
দিনকাল তখন ফেসবুক টুইটারের বেড়াজালে আটকে ছিল না। ছিল না শুধু শরীর সর্বস্ব ভালবাসা। স্কুল ফেরতা পথে তার এক পলক চাহনির ঝলক পেতে কাটিয়ে দেওয়া যেত অনেক পড়ন্ত বিকেল, যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অজানা থাকতো সম্পর্কের অভিমুখ। তবুও ওই ফেলে আসা জীবনের আনন্দ অনেককেই আজও করে তোলে স্মৃতিমেদুর।
এরকমই এক সময়ের গল্প বলব আজ। সময়টা ১৯৯৯ সাল, তরুণ ছিল এক প্রাণ চঞ্চল ছেলে, যেকোনো পাড়ার লোকের বিপদে আপদে এক ডাকে চলে আসত নিজের দলবল নিয়ে। পড়াশোনায় বিশেষ মনোযোগ ছিল না কোনোদিনই। যদিও পরোপকার করতে গিয়ে মানে এর নোট্স ওর কাছে পৌঁছে দিতে গিয়ে সব কিছুই পেয়ে যেত কোন মন্ত্রবলে। তাই চিরকাল হামাগুড়ি দিয়ে পাস করে গেলেও ফেলের চৌকাঠ মাড়াতে হয়নি ওকে। তা এই তরুণ অন্য টিউশান মিস করলেও বাংলা টিউশান কোনোদিন মিস করতো না, বিশেষত নাইনের পর থেকে। উঁহু, ভাববেন না যে সামনে মাধ্যমিক বলে ও পড়ায় মনোযোগী হয়েছিল। আসলে, নাইন থেকে টিউশানে ভর্তি হয় শম্পা, যার প্রতি ও নাকি প্রথম দিন থেকেই ফিদা ছিল। কিন্তু, ওই যে বললাম, তখন দিনকাল এমন ছিল যে, বাড়ির লোকের হাতে প্যাঁদানি খাওয়ার আগেই টিচার, পাড়ার কাকা-জ্যাঠা আর যে যে পারত হাতের সুখ করে নিত। আর তারপর স্পেশাল ডিশ হিসাবে জুটত বাবা-মা এর হাতের মার।
তো সেই তরুণের বন্ধুর কোন অভাব ছিল না। বন্ধুরাও তরুণের জন্য প্রায় জান হাজির টাইপ। আসতে আসতে বন্ধুদের দ্বারা খোঁজ নিতে নিতে শম্পার সাথে সেম অঙ্কের কোচিনেও ঢুকে গেল সে। পড়ার প্রতি মনোযোগ না বাড়লেও শম্পার প্রতি মনোযোগ ও আকর্ষণ বাড়তে লাগলো তরুণের। তরুণের মা ওকে স্কুলে সাইকেল নিয়ে যেতে দিত না বাস রাস্তা দিয়ে যেতে হত বলে। কিন্তু বন্ধুবৎসল তরুণ জুটিয়ে নিত রোজই কারো না কারোকে যার সাথে সাইকেল চেপে ফিরত স্কুল থেকে। অবশ্য জি টি রোড ধরে না এসে ভিতরের রাস্তা ধরে ফিরত আদর্শ বালিকার পাস দিয়ে। ওহ বলতে ভুলে গেছি, আদর্শ বালিকা হল ওই সময়ের সেরা মেয়েদের স্কুল, ডানাকাটা পরীরা পড়ত সব ওখানে, পড়াশোনা, নাচ গান, সবকিছুতেই চৌখস। শম্পাও পড়ত ওই স্কুলেই, তাই ফেরার পথে বিভিন্ন জায়গায় ঠেক মেরে এক পলক চোখের দেখা দেখতে চাইত ওকে। বেশিরভাগ দিনই দেখতে পেত, কিন্তু কখনো আবার দেখাই পেত না। ঠিক যেন শরতের মেঘের মত রোদ বৃষ্টির লুকোচুরি।
এইরকম কিছুদিন যেতে যেতে একদিন ও অনিন্দ্যর সাথে সাইকেলে ফিরছে, কিছুদুর যাওয়ার পর দূর থেকে দেখে শম্পা বসে আছে শিবমন্দিরের পাশের বটতলায়। মনে একটু পুলক জাগার আগেই দেখে পাশে রয়েছে তনুজা, ওর ছায়াসঙ্গি, বন্ধুরা মজা করে বলে বডিগার্ড। হঠাৎ ওই স্থূল বহর নিয়ে সাইকেলের প্রায় সামনে ঝাঁপিয়ে এসে পড়ে তনুজা। ক্যাঁচ করে ব্রেক চেপে অনিন্দ্য। “কিরে তরুণ, খুব দেখছি শম্পার পিছনে লেগেছিস। ভাল করে বলছি, এদিকে বেশি নজর দিস না। সামনে মাধ্যমিক, পড়াশোনায় মন দে। নাহলে কিন্তু তোর বাবা কে জানিয়ে দেব।” ওই সময় এই বাবা কে বলে দেওয়া উক্তিটি বললেই বেশিরভাগ কেসের ইতি হত। বাবার হাতের ছাতার বাঁট থেকে লাঠির গাঁট, যেকোনো কিছুর মারই বাকি থাকতো না।
