দৃশ্য ১:
কোর্ট থেকে বেরিয়ে এলো দুজনে। অনি বললো, ভালো থেকো। মধু হালকা হেসে উল্টোদিকে হাঁটা দিল। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে এগিয়ে গেলো বাস ধরতে। একমুহূর্তে শেষ হয়ে গেল ৬ বছরের বিবাহিত জীবন। এখন বেঁচে থাকা ওই দুধের শিশুটির সংস্পর্শে। ডিভোর্সের এই প্রাপ্তির জন্য মামলা লড়েছিল ও। অনির বাড়ি থেকে বাচ্চা চুরির অভিযোগে পুলিশের কাছে কমপ্লেইনও করেছিল ওর বিরুদ্ধে। কিন্তু সব শেষে জিত হয় সত্যের।
দৃশ্য ২:
মাঝে কেটে গেছে বছর দশেক। মধুমিতা নিজের বেসরকারি চাকরিতে ভর করে গুছিয়ে নিয়েছে সবকিছু। বাবা মারা যাওয়ার পর ছোট্ট ফ্ল্যাটে মা কে এনে রেখেছে । ছোট্ট দ্বীপ এখন ক্লাস ফাইভে পড়ে। মা অনেকবার করে বলেছে আবার বিয়ে করতে, ছেলেটা ছোট থাকতে থাকতেই। কিন্তু আবার ওই পথ মাড়াতে চায়নি ও। কিন্তু মাকে দমিয়ে রাখা ভারী মুস্কিল হচ্ছে ইদানিং। এখন মা বেশ ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপে সরগর। কয়েক মাস আগে হঠাৎ মধুর ছবিসহ খুলেছে মাট্রিমনি প্রোফাইল, দিয়েছিল মধুর ই মোবাইল নম্বর। যেদিন প্রথম একটা ফোন এসেছিল, কি অপ্রস্তুতে না পড়েছিল সে। বাড়িতে এসে প্রচুর ঝেরেছিলো মাকে। ও বোঝে মায়ের চিন্তাটা। প্রোফাইলে মায়ের নম্বরটা আপডেট করে দিয়েছিল, আর স্ট্যাটাস বদলে করে দিয়েছিল ডিভোর্সি ও বছর দশের সন্তানের মা।
দৃশ্য ৩:
আরো কিছু মাস কেটে গেছে এর মধ্যে। এতদিন কোনো কথা মাকে না বলে থাকেনি ও। মনের মধ্যে অনেক বাধা কাটিয়ে কিছুটা এগিয়েছে, কিন্তু এবার মাকে বলতে হবে সম্রাটের কথা টা। মাঝে মধ্যেই মা কিছু ফটো এনে দেখাতো আর নতুন ফোনের বাক্যালাপ শোনাতো। বিভিন্ন ভাবে কাটিয়ে দিত ও। কিন্তু কিভাবে যে এই সম্পর্কটা এগোলো নিজেই অবাক হয়ে যায়। সম্রাটের ফোনটা এসেছিল মাস তিনেক আগে। প্রথমেই নিজের প্রোফাইল স্ট্যাটাস বদলের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছিল। নম্বর বদলানোর আগে যে প্রথম ফোনটা এসেছিল মধুর কাছে, সেটা সম্রাটের ই ছিল। নিজে ডিভোর্সি বলে আর বিব্রত মধুর গলা শুনে রেখে দিয়েছিল ফোনটা। কিন্তু, প্রোফাইলটা র আপডেট হতে আবার যোগাযোগ শুরু করে। সেই থেকেই দুজনের ভালোলাগার শুরু। নিজেদের ছোটছোট ঘটনার মিল আরো কাছে আনছিল দুজনকে। কিন্তু সাক্ষাতের সম্ভাবনা নেই, কারণ সম্রাট ইউএসএ তে আছে চাকরিসূত্রে। দিন কয়েক আগে ভিডিও কল শুরু করেছে ওরা। দীপকেও ভালোবেসে ফেলেছে সম্রাট, আর এটাই আরো কাছে এনেছে দুজনকে। একদিন রাতে খাওয়া দাওয়ার পর দীপ ঘুমিয়ে পড়লে মাকে বলে সব ঘটনা। মা তো শুনে খুব খুশি, এখুনি কল করতে বলে। মধু মুচকি হেঁসে বলে, হবু শাশুড়ি একটু সাজুগুজু না করেই জামাইকে দেখবে?
মা বলে, তুমি সাজো, আমাকে এতদিন না বলে রেখেছ। সেদিনই ভিডিও কল করে কথা হয় সম্রাটের সাথে। দেখে খুব খুশি হয় মা। কল শেষ হওয়ার পর মা মেয়েতে খুব কান্নাকাটি করে। এতদিনের জমানো দুঃখ প্রকাশ পায় আনন্দাশ্রুর মধ্যে দিয়ে।
দৃশ্য ৪:
আজ রবিবার সন্ধ্যা, আগের কথামত সম্রাটের মা বাবার সাথে ভিডিও কল হওয়ার কথা। ঠিক সময়েই কথা হয় দুই পরিবারের। দুই পরিবারই চায় যত তাড়াতাড়ি চার হাত এক হোক। সম্রাট ব্যবস্থা করতে থাকে মধুর ভিসার যাতে একেবারে গিয়ে বিয়ে করে নিয়ে আসা যায়। বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হতে থাকে, আর মধুর মন ঘুরে বেড়ায় প্রজাপতির ডানায় ভর করে।
একদিন, সম্রাট ফোন করে জানতে চায়, ভিসার কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে, কারণ মধুর নামে পুলিশ কেস ছিল। মধু সেই আগের ঘটনার কথা জানায় সম্রাটকে সেই ডিভোর্সের সময়কার ওর শশুরবাড়ি র মিথ্যে কেসের কথা। এভাবে পুরনো দাগ যে আবার ফিরে আসবে, কেই বা জানত। খুব কান্নাকাটি করে মধু। সম্রাট সান্ত্বনা দেয়, কিছু একটা ব্যাবস্থা করবে সে। কিছুদিন পর জানায় ওদের অফিসের ইন্ডিয়া এজেন্ট সব রেডি করে দিচ্ছে, ওখানে গিয়ে ফি আর ফর্মালিটি করলেই চলবে। নিশ্চিন্ত হয় দুই পরিবার।
দৃশ্য ৫:
আজ আসবে সম্রাট, এই প্রথম কাছ থেকে দেখা। আর তর সইছে না মধুর। ঠিক সময়ে এসে পড়ে সে। ইতিমধ্যে দীপের সাথেও ভালই আলাপ হয়ে গেছে ওর। দীপ ও আপন করে নিয়েছে ওকে। প্রচুর খেতে ভালোবাসে সম্রাট, আর এতদিন যা যা ভালোলাগার কথা বলেছিল, সব হাজির করেছে শাশুড়ি। খাওয়ার পর আর ওঠার ক্ষমতা নেই সম্রাটের। ঘুমানোর আগে গুডনাইট বলে শুতে চলে যায় দীপ ও তার দিম্মা। সম্রাটকে নিজের ঘরটা দিয়ে, সোফায় নিজের শোয়ার ব্যবস্থা করে মধু। হঠাৎ পিছন থেকে সম্রাট এসে বলে আমার গুডনাইট কিস টা দাও। মধু ওকে দূরে ঠেলে দেয়, বলে এসব বিষয়ে আমি একটু ব্যাকডেটেড, সব পাবে বিয়ের পরই। তারপর ঘরে ঢুকিয়ে দেয় সম্রাটকে।
সকালে বেরিয়ে বেশ কিছু মার্কেটিং শেষ করে ওরা। আজ আর কালকের দিন টা ছুটি নিয়েছে মধু। রাতে খাবার টেবিলে খেতে খেতে সম্রাটের ফোন টা আসে।
"হাউ ক্যান ইউ সে দিস নাউ? এনি আদার অল্টারনেটিভস?"
"আই উইল কল ইউ ইন ওয়ান হাওয়ার"।
ফোনটা রাখার পর সম্রাট যেটা বললো, যেহেতু মধুর কেসটা শুধু কমপ্লেইন এই আটকে ছিল না, অ্যারেস্ট পর্যন্ত হয়েছিল, ভিসা অ্যাপ্লিকেশন এ ১৫ লাখের পার্সোনাল বন্ড জমা দিতে হবে।
সম্রাট বললো, "মধু, তোমার অ্যাকাউন্টে কত আছে এখন?"
চিন্তিত মুখে মধু বলে, লাখ পাঁচেকের মত।
"আমার কার্ড থেকে ৩ লাখ মত পাবো, কিন্তু বাকি আরো ৭ লাখ। বাদ দাও, বরং আমি কাল পরশুর মধ্যে ফিরে গিয়ে বাকি ব্যবস্থা করে ফিরবো। আমাদের শুধু রেজিস্ট্রির দিন টা চেঞ্জ করতে হবে, তুমি সেটা একটু দেখে নিও।"
মধুর মা বলে, "বাবা যা গয়না আছে মধুর, লাখ ৪ এর মত হবে। বাকি দুটো এফডি থেকে আরো দু লাখ মত পাবো।"
"তাহলেও একলাখ কম হচ্ছে, মধু কোনো চিন্তা করোনা, আমি এক উইকে ফিরে আসবো।"
মধু বলে, "তুমি আমায় যে এনগেজমেন্ট রিং দিয়েছিলে সেটাও লাখের মতই হবে না? কাল ই সব ব্যাবস্থা করে ফেলো।"
"দেখো, ওটা আমার প্রথম গিফট, ওটা নিতে বলো না, দেখছি কি করা যায়।" সম্রাট বললো।
"আমি তো তোমার কাছেই থাকছি, তুমি আবার ওখানে তৈরি করে দিও। বেশ দুবার পাওয়া যাবে এনগেজমেন্ট রিং।"
পরদিন সারাদিন সম্রাট গয়নার ব্যাবস্থা করতে যায়, আর মধু মাকে নিয়ে এফডি বন্ধ করে টাকার ব্যাবস্থা করে। তুলে আনে নিজের ৫ লাখ ও। সম্রাট ওর কার্ড থেকে তুলে আনে ৩ লাখ। শুধু কাল গয়নার ৪ লাখ পেলেই মধুকে নিয়ে গিয়ে আলাদা বন্ড তৈরি করিয়ে আনবে সম্রাট।
দৃশ্য ৬:
অনেকবার ফোন করেও পাওয়া যাচ্ছেনা ওকে। এবার টেনশন হচ্ছে মধুর। অনেক্ষন বেরিয়েছে, কিছু অ্যাকসিডেন্ট হলনা তো? বেশ কিছুক্ষণ পর একবার ছুটে ভিতরের ঘরে যায় মধু। ঘরে সম্রাটের কোনো লাগেজ পায়না সে। টাকার ব্যাগটাও নেই। ল্যাপটপ খুলে মাট্রিমনিয়াল সাইটে প্রোফাইল টা খুঁজে পায়না সে। এফবি প্রোফাইলেও নেই।
হতাশ হয়ে বসে পড়লো মধু। আবার যুদ্ধ শুরু করতে হবে সব বাঁচানোর আশায়।
©Ayan










