“কাল থেকে আর তোমাকে আসতে হবে না।“ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে অতসীকে বলে ঘরে ঢুকল মিঠু
আয়নার সামনে টাই টা ঠিক করতে করতে অরিজিৎ জিজ্ঞাসা করল “সাত সকালে হলো টা কি?
তুমি কি বেরবে না? একে সকাল সকাল বিদায় করছ যে।”
“এত মিথ্যে কথা বলে, আর এখন তো আবার চুরিও করছে। হাতে নাতে ধরে ফেলেছি বলে সে
কি তড়পানি ওর। তোমার আর কি? তুমি তো সেই সেম টাইমেই বেরিয়ে যাবে, আমার জন্য কি আর
ছুটি নেবে? তোমার টাইম মত সব পেলেই তো হল।”
অরিজিৎ বুঝল আকাশ খুবই মেঘলা আজ, ঘূর্ণিঝড় আসতে চলেছে। কাজের লোকের পুরো ঝাড়
টা আজ পড়বে ওর ওপরেই। তাড়াতাড়ি টিফিনবক্সটা তুলে নিয়ে মেয়েকে টা টা করে বেরিয়ে
পড়ল। মিঠুকে বলল কিছু লাগলে ফোন করো। মিঠু আড়চোখে কটমট করে তাকাল শুধু।
মেয়েকে নিয়ে থাকতে ভালই বাসে মিঠু। কিন্তু হঠাৎ করে ছুটি নিলেই অফিসে ঝামেলা
হয়, আজ আবার কিছু একটা বলতে হবে। কিছু মিথ্যে বললেই দেখেছে ঠিক কদিন পরে সেই একই
কারণে আবার ছুটি নিতে হয়। সামন্ত দা কে একটা এসএমএস করে রাখল। এবার হাতের কাজ গুলো
গুছিয়ে মেয়েকে নিয়ে বসল একটু। দেখতে দেখতে মেয়ের বয়স ছয় বছর হয়ে গেল। আর কিছুদিন
পর থেকে ওর নিজেরই একটা জগৎ তৈরি হয়ে যাবে। সেই জন্য অনেকবার ভেবেও চাকরিটা ছাড়েনি
ও। অতসীকে রাগের মাথায় বের করে দিলেও এবার সারাদিন মেয়েকে সামলাবে কে? মা কেও কি
ফোন করে আসতে বলবে একবার। থাক, কাউকে না পেলে মা কে জানাবে। এমনিতেই ভাই রাগ করে
বেশি আমার বাড়ি আসতে হলে। তখন ওর বউকেই হাত পুড়িয়ে রান্না করতে হয় আর কি। পটের
বিবির নখের একটু নোংরাও থাকলে চলে না। একটু পরে একবার শ্যামলিদের বাড়িতে গিয়ে
কাজের লোকের খোঁজ করে আসতে হবে।
এরপর মেয়েকে স্নান খাওয়া করিয়ে, নিজে স্নান করে ঠাকুর কে মালা ধূপ দিয়ে রেডি হয়
মিঠু। উলটোদিকের ফ্ল্যাটের রিমলিকে একটু ফ্ল্যাটে বসতে বলে ঘুরে আসবে ভাবে। মেয়েও খেলনা
নিয়ে খেলতে শুরু করে। কিন্তু বেরোনোর সময় দেখে রিমলিদের ফ্ল্যাটে তালা দেওয়া। ঠিক
করে, মেয়েকে নিয়েই যাবে।
ঘরে ঢুকতেই মেয়ে বায়না করতে শুরু করে যে ও কোথাও যাবে না, ঘরেই খেলবে। মিঠু বলে,
“তোকে তাহলে বাইরে থেকে চাবি দিয়ে যাব। থাকতে পারবি তো? আমি এক্ষুনি ফিরে আসব।”
“ঠিক আছে মাম্মাম, আমি তো বড় হয়ে গেছি নাকি? অতসী আন্টিও তো কাল থেকে আসবে না
বললে, তখন আমায় একাই থাকতে হবে তো। একটু প্র্যাকটিস করে রাখি।”
“ওরে আমার পাকা বুড়ি রে। ঠিক আছে, চুপটি করে থেকো। আমি এক্ষুনি চলে আসব।” মনে
মনে ভাবে, মেয়ে আমার বড় হয়ে গেল। এই প্রথম একা রাখছে বলে মন টা একটু খচখচ করলেও ভাবল,
এক্ষুনি তো যাবে আর আসবে। বাইরে বেরিয়ে দরজায় চাবি দিয়ে বেরিয়ে যায় ও।
একটু পরেই ডোরবেলটা বাজল একবার। ছুটতে ছুটতে দরজার কাছে গিয়ে ছোট্ট বাচ্ছাটা হাঁক
পাড়ে, “কে এসেছ? এখন কেউ নেই বাড়িতে, পরে এসো।” কিন্তু ওর অসাবধানতায় কখন যে ঠাকুরের
প্রদীপটা পড়ে গিয়ে আগুন লেগে গেল বুঝতে পারল না সে।
বাইরের সেলসম্যান টা পরের ফ্ল্যাটের বেল মারে। একটু পরেই ওই পাশের বন্ধ দরজা থেকে
ভয়ার্ত চিৎকার ওই বাচ্চাটার।
“বাঁচাও, বাঁচাও !!!”
লোকটা বুঝতে পারেনা কি হয়েছে। নিচে গিয়ে আশেপাশের লোকজনকে জড়ো করে দেখতে পায়
ওই ফ্ল্যাট থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী বেরছে। দু একজন মিলে ফ্ল্যাটের দরজার তালা ভাঙ্গার
চেষ্টা করতে থাকে। একজন বলে ওদের কাজের লোক থাকে তো, সে কি নেই নাকি? কেউ একজন অরিজিৎ
কে ফোন লাগায়, না পাওয়ায় ফোন করে মিঠুকে। শুনে তো মিঠুর হাত পা ঠাণ্ডা হওয়ার জোগাড়।
হুড়মুড়িয়ে বাড়ির দিকে দৌড় দেয় ও। খবর যায় দমকলেও।
অতসী অন্য একটা কাজের খোঁজে গিয়েছিল আজই। সেখানেই কিছুটা সময় কাটিয়ে ফিরছে বাড়ি।
আসলে এখন সবাই পরখ করে নিতে চায় কাজকর্ম পারে কিনা। ফেরার পথে বউদিদের বাড়ির সামনে
দিয়েই ফিরতে হবে ওকে। বউদি ভালো ব্যবহার করলেও মাঝে মাঝে এত রাগ দেখাত না, তখনি মাথাটা
খারাপ হয়ে যেত। কিন্তু ওই ছোট্ট বেবিকে মন থেকে দূরে সরাতে পারছে না ও। এরপর থেকে আর
বাচ্ছার কাজ নেবে না, বড় মায়া পড়ে যায় ওদের ওপর।
ওদের ফ্ল্যাটের কাছে এসেই দেখে হুলুস্থুল অবস্থা। লোকমুখে ওই অবস্থা শুনে দৌড়
লাগায় নিজের বাড়ির দিকে। বউদিকে ফোনে ধরার চেষ্টা করে, পায় না। দাদাকে ফোনটা লাগায়
আর তাড়াতাড়ি আসতে বলে।
সকালে তাড়াহুড়ো করে বেরোনোর সময় বউদিদের ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবিটা দিয়ে আসেনি।
ভেবেছিল বিকেলে কাজের শেষে ওদের দিয়ে আসবে। কে জানে না হলে হয়ত আবার চুরির দায়ে হাজতবাস
করাবে।
চাবি নিয়ে এসে পড়িমড়ি করে উপরে উঠে ফ্ল্যাটের চাবি খোলে। তাড়াতাড়ি বের করে আনে
ওর আদরের বেবিকে। পাড়ার লোকে ঘরে ঢুকে জল ঢেলে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে।
“কেন তুমি চলে গেছো আমায় ছেড়ে?” কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলে ওঠে বেবি।
কিছু বলতে পারে না ও। শুধু দুচোখ দিয়ে জলের ধারা বেরোতে থাকে। কি করে বোঝাবে এই
শিশুকে যে এই পৃথিবীতে অনেক কঠিন বাস্তব অপেক্ষা করে থাকে অতসীদের মত মানুষদের
জন্য।
পিঠে হাত রাখে মিঠু, দৌড়ে এসেই ওদের মিলন দৃশ্যে চোখ আটকায় ওর।
“মাম্মাম” বেবি এবার ছুটে আসে মিঠুর কাছে।
অতসীর হাতটা ধরে ক্ষমা চায় মিঠু, আর বেবির কাছে অতসীর হাত টা এগিয়ে দিয়ে বলে, “এই
নাও তোমার ক্রিসমাসের উপহার। আজ থেকে অতসী মাসি তোমার।”
“ইয়ে”, চিৎকার করে ওঠে বেবি।





0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন