
ভারতের ৭৫ তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে
প্রতি বছরের মতই সারা দেশে চালু হয়েছে চুড়ান্ত সতর্কতা। এই সময় জঙ্গি গোষ্ঠী গুলো একটু
বেশিই নাশকতামুলক কাজকর্ম করতে তৎপর হয়। বিদেশ মন্ত্রকের নির্দেশে প্রতিটি রাজ্যস্তরে
হবে তার ব্রিফিং। সেই জন্যই আজ লালবাজারে বিশেষ মিটিং। সুমি কেও যেতে হচ্ছে সেইকারণেই।
সুমি মানে সৌমিলি সেন, ইন্সপেক্টর, হোমিসাইড। যদিও পোস্ট হিসাবে ওর এখানে যাওয়ার কথা নয়, কিন্তু এযাবৎ
কিছু গুরুত্বপূর্ণ কেস সল্ভ করে লালবাজারের অফিসারদের নেক নজরে আছে ও। তারজন্য যদিও
একটু আধটু এক্সট্রা পরিশ্রম করতে হয় ওকে, কিন্তু নতুন কেস সল্ভ করার আনন্দটা অনেক
বেশি আরামদায়ক।
ঠিক ১০ টায় শুরু হয় মিটিংটা। সেন্ট্রাল
মিনিস্ট্রির ফুল ডিটেইল্সটা ব্রিফ করা হয় আর সম্ভাব্য পরিকল্পনা বলা হয় সকলকে। মিটিং
শেষের পর ডিটেক্টিভ ডিপার্টমেন্টের হেড
মিঃ রায় বলেন, কি মিস সৌমিলি সেন, কেমন আছেন? নতুন কোন কেস আসছে
না নাকি?
“কি যে বলেন স্যার, না এলেই মঙ্গল। বোঝা
যাবে দেশ টা এগোচ্ছে।”
“চোখ কান খোলা রাখুন, এখন সাইবার ক্রাইম
কিন্তু খুব বেড়েছে। কিছু দরকার থাকলেই জানাবেন, আপনাদের মত ইয়ং ব্লাডই দরকার ডিপার্টমেন্টের।”
“সিওর স্যার, হ্যাভ আ গুড ডে।”
গাড়ি থেকে নামার আগেই ফোন এলো সুভাষের। সুমির থানার অফিসার ইন চার্জ। "ম্যাডাম, মার্ডার কেস ফ্রম বউবাজার। আমি অ্যাড্রেস টা টেক্সট করে দিচ্ছি।"
"ঠিক আছে, আমি আসছি।" ড্রাইভারকে গাড়ি ঘুরিয়ে ওদিকে যেতে বলে সুমি। অনেক খোঁজার পর টিপিকাল নর্থ কলকাতার অলি গলি পেরিয়ে খুঁজে বের করে বাড়িটা। ততক্ষণে সুভাষও এসে গেছে। বাইরে থেকে বাড়িটার আলাদা কোনোরকম বৈশিষ্ট্য দেখতে পেল না সুমি। নিচে একটা প্রেস এর ঘর, ভাড়ায়। উপরের এক কামরার ঘরের মধ্যে ঢুকেই দেখতে পেল ডেডবডিটা, বছর ৭০-৭২ এর বৃদ্ধা। রক্তে ভেসে যাচ্ছে ঘরটা, কোনায় বডির পাশে বসে আছে এক বছর ১৫র কিশোরী। বাড়ির লোকজনের সাথেই জড়ো হয়েছে আশেপাশের পড়শিদের ভিড়ও। সুভাষ কনস্টেবলকে দিয়ে বাড়ির লোক ছাড়া সবাইকেই সরিয়ে দেয়। পাশের একটা ঘরে সুমির বসার ব্যবস্থা করে ব্রিফ দেয় এখনও পর্যন্ত জানা তথ্যের।
মৃতার নাম যমুনাবালা মিত্র, বউবাজারের মিত্র পরিবারের কর্ত্রী। কিছুদিন আগেই ঘটে যাওয়া মেট্রোর সুড়ঙ্গ ধসে বাকি ৫০ টি বাড়ির মতই মিত্র বাড়িও মাটিতে ধসে পড়ে, রাতারাতি পথে বসে পুরো পরিবার। পরিবারে আছে দুই ছেলে ও তাদের বউ, বড় ছেলের এক মেয়ে আর ছোট ছেলের এক ছেলে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সবার জন্য ধর্মতলার কাছেই কিছু হোটেলে থাকার ব্যবস্থা হলেও বড় ছেলের মেয়ে ঋতু তার আদরের ঠাকুমার সাথে থাকত এখানেই। ঋতুর এবার মাধ্যমিক, হোটেলের ঘরে গাদাগাদিতে পড়ার দফারফা। তার ওপর এখান থেকে স্কুলটাও কাছেই। তাই ঠাকুমা নাতনিতে এখানেই থাকছিল শেষ কয়েক সপ্তাহ। এটাও ঋতুর দাদুর সম্পত্তি, বেশিরভাগই ভাড়া দেওয়া। বডির পাশে থাকা মেয়েটিই তাহলে ঋতু। শেষ কিছুদিনের দুটো বড় দুর্ঘটনা পরিবারটিকে তছ্নছ্ করে দিয়েছে।
"সুভাষ, সবার বয়ান নাও আর ঋতুকে পাঠিয়ে
দাও এঘরে। আশপাশে একটু খোঁজ লাগাও কাউকে দেখেছে কিনা। ছুরি বসিয়ে খুন আবার
মার্ডার উইপন নিয়ে চম্পট দেখে তো প্ল্যানড বলেই মনে হচ্ছে।"
একটু পরে ঘরে এল ঋতু। শান্তশিষ্ট চেহারার মেয়েটা একদম মুষড়ে
পড়েছে। একটু সময় নিয়ে কথা শুরু করলো সুমি।
“কি নাম তোমার?”
“ঋতু”
“জানি তোমার এখন মনের অবস্থাটা, কিন্তু তোমার সাহায্য আমাদের
সব থেকে বেশী লাগবে এখন তোমার ঠাকুমার খুনি কে ধরতে। কি, আমাদের সাহায্য করতে পারবে
তো?” হালকা করে মাথা নাড়ায় ঋতু।
“আজকের সকালের পুরো ঘটনাটা আর একবার বল।”
ঋতু বলতে শুরু করে “রোজকার মত আমি ভোর ৫.৩০ এ উঠে একটু পড়াশোনা
করে, প্রাতঃক্রিয়া করে ৭ টা নাগাদ টিউশানে যাই। ঠাম্মা আমায় খাবার করে দেয়। বেরনোর
আগে গলা জড়িয়ে চুমু খেয়ে বেরিয়ে যাই আমি। ফিরে এসে দেখি ঘরের দরজা ভেজানো। ভিতরে ঢুকে
দেখি এই অবস্থা। কিছুটা ধাতস্থ্য হয়ে কল করি বাবাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে যায় ওরা,
সঙ্গে পুলিশ ও।” ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে ও।
সুমি জিজ্ঞাসা করে, “কাউকে সন্দেহ হয় তোমার? ইদানীং ওঁকে কোন
টেনশন করতে দেখেছ?”
