়ে এসে উঠেছে তথাকথিত সাউথ মানে গড়িয়া এলাকার একটা ফ্ল্যাটে। অভির আর কি দোষ, সারাদিন সুমন আর সুমি কাজের সুত্রে বাইরে। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতই হয়ে যায় প্রায়। ঘরে সন্ধ্যা মাসির কাছেই অভির দিন কাটে। পুরনো বাড়ির নোনা ধরা দেওয়াল থেকে সুমিরা মুক্তি পেলেও ফ্ল্যাটের জীবন যেন অভির কাছে খাঁচার পাখির জীবন। না আছে ঠাম্মার সাথে দুপুরে গল্প শোনা, না আছে দাদুর বিছানায় বসে রেডিওর খবর শোনা।

এমনিতে ওই উত্তর কলকাতার শরিকি বাড়িতে কোনোদিনই ভালো লাগত না সুমির। কিন্তু যতদিন শ্বশুর, শাশুড়ি ছিল তাও একটা মায়া ছিল বাড়িটায়। তথাকথিত শাশুড়ি বউমার জাঁতাকলে কোনোদিনই পড়তে হয়নি সুমিকে সেটাও বোধহয় ওই টানের আর একটা কারণ। ওর শাশুড়িরও ফ্ল্যাটের শখ ছিল খুব, তাই সুমিকে ইন্ধনও যোগাত মাঝে মাঝে। কিন্তু বছর খানেক আগে কিছুটা হঠাৎই প্রথমে শাশুড়ি আর তার কিছু মাসের মধ্যে শ্বশুর মারা যান। তারপর থেকেই আরও যেন এই বাড়িটা গিলে খেতে আসত ওকে। জন্ম ভিটের টানে হোক বা পাড়ার রবিবারের আড্ডা, সুমন খুব একটা ইচ্ছুক ছিল না অন্য কোথাও যেতে। যদিও ওর অফিসের বোস দার থেকে এই ফ্ল্যাটের খবরটা এনেছিল ওই। বেশ সস্তায় পেয়ে যাচ্ছিল বলে তাড়াতাড়ি লোন নিয়ে ব্যবস্থা করে ফেলে ওরা। এই ছমাস হল আস্তানা গেড়েছে এই নতুন পায়রার খোপে।

ক্রিং ক্রিং!! একদিন দুপুরের দিকে বেল বাজল ফ্ল্যাটের দরজায়।

সন্ধ্যা যথারীতি বিরক্ত হয়ে গেট খুলতে যায়। এ এক নতুন ঝামেলা হয়েছে, প্রায়শয়ই দুপুরের দিকে বিভিন্ন হকারের আনাগোনা। মনে মনে ভাবে, দাদা কে বলতে হবে এর কিছু ব্যবস্থা করতে। নাহলে সারাদিন খাটার পর দুপুরে অভি ঘুমোলে যে একটু রেস্ট নেবে, তার উপায় নেই। এই তো চারটে বাজলেই আবার শুরু হবে টিফিন করা, ছেলেকে তোলা। এরা বাপু পারেও বটে, সারাদিন অফিস করবি যদি, ছেলেমেয়ে করেছিস কেন। সন্ধ্যার তো সেই কোন জন্মে ছেলেটা বন্যায় জলে ডুবে মারা গেছে। তাও এখনো মাঝে মাঝে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে পুরনো স্মৃতির ভারে। বিশ বছর ধরে এভাবেই কাটিয়ে দিচ্ছে লোকের বাড়িতে কাজ করে। যদিও দাদা বউদি খুবই পছন্দ করে ওকে। কখনো কাজের লোক ভেবে উঁচু গলায় মেজাজ দেখায় না। তাই ও মনে মনে ভেবে নিয়েছে, এরা না তাড়ালে যাবে না কোনোদিন।

দরজা খুলে দেখে একটা বুড়ি, হাতে ময়লা একটা ব্যাগ।

“না না কিছু লাগবে না গো” দরজা টা বন্ধ করতে যায় ও।

“আরে ও মুখপুড়ি, তোর লাগবে কেন আমার লাগবে। মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে কেউ? বিয়ের আগে এই শিক্ষা পেয়েছিস? সমুর বউ এরকম জানলে কক্ষনো আসতাম না।”

“দাঁড়াও দাঁড়াও, কে সমু? এখানে ওই নামে কেউ থাকে না। দাদার নাম সুমন আর বউদির নাম সুমি। আর কি আজে বাজে বকছ?”

“আরে ওই হল, অত কি আর মনে থাকে আজকাল। নে ধরত দেখি আমার ব্যাগ খানা। এই বয়সে আর এত ভারী বওয়া যায়!” বলতে বলতেই চৌকাঠ পেরিয়ে সে ঢুকে পড়ল।

“আরে কি করছ টা কি? এখানে না বলে কেউ ঢুকতে পারে না। আমাকে দাদা বউদি কিছু বলে যায়নি।” বলতে বলতেই সুমিকে ফোন করতে থাকে সন্ধ্যা। দুপুরে এই বুড়ির বাতুনি শুনে মাথাটা ধরে গেল।

“ও, এবার বুঝেছি। তুই এদের ঝি। তাই বলি সমুর বউ কি এরকম হবে। সমুকে বল তোর গল্প দিদা এসেছে, তাহলেই বুঝবে।”

“বউদি, একজন এসেছে, বলছে দাদার গল্প দিদা। বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়েছে।“

“এরকম তো কারোর কথা শুনিনি? দাঁড়া, দাদা কে ফোন করি একবার।”

“ও, আর একটা কথা, দাদার ডাকনাম কি সমু? ও বুড়ি তো এই নামেই ডাকছে।”

“হুম! ওর মা ই বেশি ডাকত ওই নামে। আমি সুমনের সাথে কথা বলে ফোন করছি তোমাকে। ততক্ষণ ওনাকে ড্রয়িং এই বসিও। ভিতরে ঢুকতে দিও না, দিনকাল খুবই খারাপ।”

ফোন রেখে দেখে বুড়ি অলরেডি সোফায় গা এলিয়ে দিয়েছে। ওকে দেখে বলল, “যা বৃষ্টি পড়ছে, একটু চা কর তো দেখি, তা কি নাম তোর?”

“সন্ধ্যা।” বলতে বলতেই বউদির ফোন।

“শোনো, আমি ফিরছি তাড়াতাড়ি। ততক্ষণ পর্যন্ত যেমন বললাম করো। চা, জলখাবার দিও আর অভি কে বেশি কাছে যেতে দিও না। দাদার ওই নামে এক দিদা ছিল যদিও দাদা বহুয়ুগ তাকে দেখেনি বা ওদের সাথে কোন যোগাযোগ নেই। যাইহোক, একটু সাবধানে থাকো। আমি আসছি।”

“ঠিক আছে।” মনে মনে একটু অস্বস্তি হতে থাকে ওর। কি জানি কি মতলবে এসেছে। এদের রান্নাঘর টা ওপেন, তাই বসার জায়গা থেকে দেখতে পাওয়া যায়। চা করে নিয়ে এসে দেখে বুড়ি ঝিমোচ্ছে।

“ও দিদা, চা নাও।” শুনে একটু ঝেড়ে ওঠেন উনি। একথা ওকথার মধ্যে দিয়ে জেনে নেয় এদের বাড়ির সব তথ্য। সন্ধ্যার জীবনের গল্পও শোনেন মন দিয়ে। সন্ধ্যা বলে, তোমার নাম কি দিদা?

“পারুল বালা, আমার বাবা ডাকতেন পারুল বলে। অনেকদিন পর নিজের নাম টা বললাম, শেষ সেই বলেছিলাম ওই কিসব কার্ড বানাতে এসেছিল পাড়ায়।”

ইতিমধ্যে কখন যেন অভি ঘুম থেকে উঠে পড়ে দরজার আড়াল থেকে ওদের কথা শুনছিল। এবার এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করে, “তুমি কে গো? আগে তো দেখিনি কোনোদিন?”

“আমি গল্পদিদা। আমি তোমাদের পুরনো বাড়িতে যেতাম।”

“দাদুর বাড়িতে? যেখানে নিচে বেড়াল শুয়ে থাকতো?”

“হুম, যেখানে ছাদে যাবার ঘোরানো সিঁড়ি ছিল। বড় বারান্দা ছিল। একটা আরামকেদারাও ছিল তোমার দাদুর।”

একটু পরে সুমি বাড়ি ফিরে দেখে, মাটিতে বসে গল্পে মশগুল এক বয়স্ক মহিলা আর অভি। ও ঢুকতেই ওকে এসে জড়িয়ে ধরে বলে, মা এই হল গল্পদিদা। আমাদের পুরনো বাড়িতে যেত। কত গল্প শুনলাম ওর থেকে। তুমি দেখেছ ওকে আগে?

ততক্ষণে দিদা চলে এসেছে সুমির সামনে। থুতনির সামনে ধরে নতুন বউয়ের মত আদর করে বলে, “বাঃ, আমাদের সমুর পছন্দ আছে বলতে হবে। কি টুকটুকে বউ এনেছে।” অপরিচিত কারোর মুখে বিয়ের এত বছর পর এসব শুনে লজ্জায় রাঙ্গা হয়ে যায় সুমি।

টুক করে প্রণাম করে বলে, “দাঁড়ান, আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি।”

একটু পরে এসে অভিকে পড়ার ঘরে পাঠিয়ে দিদাকে একটু পুরনো জিনিস জিজ্ঞাসা করে জানার চেষ্টা করে ওনার আসার উদেশ্য। মোটামুটি যা জানতে পারে, কদিন আগে সন্ধ্যের দিকে সুমনকে ফ্ল্যাটে ঢুকতে দেখে চেনা চেনা লাগে ওনার। পিছন পিছন এসে ফ্ল্যাট টা দেখে যান উনি, ভাবেন একদিন এসে চমকে দেবেন।

আট টার পর সুমন ফিরলে দেখে সবাই মোটামুটি এক বয়স্ক মহিলা কে ঘিরে গল্পে মত্ত।

দিদা বলে। “কিরে সমু চিনতে পারছিস? তোর এই সন্ধ্যা থেকে শুরু করে বউ পর্যন্ত কেউ কিন্তু এখনো পুরোপুরি বিশ্বাস করেনি আমায়। তোর কাছেই শেষ চেষ্টা।”

“কেমন আছ?” মুখে বললেও মনে মনে সেই গল্প দিদার অবয়বটা যেন খুঁজেই পেল না ও। কিন্তু কথা বলার ভঙ্গিটা একইরকম মনে হল।

“তোদের কত গল্প শুনিয়েছি ছোটবেলায়। অভি, তোর বাবা তো আমি এলে তাড়াতাড়ি লেখাপড়া করে নিত যাতে বেশি করে গল্প শুনতে পারে।”

রাতে খাওয়ার পর গল্প দিদা বলল, “শোন সমু, কাল দুপুরে খেয়ে আমি চলে যাব। তোদের দেখে কি যে ভালো লাগছে। যেন আরও কটা দিন বাঁচার ইচ্ছে বেড়ে গেল।”

“সেকি? কালই চলে যাবে। কটা দিন থাকো না।” সঙ্গে সঙ্গে বায়না জুড়ল অভিও।

“নারে দাদুভাই। এবার যাই, এবার তো তোদের বাড়িটা দেখতে এসেছিলুম। পরের বার এসে এক মাস থেকে যাব। দেখ না এই ছোট ব্যাগে কি আর বেশি জিনিস আনা যায়?”

“ঠিক আছে, তোমার ঠিকানা টা এখানে লিখে রাখ, পরের বার আমি গিয়ে নিয়ে আসব।”

পরদিন সকালে উঠে যে যার মত টাইমে বেরিয়ে গেল। আজ ভোর থেকে উঠে দিদা ওদের জন্য রান্না করেছে শুনল। দুপুরের দিকে দিদাও চলে গেল কথামত। যাওয়ার আগে সন্ধ্যার হাত ধরে ওদের সবাইকে আগলে রাখতে বলল। একদিনের ঝটিকা সফরে ফ্ল্যাটে একটু দমকা হাওয়া এসে লেগেছিল। আবার সব চলবে নিজের গতিতে ঘড়ির কাঁটা ধরে।

কদিন পরেই মহালয়া। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে সুমন বলল গল্পদিদার জন্য একটা পুজোর শাড়ী কেনার কথা। সুমি বলল, আমিও এটাই ভাবছিলাম। কাল আমি অফিস ফেরতা কিনে আনব, তুমি পরের দিন ফেরার পথে দিয়ে এস। সেইমত দুদিন পর সুমন অফিস ফেরতা এল দিদার ঠিকানায়। শিয়ালদার ঠিকানা টা খুঁজে পেতে বেশ কালঘাম ছুটল ওর।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ওই ঠিকানায় এরকম কেউ কোনোদিনও ছিল না বলে শুনল। ফোনে কিছু না বলেই বাড়ি ফিরল ও। সুমিকে সব বলতে প্রথমে বিশ্বাস করতে চাইল না। তারপর সুমি চারদিক তন্য তন্য করে খুঁজতে থাকল কিছু হারিয়েছে কিনা বোঝার জন্য।

কিছু না হারালেও ড্রয়ারের মধ্যে সুমন পেল হাতে লেখা একটা চিরকুট, “ভালো থেকো তোমরা।” হাতের লেখা টা ওর খুব চেনা, ওর মায়ের। পিছনে এসে কাঁধে হাত রাখল সুমি।

কাল মহালয়া। পিতৃপক্ষের অবসান, দেবীপক্ষের সূচনা। গঙ্গায় তর্পণ করতে যাবে বলে মনে মনে স্থির করে সুমন।

©Ayan
 

Share:

মোট পৃষ্ঠাদর্শন

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Blogger দ্বারা পরিচালিত.