তরুণ একটু শান্ত হয়ে ধীরে বলল, “তনুজা, তাহলে কি মাধ্যমিকের পরে লাগতে বলছিস? কিন্তু ও অতদিন ধৈর্য ধরে থাকতে পারবে তো?” অনিন্দ্য তো উত্তর শুনে ভিরমি খাবার জোগাড়, মনে মনে ভাবছে ওর বাড়িতে জানতে পারলে কিছু না করেই উত্তম মধ্যম জুটবে আজ ওরও। শম্পা এবার এগিয়ে এসে বলে, “না, আর থাকতে পারছি না বলেই তো বলছি, এরকম ভাবে তোর জন্য উদাস হয়ে থাকলে মাধ্যমিকটা আর পাস করতে হবে না আমায়, তাই বলছি আর এই কিছুমাস এভাবে দেখা করিস না।”
“ধুস, আমে দুধে মিশে গেল, আঁটি গড়াগড়ি খেল।”, তনুজা বলে উঠে অনিন্দ্যকে। বলে, “চল আমরা ওই বটতলায় বসি, ওরা একটু আগে পরের মীমাংসা করে নিক।” হাসতে থাকে অনিন্দ্য। জীবনটা এরকমই রঙিন ছিল তখন, ঝুপ করে সন্ধ্যে নামলেও আকাশে দেখা যেত আকাশ প্রদীপ। আজকের দুনিয়ায় চটক বেশি, দেখনদারি বেশি, কিন্তু সবই অন্ত্যঃসার শূন্য। যাইহোক সেই মীমাংসা চলল প্রায় ৩০ মিনিটের বেশি। আসতে আসতে সবাই জানতে পারল ওই গুটিকয় শিকে ছেঁড়া কিশোরের মত ভাগ্য ফিরেছে তরুণের। এনিয়ে সময় অসময়ে মস্করা চলত খুব। কিন্তু শম্পার বাড়ি খুব নিয়মকাননে কঠোর হওয়ায় ওদের ঘোরাঘুরি যত না হত বাস্তবিক, তার থেকেও বেশি হত বন্ধুদের মানসিক ভ্রমন। এই যেমন কদিন আগে, বিভাস বলছিল ওদের নাকি বটানিক্যাল গার্ডেনে দেখেছে, চেপে ধরতে বলে ও নাকি আবার শুনেছে মানসীর কাছে। রোজকার রুটিনে স্কুল ফেরতা আধঘণ্টার দেখা আর ওই দুটো কোচিন শেষে একটু দাঁড়িয়ে গল্প করা, এইটুকুই ছিল পাওনা। যদিও আজকের প্রেমিক প্রেমিকাদের মত নিজস্ব মুহূর্ত বা অন্তরঙ্গ অনুভুতি ছিল কল্পনার অতীত।
এভাবেই দিন কাটে, মাস কাটে। মাধ্যমিকের আর এক মাস বাকি। টিউশান ও বন্ধ হতে চলায় দেখা হওয়ার উপায় ও বন্ধ হয় ওদের। একদিন দুপুরে দুজনেই ভয় ডর কাটিয়ে বাড়ির লোককে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পগারপার হয় স্টেডিয়ামের পাশের নিরালা এলাকায়। প্ল্যানে সাহায্য করে তনুজা, ওদের বাড়িতে সবাই একসাথে পড়বে বলে জানিয়ে দেয় শম্পার মা কে। অনেক দিনের সুপ্ত অনুভুতি প্রকাশ করে দুজনে, প্রথম চুম্বনের সাক্ষী থাকে শীতের দুপুরের নিস্তব্দতা। শম্পা বলে, “পরীক্ষার আগে আর দেখা করা যাবে না, আবার দেখা করব পরীক্ষার শেষ দিনে। ততদিন এই ভালবাসার পরশ নিয়েই পড়ায় মন বসা।” প্রায় ২.৩০ ঘণ্টা কাটিয়ে সুখের সাগরে ভেসে যখন প্রায় বেরতে যাবে ওখান থেকে, ঠিক তখনই অসময়ে বাঘের ভয়ের মতই উদয় হয় শম্পার কাকা। দিকবিদিক শূন্য হয়ে যায় তরুণের, শম্পার হাত ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে যান উনি।