নেতিবাচক ঘাড় নাড়ে সে। “ঠাকুমা তো সারাদিন ঠাকুর নিয়ে আর আমার
জন্য রান্না নিয়েই থাকতো।” ওকে যেতে বলে সুমি বাইরে আসে।
ইতিমধ্যে সুভাষ বাকি সকলের সাথে কথা বলেছে। তেমন কোন নতুন দিশা
পায়নি। ঘর থেকে কোন জিনিস চুরি যায়নি, ছিলও না তেমন কিছু মূল্যবান জিনিস। ফরেন্সিক
ও এসে গেছে সব নথি সংগ্রহ করতে। সুমি সুভাষকে বলে বডি পোস্টমর্টেমের জন্য পাঠিয়ে ওর
সাথে আসতে। হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে যমুনা দেবীর বড় ছেলে মানস আর ছোট ছেলে তাপসকে জিজ্ঞাসা
করে, “আচ্ছা আপনারা এখানে সব জিনিসপত্র আনলেন কিভাবে, সব তো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।
এখানে ঠাকুরের সিংহাসনটাও দেখছি আছে। দেখে তো নতুন মনে হচ্ছে না। ”
“আসলে সেদিন প্রথমে প্রাণ বাঁচাতে সবাই বেরিয়ে আসি। পরের দিন
গিয়ে কিছু দরকারি কাগজপত্র, মেয়ের বইপত্র আর মায়ের ঠাকুরের সিংহাসনটা নিয়ে আসি। আসলে
আমাদের কুলদেবতা, আর মায়ের প্রাণ। মা চিরকাল বলত ঠাকুরই আমাদের চিরকাল বিপদ থেকে রক্ষা
করবে, কিন্তু শেষ দুবার আর পারল কই!!” মানস বলে ওঠে।
“ঠিক আছে। আপনাদের কারোর কিছু মনে পরলে আমাকে জানাবেন, আর মেয়েকে
চোখে চোখে রাখবেন কদিন। ওর সব থেকে বেশি শক্ড। আর হ্যাঁ, পুলিসকে না জানিয়ে কেউ শহর
ছাড়বেন না। আপনার মায়ের কি কোন উইল আছে?” না বলেন মানসবাবু। এমনকি এটাও বলেন, মায়ের
পেনশনের টাকা মা নিজেই খরচ করত নাতি নাতনিদের শখ আহ্লাদের জন্য। কর্মঠ থাকার জন্য এখনো
একা একাই ব্যাংক, পোস্ট অফিসের কাজও করতো।
গাড়িতে উঠে সুভাষকে বলে, “কি বুঝছ? কোন মোটিভ পেলে? তুমি বরং
একবার ওদের হোটেল রুম টা চেক করে এসো।” ওকে হোটেলে ড্রপ করে থানায় চলে আসে। এক কাপ
কড়া কফি দিতে বলে ওর টেবিলে।
বিকেলের দিকে সুভাষ ফিরে চলে আসে সুমির টেবিলে। হোটেলের ঘর
থেকেও পায়না কোন সুত্র। এদিকে দুই ভাইয়ের আর্থিক অবস্থাও ভাল আর সম্পত্তি নিয়ে কোন
বিবাদের চিহ্নই নেই। এমনকি এই কদিনে হোটেলে থাকাকালিন অন্যান্য পরিবারও অনুভব করেছে
দুই জায়ের বন্ধুত্ব। তাই আচমকা মিত্র পরিবারের বিপদে সবাই বেশ মনমরা।
“ল্যাব থেকে ছবিগুলো এসেছে?”
“সফ্ট কপিটা দিয়েছে, কাল প্রিন্টটা দেবে।”
“আমাকে কপিটা পাঠাও আর কাল প্রিন্ট কপি পেলে একবার নিয়ে যাব
ওদের কাছে।” সফ্ট কপিটা দেখে কিছু বের করতে পারে না তেমন। একজন সুস্থ সবল ৭২ এর মহিলা
কে প্ল্যান মত মারার দরকার পড়ল কার? লাভবানই বা হল কে বা কারা? আশপাশের কোনো ঘটনা দেখে
নেওয়ার মাশুল দিতে হল না তো ওনাকে? রাতে বাড়ি ফিরে বিছানায় মাথা এলিয়ে দিল সুমি। এটা
ওটা চিন্তা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে মনে নেই।
ঘুম ভাঙল ৫ টার অ্যালার্মে। মর্নিং ওয়াক সেরে ব্রেকফাস্ট করে
তৈরী হয় সুমি। সুভাষকে ফটো প্রিন্ট কালেক্ট করে ওকে পিক আপ করতে বলে। সাড়ে দশটা নাগাদ
যখন ওরা পৌঁছল মিত্র পরিবারের হোটেলের ঘরে, তখনও ওরা প্রাথমিক আঘাত কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
সুমি ছবিগুলো সবাইকে মন দিয়ে দেখতে বলে, কিছু অসংলগ্ন লাগলে বলতে বলে ওদের। সবাই একে
একে দেখে কিছুই তেমন পায় না। হঠাৎ ঋতু বলে ওঠে, “আরে, ঠাকুরের মুখে নকুলদানা কই? আমি
তো পুজো দিয়েই গিয়েছিলাম।” সুমি ছবিটা ওর হাত থেকে নিয়ে দেখে যে সত্যি সেখানে কিছুই
লেগে নেই। যদিও পরের ছবিতেও ঠাকুরের আসনের ওপরে পড়ে নেই কোনো নকুলদানার চিহ্ন। ঋতুর
পিঠ চাপড়ে বেরিয়ে পরে, গন্তব্য খুনের স্পট। যাওয়ার মাঝে ফোন লাগায় দত্ত দা কে।
“কেমন আছেন দত্ত দা? কালকের একটা হোমিসাইড কেস এর এভিডেন্স
গেছে না? কিছু পেয়েছেন স্পেসিফিক? আচ্ছা, একটা ঠাকুরের মূর্তিও ছিল, একটু চেক করে জানাবেন,
কোনো নকুলদানার ট্রেস পেয়েছে কিনা?” উনি খোঁজ নিয়ে জানাবে বলেন। সুমিরা স্পটে গিয়ে
সিংহাসনের কোথাও কোনো ট্রেস পায় না। ফোন করে মানসবাবুদের থেকে এই মূর্তির কোনো ইতিহাস
থাকলে জানতে বলে সুভাষকে।
সুভাষ জানায়, মিত্র পরিবারের পূর্বপুরুষরা ছিলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের
কুল পুরোহিতের বংশধর। ওরা শুনেছে এই মূর্তি ওদের প্রপ্রপিতামহের হাত ধরেই ঢুকেছিল এই
পরিবারে। যদিও দুই ভাই কেউই এসবে বিশ্বাস করতো না যেহেতু কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল
না মূর্তিটার।
কিছুক্ষণ পরে দত্ত দা জানান যে পুজোর কোনো উপাদানেরই ট্রেস
নেই মূর্তিতে, তা সে নকুলদানাই হোক বা বাসি ফুল। এটা একদম নতুন কেনা, আনকোরা। টেবিল
চাবড়ে ওঠে সুমি, একটু মোটিভের আলো দেখা দিয়েছে।
ঋতুকে নিয়ে দুই ভাইকে একবার থানায় আসতে বলে। ইতিমধ্যে ল্যাব
থেকে আনিয়ে নেয় মূর্তিটা। ওদের সামনে নিয়ে আসে মূর্তিটা, ভাল করে হাতে নিয়ে এভিডেন্সের
প্যাকটা পরখ করতে বলে। মানস, তাপস তেমন কিছু বলতে না পারলেও ঋতু মূর্তিটা নিয়ে বলে
এটা খুব হালকা, এটা অন্য কোনো মূর্তি, আমাদেরটা নয়। শান্ত হয়ে সুমি জানায়, “মানস বাবু,
আপনাদের মূর্তিটা চুরি হয়েছে, কিন্তু কি কারণে এখনো ঠিক জানিনা। আপনাদের কোনো রিলেটিভ
আছে যারাও এই মূর্তির অংশীদার হতে পারত, রিসেন্টলি কোনো থ্রেট কল বা কোনো সন্দেহজনক
কিছু টের পেয়েছেন?”
“না, সেরকম কিছু তো আসেনি। আর আমাদের ফ্যামিলি ট্রি তে আর কেউ
এরকম ছিল বলে তো শুনিনি।”
“আপনাদের এই বংশের ইতিহাস নিয়ে বা এই মূর্তি নিয়ে এরকম কোথাও
কোনো লেখা প্রকাশিত হয়েছিল কিনা বলতে পারেন?”
“সেরকম কিছু তো মনে পড়ছে না।” এবার তাপস বলে ওঠে, “দাদা সেই
আমরা কলেজে পড়ার সময় একটা কি লেখা বেরিয়েছিল না যুগান্তর-এ? বাবা অফিস থেকে ফিরে দেখিয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ। সে বহুদিন আগের কথা, আমি ভুলে গেছিলাম। ১৯৯৪-৯৫
সাল নাগাদ হবে। বাবা বলেছিল বটে যে ওটা আমাদের নারায়ণ মূর্তি নিয়েই লেখা। কিন্তু মিত্র
বাড়ির নাম লেখা না থাকায় আমরা বাবার সাথে মস্করা করেছিলাম।”
“অনেক ধন্যবাদ, আবার দরকার পরলে আপনাদের ডেকে পাঠাব। আর কিছু
মনে পরলে আমাকে কল করবেন, নাম্বারটা নিয়ে নিন সুভাষের থেকে।”
ঝটপট পুরনো ডেটাবেস থেকে ওই সময়ের যুগান্তর খুঁজতে লাগিয়ে দেয়
কয়েকজনকে। ওদিকে পোস্টমর্টেমের রিপোর্ট এসে পৌছয়, অতিরিক্ত কিছু পায় না ওখান থেকে।
রাতের মধ্যেই টিম খুঁজে বের করে প্রকাশিত লেখাটা। লেখক মনোময় ঘোষ। টিম আবার খুঁজতে
বসে লেখকের পরিচিতি। একঘণ্টার মধ্যে সুমিও পড়ে ফেলে ফুল রিপোর্টটা। ইতিমধ্যে টিম বের
করে ফেলে লেখক মনোময় ঘোষের ঠিকানা। ইতিহাসবিদ, যাদবপুরের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর। সুমি
ঘড়ি দেখে, রাত ২.৩০। সবাইকে একটু রেস্ট নিয়ে নিতে বলে ও।
পরদিন সকাল ৬ টায় হাজির হয় প্রফেসর মনোময় ঘোষের বাড়ি। “নমস্কার,
আমি ইন্সপেক্টর সৌমিলি সেন, আমরা একটা ইনভেস্টিগেশনে এসেছি। আপনি প্রায় বছর
২৫ আগে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নারায়ণ মূর্তি নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলেন। সে বিষয়েই কথা
বলতে এসেছি।” মিঃ ঘোষ সব শুনে বললেন, “কি ব্যাপার বলুন তো, আরেকজনও ওই মূর্তি নিয়ে
জিজ্ঞাসাবাদ করতে এসেছিল। বলেছিল ইতিহাসে পি এইচ ডি করছে। আমার কাছে অনেকক্ষণ বসে সব
জেনেছিল, এমনকি আমার রিপোর্টে না থাকা মিত্র বাড়ির কথাও বলেছিলাম ওকে।”
“ওর কোনো কার্ড দিয়েছিল বা ওকে দেখলে চিনতে পারবেন? কবে নাগাদ
এসেছিল।” বলতে বলতেই ফোনে ধরে পুলিশের একজন স্কেচ আর্টিস্টকে। চলে আসতে বলে এই লোকেশানে।
“দেখলে ঠিক চিনে নেব। ওই তো যেদিন মেট্রোর সুড়ঙ্গে ধস নামলো
তার ঠিক আগের দিন এসেছিল।”
“আর কিছু মনে আছে ওর সম্বন্ধে?” না বলেন ভদ্রলোক। সুভাষকে বলে
বেরিয়ে যায় ওখান থেকে। স্কেচ হয়ে গেলেই পাঠাতে বলে ওকে।
সুমি মনে মনে ছকে নেয় ঘটনার প্রেক্ষাপট। মেট্রোর সুড়ঙ্গে ধস
হয়ত বিলম্বিত করেছিল বৃদ্ধার মৃত্যু, আততায়ী কে খুঁজে বের করতে হয়েছিল নতুন আস্তানা।
সুমি চলে যায় মিত্রদের হোটেলের ঘরে। আবার জিজ্ঞাসা করে এখানে আসার পর কেউ যমুনা দেবীর
ওই বাড়ির অ্যাড্রেস নিতে এসেছিল কিনা। তাপসের বউ বলেন, “একজন মাঝে এসেছিল পোস্ট অফিস
থেকে মায়ের পেনশনের লাইফ সার্টিফিকেট নিতে। আমি ওবাড়ির অ্যাড্রেস বলেছিলাম। জিজ্ঞাসাও
করেছিলাম, সে তো পোস্ট অফিসে গিয়ে করতে হয়, বাড়ি থেকে তো নিয়ে যায় না। আমাকে বলেছিল
আমাদের এই দূরবস্থার জন্য সরকারের ব্যবস্থাপনায় এটা করা হচ্ছে। আমিও বিশ্বাস করে নিয়েছিলাম।”
সুভাষের কল আসে, স্কেচ তৈরি হয়ে গেছে। ও চলে যাচ্ছে লালবাজারে,
আশপাশের সিসিটিভির কোনো ফুটেজ পাওয়া যায় কিনা দেখতে। ছবিটা পাঠিয়ে দেয় সব থানা, এয়ারপোর্ট,
স্টেট বর্ডারেও। অ্যান্টিক জিনিস স্মাগলিং হওয়ার চান্সই সবথেকে বেশি। সুমিকেও সেন্ড
করে দেয় হোয়াটস্অ্যাপে। সুমি ছবিটা দেখায় তাপসের বউকে, কনফার্ম করে সে। ছবিটা দেখে
মনে হয় লোকাল হ্যান্ডলার।
ক্রাইম ডেটাবেসে ছবিটার কোনো হদিস পায় না টিম। কিন্তু সুভাষ
পেয়ে যায় আততায়ীর ফুটেজ, খুনের পরেরই টাইমে ওই গলি থেকে বেরনোর মুখে। বাঁ হাতে ফোনে
কথা বলতে বলতে চলে যায়। সুমি একটা ফোন লাগায় দত্তদা কে। সমস্ত বলে ছবি আর ভিডিও সেন্ড
করে। একটা ঠিকানা পায় আধার ডেটাবেস থেকে, আর দত্তদা ইনফরমেশন দেয় বাঁহাতি। কালবিলম্ব
না করে টিম নিয়ে চলে যায় ওই লোকেশানে। ধরা পড়ে ছেলেটি, যদিও আইডেন্টিফাই হয় সে ডানহাতি,
ফিংগার প্রিন্টও ম্যাচ করে না। চাপ দিয়ে বের করা হয় অপর আরেকজনের নাম ও লোকেশান। ধরা
পড়ে সেও গুয়াহাটি এয়ারপোর্টে। লাগেজ থেকে পাওয়া যায় নারায়ণের মূর্তি।
পরদিন সুমি সবাইকে নিয়ে বসে মিত্র পরিবারের সাথে, প্রফেসর মনোময়
ঘোষও উপস্থিত। “এই যুগে আপনাদের মত সৎ দুইভাইয়ের দেখা পাওয়া দুস্কর। মূর্তির হাতবদলের
কথা বুঝতে পারার পরই আমার সন্দেহ যায় আপনাদের দিকে। আমি জানিনা আপনারা ওই লেখা পড়েননি,
নাকি পুরো নিরুৎসাহী ছিলেন। যদিও লেখাটা পড়ে আমার সন্দেহ আপনাদের ওপর থেকে পুরোপুরি
চলে যায়। তবু আমি সকলের বিশেষত ঋতুর জন্য লেখাটার সারমর্ম পরতে চাই। পারিবারিক সম্পদ
রক্ষায় প্রথম সাহায্য কিন্তু ওই করেছিল আমাদের।
“রাজা কৃষ্ণচন্দ্র খুব ধার্মিক মানুষ ছিলেন। অনেক মন্দির ও
সেবা প্রতিস্থান স্থাপন করেছিলেন তিনি। পলাশীর যুদ্ধের সমকালীন সময়ে তিনি তাঁর কুলপুরোহিতকে
একটি নারায়ণ মূর্তি দেন। কথিত আছে যে ওর মধ্যেই ছিল এক দুস্প্রাপ্য হীরে। সারা জীবন
সেবা করার জন্যই তিনি এটি দিয়ে যান তাঁর কুলপুরোহিতকে, আর বলে যান সেটা বংশপরম্পরায়
পুজো করে যেতে। আরও লেখা ছিল, সেই কুলপুরোহিতের পরিবারের বাস এখন কলকাতায়। যদিও সেখানে
মিত্র পরিবারের নাম উল্লেখ নেই কোথাও।”
যদি কিছু মনে না করেন তাহলে কি মূর্তিটা দেখতে পারি একবার?”
“নিশ্চয়ই”, বলে ওঠে মানসবাবু।
সাদামাটা মূর্তির পিছনে একটা ছোট্ট ঘাঁট। একটু ঘোরালেই খুলে
যায় ভিতরের সুড়ঙ্গ। মাঝখানে জ্বলজ্বল করছে সেই রত্নখচিত হীরে।
©Ayan
রচনার তারিখ: ১৪ ই অগাস্ট ২০২১





0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন