“আরে চল না একদিন কোথাও ঘুরে আসি।“
“টাকা পয়সার খুবই টানাটানি চলছে। এই মার্চ মাসে একটা বোনাস পাব, তারপর নিয়ে
যাব তোকে। তোর যা যা ইচ্ছা তাই তাই করবি।“
কথা চলছে দুই তরুণ তরুণীর। মোবাইলে, রাতের খাওয়ার পর এই দশ পনেরো মিনিটই কথা
হয় দুজনের। সারাদিনের কাজের কথা, দুজনের চাওয়া পাওয়ার কথা, আগামীর পরিকল্পনার কথা
– সবই জুড়ে থাকে এইটুকু সময়। দুজনের বাড়ির কেউই জানে না এখনো এই সম্পর্কের কথা।
একজন নার্সিং এর কোর্স করে একটা প্রাইভেট এজেন্সির মাধ্যমে লোকের বাড়ি সিস্টারের
কাজ করে। আর অন্যজন একটা বিখ্যাত কোম্পানির ডেলিভারি বয়। দুজনেই নিজের মত করে
গুছিয়ে নিতে চায় কয়েক বছর। আর ওদের নিম্ন-মধ্যবিত্ত জীবনে অনেক প্রতিকুলতার মধ্যেও
আছে একটু নিশ্বাস নেবার আকাশ। সেই আকাশেই উড়তে চায় ওরা।
কাজ করতে গিয়ে কালকের রাতের কথাটাই মনে পড়ছিল সুমিতের বারবার। রঞ্জনা তো তেমন
কিছুই চায় না কোনোদিন। কিন্তু তাও ওকে বারণ করতে হল। আসলে কদিন আগেই মায়ের জন্য
বেশ কিছু টাকা খরচ হয়ে গেছে। সেটার জন্য সুপারভাইজারের কাছ থেকে কিছু আগাম ধার
নিয়েছিল। মাসের মাইনে থেকে কাটাচ্ছে ওই টাকাটা। আর ওদের মধ্যে এই
আন্ডারস্ট্যান্ডিংটা আছে বলেই কেউ কিছু রাখ ঢাক রেখে কথা বলে না। দুজনের মধ্যে এই পারস্পরিক
বিশ্বাসের ওপরই দাঁড়িয়ে রয়েছে ওদের সম্পর্কের ভিত। বাবার ছোট্ট দোকানটাও চলে না আর
সেরকম। তাই ওর রোজগারের ওপরেই নির্ভর করে আছে পরিবার। বিকেলে ওয়ারহাউসে ডিটেলস
এন্ট্রি করানোর সময় দেখা হল সুজয়ের সাথে। প্রায় একসাথেই কাজে ঢুকেছিল ওরা, সেই
থেকেই বন্ধুত্ব। কিন্তু কাজের জন্য দেখা হয়না প্রতিদিন। যেদিন দেখা হয়, বাড়ি ফেরার
আগে একটু চা খেয়ে নিজেদের মনের কথা আলোচনা করে দুজনে। একমাত্র ওই জানে রঞ্জনার
কথা। আজ সুজয় চা খাওয়ার কথা বললেও ও না করে দেয়।
সুজয় বলে, “কিরে, শরীর ঠিক আছে তো রে?”
“হম। ঠিক আছি রে। মন টা ভালো নেই।” তারপর বলে কাল রাতের কথা। ওর সাথে কথা বলে
মন টা একটু হালকা হয়।
এদিকে সকালে উঠে রঞ্জনার শরীরটা বেশ খারাপ লাগছে। কাল রাতে সুমিতের থেকে না
যাওয়ার কথাটা শুনে বেশ মন খারাপ হয়েছিল ওর। যদিও জানে যে সুমিতের কিছু করার নেই।
এই সোজাসাপ্টা জবাবের জন্যই সুমিতকে এত ভালবাসে ও। আর সুমিত তো এখনকার ছেলেপুলেদের
মত মদ সিগারেট বা অন্য কোন কিছুর নেশা করে না, যে ওখানে টাকা বের হয়ে যাবে। ছেলেটা
খাটেও প্রচুর সারাদিন। দুচোখে থাকে ওদের আগামীর রঙিন স্বপ্ন। কিন্তু কাল যেন
কিছুতেই নিজের মন কে বোঝাতে পারছিল না রঞ্জনা। শুয়ে শুয়ে শুধু বালিশ ভিজিয়েছে। আর
সেই জন্যই রাতের ঘুমটা হয়নি ঠিকমত। আবার সকালে উঠে রান্নাবান্না করে কাজে বেরোতে
হবে। মা মরা মেয়েটা করে চলেছে সেই ক্লাস ইলেভেন থেকে। শরীরটা ম্যাচ্ম্যাচ্ করলেও
গা ঝেড়ে উঠতে হবে ওকে। নাহলে যে একটা দিনের টাকা পাবে না ও। পরের মাসেই সুমিতের
জন্মদিন। টাকা জমিয়ে একটা গিফট কেনার প্ল্যান আছে ওর।
পরের দিন একটা জরুরি মিটিং ডেকেছে সুমিতদের সুপারভাইজার। কেউ কেউ বলছে, চাকরি
ছাঁটাইয়েরও গল্প হতে পারে। শুনেই বুকটা ধুকপুক করতে থাকে। প্রায় মাস ছয়েকের বেশি
হয়ে গেলেও ওর নামে কোন কমপ্লেন আসেনি কোনোদিন। কিছুদিন আগেই সুপারভাইজার বলছিল
একবছরে কোন কমপ্লেন না এলে নাকি কি একটা এক্সট্রা বোনাস দেয়। যাইহোক মিটিঙের পর মন
টা খুশ হয়ে যায় সুমিতের। মেসেজ করে রঞ্জনাকে জানায় ভালো খবর আছে।
যথারীতি রাতের সময় আজ সুমিতই ফোনটা লাগায়। রঞ্জনাকে জানায় ছাব্বিশে জানুয়ারী
ওরা সারাদিনের জন্য ঘুরতে যাবে। সব প্ল্যান করে নিতে বলে সুমিত।
“কি ব্যাপার? কোন লটারির টাকা পেয়েছিস নাকি সকালে?”
“আরে না না। কুড়ি থেকে পঁচিশে জানুয়ারি কোম্পানির সেল চলবে। এই কদিন নাকি
প্রচুর অর্ডার আর অনেক ডেলিভারি করতে হবে। একটা কাউন্টের বেশি পর পর পাঁচদিন
ডেলিভারি করতে পারলেই বোনাস। সেই বোনাস দিয়েই ঘুরে আসব আমরা তোর পছন্দের জায়গায়।”
“আর কত বেশি করবি? এমনিতেই তো সেই নটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত ডিউটি। কিচ্ছু
করতে হবে না, ওই মার্চের পরেই যাব।”
“আরে তুই চাপ নিস না। চার পাঁচ দিনের ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে ওই একদিনের
আনন্দে। তুই দেখে রাখ কোথায় যাবি কি করবি সব।”
দুচারটে রোজকার কথাবার্তা বলার পর ঘুমিয়ে পড়ল দুজনে। আর দুজনেরই ঘুম হল দারুণ।
আসলে বলে না মনে শান্তি থাকলে ভাত ডালেও জীবন নিশ্চিন্ত হয়।
আসতে আসতে ওই সপ্তাহ আসতে লাগলো। ইতিমধ্যে ওরা ঠিক করে ফেলেছে ওদের গন্তব্য। এই
কদিন সামান্যই কথাবার্তা হল দুজনের। হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর আর শরীর চলছিল না
সুমিতের। কিন্তু ওই সামনের সূর্যোদয়ের দিকে তাকিয়ে একমনে কাজ করে যাচ্ছিল ও।
চব্বিশে জানুয়ারি রাতে ফোন করল রঞ্জনা। সুমিতের খবর নিয়ে ওকে বলল, “শোন, কাল
একদম তাড়াহুড়ো করবি না। যদি যতগুলো দরকার ততগুলো ডেলিভারি নাও হয়, তাতেও কিছু যায়
আসবে না আমাদের। এবার না হলেও অন্যবার আমরা যাবই।”
“আরে তুই একদম টেনশন করিস না। পাঁচদিনের টার্গেট মিট হয়েছে মানে ভগবানও আমাদের
সাথে আছে। কাল ঠিক সব হয়ে যাবে। বাড়ি ফিরে তোকে কল করব।”
সারাদিন একটু বেশিই ছোটাছুটি করতে হল ওকে। আজ যেন মনে হচ্ছে সব অ্যাড্রেস
গুলোই একটু দূরে দূরে। টাইমও লাগছে বেশি। এটা ওটা ভাবতে ভাবতে আজকের লাঞ্চটা বাদ
দিল ও। মিনিট তিরিশেক বাঁচবে তাহলে। বিকেলের দিকে একটা ডেলিভারি করে একটা গলির
মধ্যে থেকে বেরচ্ছিল ও। আসতে আসতে বাইক চালাতে চালাতেই একটু বিস্কুটও খেয়ে
নিচ্ছিল। হঠাৎই গলি থেকে বেরোনোর সময় আচমকা আসা একটা গাড়ি এত জোরে প্রায় ধাক্কা
মারতে মারতে বেরিয়ে গেল যে নিজেকে বাঁচাতে কোনোরকমে পাশ কাটালেও বাইক সমেত পড়ে গেল
রাস্তার পাশেই। একটু ধাতস্ত হয়ে প্রথমেই উঠে দেখতে গেল সব আইটেম ব্যাগে ঠিকঠাক আছে
কিনা। কিন্তু উঠতে গিয়ে বুঝল পা টা বেশ ভালোই জখম হয়েছে। বাইক চালিয়ে এখান থেকে
যাওয়া প্রায় অসম্ভব। ফোন করল সুজয়কে। ও জানালো মিনিট পনেরোর মধ্যে আসছে ও। ধীরে
ধীরে বাইকটা রাস্তার সাইডে নিয়ে এল কোনোরকমে। সাথে ডেলিভারির বড়সড় ব্যাগটাও। হাতড়ে
হাতড়ে দেখতে থাকল জিনিস গুলো সব ঠিক আছে কিনা।
“তুই ঠিক আছিস?” সুজয় এসেই জিজ্ঞাসা করল ওকে। জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে সুমিত। এত
কিছু করেও শেষে তীরে এসে তরী ডুবল। বেশ কয়েকটা পার্সেল ড্যামেজ হয়েছে মনে হচ্ছে।
“আরে এসব ছাড়। তুই ঠিক আছিস তো। এসব ঠিক হয়ে যাবে। সব পার্সেলের ইন্সিওরেন্স
করা থাকে। কোন অসুবিধা হবে না। আমি একটা ওয়ারহাউসে কল করে আসছি।”
একটু পরে এসে ও বলল, “একটা কথা বলত, তোদের কত টাকা লাগবে কালকের জন্য?”
“হাজার তিনেক মতন। কিন্তু…”
“তুই যাই করিস না কেন আজকের টার্গেট মিট হবে না। আর বোনাসও পাওয়া যাবে না। যতগুলো
পার্সেল বাকি আছে সব দিয়ে আসতে হবে ওয়ারহাউসে। ওরা চেক করে দেখবে সব ডেলিভারি করা
যাবে নাকি কিছু রিপ্লেসমেন্ট করতে হবে।” বলতে বলতে ওর ব্যাগ টা হাতড়াতে থাকে সুজয়।
তারপর একটা টোটো ডেকে ওকে আর ব্যাগ টাকে তুলে কাছের ডাক্তারের কাছে যেতে বলে। আর
কল করে দেয় পাড়ার বাইকের গ্যারেজে। ওদের ছেলেরা এসে তুলে নিয়ে যাবে বাইকটা।
যেতে যেতে বলে, “শোন, একটা উপায় আছে। আমি ওদের বলেছি যে তুই ফোন করার পরই
প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিলিস। আমি এসে মুখে জল দিয়ে জ্ঞান ফিরিয়েছি। পড়ে থাকা
জিনিসগুলোর মধ্যে একটা ট্যাব আছে মনে হচ্ছে। এটা আমি বিক্রি করে রাতের মধ্যেই
টাকার ব্যবস্থা করছি। তোর অচৈতন্যের সময় কেউ যদি ব্যাগ থেকে কিছু নিয়ে থাকে, তাতে
তোর তো কিছুই জানার নয়। তুই শুধু ওখানে গিয়ে যেরকম বললাম বলবি।“
“চুরি করব?”
“চুরি করছিস কোথায়? তুই যে এই কদিন এক্সট্রা খাটলি তার জন্য বোনাস টার হিসাব
বুঝে নিচ্ছিস। কারণ সৎ পথে গেলে এটা তুই পাবি না।“
“না না, এটা করতে পারব না। কেউ জানতে পারলে চাকরিটাও যাবে।“
“আর না করলে তুই কোন মুখে রঞ্জনার সামনে দাঁড়াবি?”
গুম হয়ে যায় সুমিত। মনের মধ্যে চলতে থাকে বিবেকের দংশন।
ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ফোন করেন সুপারভাইজার। বলে উনি রাতে বাড়ি এসে
সব ডিটেলস নিয়ে যাবেন। ওকে আর এই অবস্থায় আসতে হবে না ওয়ারহাউসে।
সুমিতকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে সুজয় ট্যাবটা নিয়ে বেরোতে যাবে, এমন সময়ে সুমিত ওর
হাত ধরে বলে, “রাতে যদি পারিস হাজার দুয়েক টাকা ধার দিয়ে যাস। একটু ভাবতে দে আমায়,
ট্যাবটা আপাতত থাক এখানেই।”
রাতের দিকে সুপারভাইজার এলে সব জিনিস বুঝে নিয়ে যায়। পিঠ চাপড়ে চিয়ার আপ করে
বোনাস না পাওয়ার জন্য দুঃখ করতে বারণ করেন উনি। ট্যাবটাও দিয়েই দেয় সুমিত। একটা
মিথ্যের আশ্রয়ে ওদের আনন্দ মুহূর্তটাকে বিষাক্ত করতে চায় না সে।
সুজয় এসে হাজার টাকা দিয়ে যায়। বলে, এর থেকে বেশি জোগাড় করতে পারেনি। আসার আগে
সুপারভাইজারকে একবার ফোন করে সুজয়।
সুজয় চলে যাওয়ার পর রাতের খাবার খেয়ে ডাক্তারের দেওয়া ওষুধ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে
সুমিত। প্রায় বারোটার পর আচমকা ঘুম ভাঙ্গে ওর। দেখে, প্রায় পঞ্চাশটা মিসড কল
রঞ্জনার।
ফোনটা লাগায় ওকে। ওপার থেকে ভেসে আসতে থাকে শুধুই কান্না, এতক্ষণের না পাওয়ার
দুশ্চিন্তায়। আসতে আসতে সব ঘটনা বলে সুমিত। রঞ্জনাও সহমত হয় সুমিতের আচরণের। মুহূর্তের
ভুলে হতে পারত আরও কোন খারাপ পরিস্থিতি।
ঠিক এই সময় একটা এস এম এস আর একটা মেল ঢোকে সুমিতের।
“রুপিস ৫০০০ ক্রেডিটেড ইন ইওর অ্যাকাউন্ট”
মেলে লেখা, “কোম্পানি ইস রিওয়ার্ডিং ইউ ফর ইউর অনেস্টি অ্যান্ড হার্ড ওয়ার্ক।”
প্রাণ খোলা আনন্দে মাতোয়ারা হয় দুজনে। আকাশে মেঘের ভ্রুকুটি সরে গিয়ে
প্রজাতন্ত্রের ভোরে দুজনের যাত্রা হয় শুরু।
আর একটা মেসেজ ঢোকে মোবাইলে। “হাজার টাকার ধার টা ছাড়াও খাওয়াটা পাওনা রইল।
দিনটা ভালো কাটুক তোদের। - সুজয়”
©Ayan