রাতের বেলা ফোন আসে তরুণদের বাড়ির ল্যান্ডফোনে। বাবা অফিস ফেরতা কানাঘুষোতে কিছু শুনে থাকলেও বিশেষ পাত্তা দেয়নি হয়ত, কিন্তু এই ফোনালাপের পর তরুণের ভাগ্যে জুটল জুতো পেটা। ওদিকে শম্পা হল পুরোপুরি গৃহবন্দি। তরুণও ছেড়ে দেওয়ার ছেলে নয়, তার ওপর রক্ত ফুটছে তখন টগবগ করে। পরের দিনই চলে যায় শম্পার বাড়ির সামনে, চিৎকার করে জানান দেয় ওর ভালবাসার অনুভূতি। মুহূর্তের মধ্যে ওর বাড়ির লোকজন বেরিয়ে মেরে ভাগিয়ে দেয় ওকে, আর বলে কোনোদিনও যেন শম্পার ত্রিসীমানায় না দেখে ওকে। কুঁড়িতেই বিনষ্ট হতে চলে ওদের পথ চলা।
এদিকে পরীক্ষার কারণে বন্ধুদের মধ্যে দেখাসাক্ষাৎ কম হলেও এই খবর দ্রুত ছড়িয়ে পরে এলাকার মধ্যে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে মাধ্যমিকের ঠিক ২ দিন আগে পালিয়ে যায় দুজনে। দুই বাড়ির লোকজনই অনেক খোঁজ করে, থানা পুলিশও হয়। কিন্তু দেখা মেলে না ওদের। তনুজাকে আর তরুণের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদেরও এরই মধ্যে জেরা করে পুলিশ, কিন্তু কিছুই লাভ হয় না। শম্পার বাড়িতে উদ্ধার হয় একটা চিরকুট, লেখা আছে “আমাদের খোঁজার চেষ্টা করো না। তরুণের ফ্যামিলিকেও জড়িও না। আমার জেদ তোমার মতই, তুমি যেমন আমাদের মিশতে দেবে না বলেছিলে, তেমনি আমিও বললাম আমাদের আলাদা করতে পারবে না।” শম্পার বাবা নিস্তেজ হয়ে গেলেও কাকা কিন্তু ছাড়বার পাত্র ছিলেন না। পুলিশকে বলেন, আমাদের মেয়ে নাবালিকা, ওকে দিয়ে জোর করিয়েই এসব লিখিয়ে নেওয়া হয়েছে। আপনারা খুঁজে বের করে দিন আমাদের শম্পাকে। পুলিশ চেষ্টা করলেও লাভের লাভ কিছুই হয়নি।
এভাবে পালিয়ে যাওয়া ভবঘুরে তরুণের জন্য মেনে নেওয়া গেলেও পড়াশোনায় ভাল শম্পার জন্য এটা বন্ধুমহলেও বিশ্বাস করা শক্ত ছিল। কালের নিয়মে জীবন এগিয়ে চলে, ওদের আর কোন খবরও পাওয়া যায় না। ধীরে ধীরে স্মৃতির অতলে হারিয়ে যায় প্রাণচঞ্চল দুই কিশোর-কিশোরী। আমার বাবার ট্রান্সফারের জন্য আমিও ওখান থেকে চলে আসি উচ্চমাধ্যমিকের পর পরই। তাই ওদের কোনও পরবর্তীকালের খবরও জানা হয় না আমার। জীবনও এগিয়ে চলে, একইভাবে। চাকরি সুত্রে এখন দেশের অনেক গ্রাম্য অঞ্চলে যেতে হয় আমায়। সপ্তাহ খানেক আগে সেখানেই হঠাৎ দেখা হয় তরুণের সাথে। প্রায় বছর কুড়ি বাইশ পর দেখলেও চিনতে পারি দুজন দুজনকে। যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না ঘটনাটা। ও বলল, “চল আমার ঘরে চল।” তখনও কিছুটা ভয়েই জানতে চাইনি শম্পার কথা। ছিমছাম বাড়ি, অভাবের লক্ষণ না থাকলেও প্রাচুর্যেরও আভাস ছিল না ছিটেফোঁটা। ভিতরে ঢুকতেই একটা ছোট্ট ছেলে দৌড়ে এল বাবা বলে। ও বলল, “বস এখানে, একটু ভিতর থেকে আসছি।” খানিক পরেই শম্পাকে নিয়ে ঘরে ঢুকল তরুণ। মুহূর্তে ফিরে গেলাম সেই বাইশ বছর আগের সময়টাতে। বললাম, “খুব আনন্দ হচ্ছে রে তোদেরকে একসাথে দেখে, ভাবিনি আর কোনোদিন এটা ঘটবে জীবনে।” তরুণ বলল, “জীবনের কটা ঘটনাই বা নিয়ম মেনে ঘটে বল! এখানেই আজ খেয়ে যাবি কিন্তু।”
বেশ ভাল করে খাওয়া দাওয়া করে উঠে তরুণকে জিজ্ঞাসা করেই ফেলি, “তোরা কিভাবে পালালি যে কেউ জানল না, পুলিশ খুঁজে পেল না আর এসব গোছালিই বা কি করে?” তরুণ জবাব দেয়, এটা শম্পাই ভাল বলতে পারবে। শম্পা সব কাজ সেরে এসে বলে, “এই প্রথম কারোর কাছে বলব সব ঘটনা, তুই কারোর কাছে কিছুই বলিস না কিন্তু। তোর সাথে আমাদের এত গভীর বন্ধুত্ব না থাকলেও আজ এই বয়সে এসে তোকে বলে একটু হালকা হতে চাই। আশা করি তুই আমাদের কথার মর্যাদা দিবি।” আমি বললাম, নিশ্চিন্ত থাক। ও বলতে শুরু করল, “তরুণ যেদিন মার খেয়ে ফিরে গেল, তারপর আমি ঘর বন্ধ করে কাঁদদে থাকি। বাবা ছাড়া কেউই আমার ঘরে ডাকতে আসে না, জানতিস বোধহয় আমার মা মারা যায় আমার ৪ বছর বয়সেই। বাবা রাতের দিকে আবার ঘরে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে জানতে চাইল সত্যি আমি তরুণকে ভালবাসি কিনা। তরুণই বা কতটা আমার জন্য তৎপর। আমি বলি যে ওকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারবনা। বাবা ২ দিন সময় দিতে বলে। এর মাঝে নিজেই একদিন তরুণের সাথে দেখা করে বুঝতে চায় সে কতটা সামলাতে পারবে আমাকে। ২ দিন পর আবার রাতে আমার ঘরে এসে সব বুঝিয়ে টাকাপয়সা দিয়ে আমার নামে কেনা এই জায়গার কথা বলে। এখানকার এই জমির কথা কেউ জানত না। শুধু বলে এখান থেকে গেলে আর কোনোদিনই এবাড়িতে ফিরতে পারব না আমি। সেইমত আমরা পালাই ওখান থেকে।” আমি জিজ্ঞাসা করি ওই যে চিঠিটা পাওয়া গিয়েছিল শুনেছিলাম? “ওটাও বাবার পরিকল্পনা মত আমি লিখে রাখি। আমার কাকা খুব রাগী ছিল, বাবা জানত কাকার অমতে কোনোদিনও আমি ফিরতে পারব না। এখানকার কেয়ারটেকারকে লেখা বাবার চিঠি নিয়ে পাড়ি দিই আমরা দুজনে ভিনদেশের পথে। তোরা যখন মাধ্যমিক দিতে ব্যস্ত, আমরা আস্তানা গড়ি এই নতুন জায়গায়। পরের বছর বাবার ব্যাবস্থাতেই পরীক্ষা দিই দুজনে। আসতে আসতে পরের সোপানও পার করি দুজনে হাতে হাত ধরে, গ্র্যাজুয়েট হই। তারপর নিজেদের সংসার গড়ে তুলি। শুধু কারোর সাথে দেখা বা যোগাযোগও রাখতে পারিনা। এমনকি বাবার সাথেও না। ওইদিন আমার কাকার সাথে না দেখা হয়ে বাবার সাথে দেখা হলে হয়ত আমাদের জীবনটা আর পাঁচজনের মতই সাদামাটা হত।”
শুনতে শুনতে কাকুর জন্য শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে আমার। এরকম বাবারা ছিলেন আর আছেন বলেই আজও মেয়েরা সমাজের চোখ রাঙানিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে নিজেদের ভালবাসাকে প্রাণ দিতে পেরেছে।
আজ শম্পার কাকা মারা গেছেন, বাবাও অনেকটাই বার্ধক্য জড়িত। এবার সময় হয়েছে ওদের প্রত্যাবর্তনের। সেই ঠিকানা ওদের পথ চেয়ে আছে দুদশকেরও বেশি সময় ধরে। তিনজনে আজ ফিরছে নিজের আস্তানায়।
রচনার তারিখ: ২৩ শে অগাস্ট ২০২১





0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন