
আকাশে আজ মুখ ভার, নেই কোন রংবেরঙের ঘুড়ি। নেই সেই পাড়ায় পাড়ায় বিশ্বকর্মা পুজোর
আয়োজন বা অরন্ধনের নিমন্ত্রন। ভাদ্র মাসে রান্না করে আশ্বিনে খাওয়া, দেবী মনসার
পুজো করে তারপর সকলকে আতিথ্য করা। মূলত বিশ্বকর্মা পুজোর আগের দিনই হত এই রান্নাবান্না।
সেদিন রাতে আর পরের দিন সবাই মিলে একসাথে খাওয়া দাওয়া, এই ছিল অরন্ধনের রীতি। বিশ্বকর্মা
পুজোর দিনে রান্নার চল ছিল না, একেই বলতো বুড়ো রান্না। আগে বাংলা মিডিয়াম স্কুলের
হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা শুরু হত মোটামুটি এই সময়েই। বেশিরভাগ সময়েই এই দু দিনের বিরতির
পরেই থাকতো অঙ্ক পরীক্ষা। তবুও মায়েদের নিষেধ উড়িয়ে ওই দিনটা কাটত বেশ আনন্দেতেই।
কুশলদের জয়েন্ট ফ্যামিলিতে এটা ছিল একটা প্রাক পুজো জমায়েত। কুশলের দাদু ছিল মূল
উদ্যোক্তা। কখনো কখনো একদিন আগে থেকেই বাড়িতে চলে আসত পিসিরা পরিবার নিয়ে। দাদুদের
বোনেরাও আসত এই সময়ে। কোন বার বজবজ থেকে আবার কোন বার অন্য কোথাও থেকে দাদু নিয়ে আসত
মস্ত মস্ত ইলিশ।
দুপুর থেকেই শুরু হয়ে যেত রান্না পুজোর সব আয়োজন। ঠাকুমা থাকতো তদারকিতে। বিশাল
বিশাল থালা হাঁড়িতে ভরে উঠত খাবার। প্রায় ত্রিশ চল্লিশ জনের একসাথে খাওয়ার ব্যবস্থা
হত দুদিনের। ইলিশের নানা পদের সাথে থাকতো হরেক রকম ভাজা, ছাঁচি কুমড়ো আরও অনেক কিছু।
খাওয়া দাওয়া হত কলাপাতায়।
রাতের খাওয়ার আগেই শুরু হয়ে যেত পুজোর জামাকাপড় আদানপ্রদান। সব ভাইবোনদের সাথে
শুরু হত জামাকাপড়ের কাউন্টিং, সাথে সাথে হিসাব হত পুজোর কাউন্টডাউন। সেইদিন থেকেই উঠে
যেত পড়াশোনার পাঠ, অনিয়মের হাতেখড়ি শুরু হত রাতে টিভির পর্দায় চোখ রেখে, অনেক রাত
পর্যন্ত ভাইবোনদের সাথে পুজোর প্ল্যানিং এ।
পরদিন ভোর ভোর উঠে সবাই মিলে কুশলরা ভিড় করত ভীমের দোকানে। এলাকায় মাঞ্জা বিশারদ
আর দারুন ঘুড়ি তৈরিতে সিদ্ধহস্ত ছিল তিন বাই তিনের গুমটি ঘরটা। হরেকরকম ঘুড়ি আর মাঞ্জা
নিয়ে সবাই বাড়ি ফিরত। নাকেমুখে গুঁজে জলখাবার পর্ব মিটিয়েই কুশল সবাইকে নিয়ে পাড়ি
দিত ছাদের ওপরে। এলাকায় ওদের তিনতলা বিশাল ছাদের আশেপাশে তেমন কোন বড় বাড়ির ছাদ না
থাকায় বেশ আমেজ করে ঘুড়ি ওড়ানো যেত। ওর কিছু বন্ধুও আসত একটু পরেই। দাদু এসে ওদের দুপুরে
খাবার খেয়ে যেতে বলত। কেউ কখনো না করত না।
চারপাশের আকাশে শুধু রঙ বেরঙের ঘুড়ি। এখনকার মত নানারকমের ক্যামেরা না থাকলেও ছবি
গুলো উজ্জ্বল হয়ে থাকত স্মৃতির মণিকোঠায়। মাঝে মাঝে তারস্বরে চিৎকার, “ভো কাট্টা!!!!”
কখনো ওদের ছাদ থেকে, আবার কখনো আশপাশের বাড়ির ছাদ থেকে। তার মধ্যে ছোট ভাই বোন
গুলো সাহায্য করত লাটাই ধরতে, আবার ঢিল বেঁধে গাছে বা পাশের বাড়ির কার্নিশে আটকে যাওয়া
ঘুড়ি কুড়িয়ে আনতে। যে যত বেশি নিয়ে আসতে পারবে, তার পিঠ চাপড়ানি ওই যাকে বলে ‘প্যাট
অন দা ব্যাক’ জুটত তত বেশি। দাদাদের মধ্যে নিজেকে একটু জাহির করতে পারত সে। পি টি ঊষার
মত স্প্রিন্টও নিতে হত যখন একটা আটকে যাওয়া ঘুড়ির পিছনে ধাওয়া করত পাড়ার অনেকজন
মিলে, যার হাতে আগে পড়ত সে নিয়েই পগারপার। মাঝে মাঝে কিছু দুষ্টু ছেলে নিজে না
পেলেই অন্যের ধরা ঘুড়ি ছিঁড়েও দিত। তা নিয়ে শুরু হত আরেক লঙ্কাকাণ্ড।
এসবের মাঝে কখন যে দুপুর গড়িয়ে যেত। বিশাল দালানে একসাথে পাত পেড়ে মাটিতে বসে খাওয়া
দাওয়া। প্রথমে বাড়ির ছোটরা, দাদু আর বাড়ির জামাইরা, তারপর বাবা কাকা পিসিরা, সব শেষে
মা আর ঠাকুমারা। আর খাওয়ার পর ছোটরা জল আর নুন দিয়েই করত পরিবেশনের হাতেখড়ি। এত ভরপেট
খেয়েই আবার সবাই আবার ছাদে উঠত ঘুড়ি ওড়াতে। মা পিসিদের মজলিশ বসত বাড়ির বৈঠকখানায়।
কখনও আবার ছাদে উঠে মেতে উঠত ছোটদের সাথে। বড় বড় মোটা দেওয়ালের বাড়িগুলো তখনো এত তেতে
পুড়ে এসি র আবদার করত না। পারস্পরিক উষ্ণতার পরশ থাকতো সবারই অন্তরে।
রাতের বেলা পেট পুজোর পর্ব মিটিয়ে সবাই রওনা দিত নিজের বাড়ির দিকে। বাড়ি ফাঁকা
হতেই কুশলের শুরু হত অঙ্ক পরীক্ষার আতঙ্ক।
আজ কুশলের ছেলের অনলাইন ক্লাস চলছিল, ওরও অফিসের কাজ। বিশ্বকর্মা পুজোয় আর ছুটি
থাকে না আজকাল। কাল বাজার ফেরতা চোখে পরেছিল ভীমের গুমটির জায়গাটা। এখন একটা মোবাইল
রিপেয়ারিং এর দোকান হয়েছে ওখানে। হঠাৎ করেই ফ্ল্যাটের জানলা দিয়ে গোঁৎতা খেয়ে আটকাল
একটা ঘুড়ি। গুনগুন করে উঠল কুশল, “পেট কাঠি চাঁদিয়াল…”
©Ayan





0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন