Bengali Story|Choto Golpo Bangla|Bangla Short Story Blog|Bengali Story Reading App
“কিরে যাবি না?”
“আরে দাঁড়া একটু পড়াশোনা টা শেষ করি।“
“আজ বাদে কাল সরস্বতী পুজো, এখন এত
পড়াশোনা করার কি দরকার?“
“আরে তোর মতো অত বুদ্ধিমান নয় যে একটু পড়লেই হয়ে যাবে।“
“হ্যাঁ, সে আর বলতে।
যাক বাদ দে, তুই কখন আসবি বল? আমি তার
কিছুক্ষণ আগে বাইরে বেরোবো তাহলে।“ “শোন
এখন আর আমার বাড়ির এদিক দিয়ে আসিস না। আমি ডাইরেক্টলি
দিদির কোচিং এ চলে যাব। তারপর সন্ধ্যে পর্যন্ত ওখানে আড্ডা
দেওয়া যাবে।“
“আরে সে না হয় হল। কিন্তু আমাদের যে
শ্রুতি নাটক করার প্ল্যান ছিল সেটা কি হবে?”
“তার জন্য তো বাকিদেরও রাজি করাতে হবে।“
“সে তুই তোর সৈন্য-সামন্ত দের রেডি কর।“
“ঠিক আছে দেখি কজনকে ম্যানেজ করা যায়। বেশি
বড় স্ক্রিপ্ট করিস না কিন্তু। এত তাড়াতাড়ি সবাইকে তৈরি করা যাবে না।“
“সে ঠিক আছে আমি দেখে নিচ্ছি।“
এরকমই ছিল তখনকার দিনের সরস্বতী পুজো। নির্ভেজাল আড্ডা, সাথে স্কুল আর কোচিং
এর সরস্বতী পুজো। সাথে কখনো কখনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। জুতো
সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সবই করত ছাত্র-ছাত্রীরা। সরস্বতী পুজোই
ছিল বাঙালির ভ্যালেন্টাইনস ডে। তখনো পর্যন্ত এত আধুনিকতার বিষ বাতাসে সমাজ কলুষিত হয়নি।
বাংলা কোচিনের পঞ্চপান্ডবই
ছিল সমস্ত অনুষ্ঠানের আয়োজনের মূলে। তা সে সরস্বতী পুজোই হোক বা পিকনিক। দুজনের কথোপকথন তো আগেই বললাম। এবার বাকি তিন জনের কথায় আসি। এর মধ্যে যে সবথেকে নাটা, যাকে ওরা নাটা গণেশ বলতো, সে ছিল যেমন পেটুক তেমন
ঘুমকাতুরে। যেখানে-সেখানে ঘুমিয়ে পড়ার জন্য কম মার খায়নি
ও। কিন্তু ওর হাতের কাজ এত সুন্দর ছিল যে চালচিত্র থেকে শোলার সাজসজ্জা, সমস্ত কিছুই ছিল ওই দায়িত্বে। আর
সেখানে কারোর প্রবেশাধিকার ছিল না।
আর বাকি দুজন ছিল জগাই মাধাই, দুই
যমজ বোন। ওদের এরকম নামকরণের কারণ ছিল জটিল। এমন হিংসুটে যমজ
বোন বোধহয় সারা দুনিয়ায় দুটো ছিল না। একজনকে কোন কাজ দিলে
অন্যজনও সেই কাজ করার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠতো। কিন্তু প্রকারান্তরে দুজনেই সেই
কাজটি করতে গিয়ে ছড়াতো আর বন্ধুদের গালি খেত। কিন্তু এরা না থাকলে বাকিদের হাস্যরসের উপাদান জুটত না। তাই ওই দুই
যমজ বন্ধুর উপস্থিতি না হলে ওদের আড্ডাটা পূর্ণ হতো না।
তখনো পাড়া কালচার মুছে
যায়নি শহরতলির বুক থেকে। বাড়িতে বিরাজ করত রোয়াক আর উঠোন। তো বিকেলের দিকে
ওরা ছাড়াও অন্য ব্যাচের ছেলেমেয়েরাও জড়ো হয়েছে দিদির বাড়ির উঠোনে। তাদের
দিয়ে মোটামুটি ঠাকুরের আলপনা দেওয়া শেষ। কিন্তু নাটা গণেশ এখনো এসে পৌঁছল না যে।
তখনকার সময় তো আর হাতে হাতে মোবাইল ছিল না যে চট করে জেনে নেওয়া যাবে করছেটা কি।
এদিকে কপোত-কপোতী মানে আমাদের সূর্য আর শ্রাবন্তী ব্যস্ত শ্রুতি নাটকের মহড়ায়। সকলে এদেরকে প্রেমিক প্রেমিকা বলে ক্ষ্যাপালেও এরা
ছিল বেস্ট ফ্রেন্ড। তাই চিরকালীন লেখক সূর্য নিজের আর শ্রাবন্তীর অংশই রাখত বেশি
স্ক্রিপ্টে। পারিপার্শ্বিক কুশীলব থাকতো সামান্যই। তাই কেউই বিশেষ অংশ নিতে চাইত না ওদের শ্রুতি নাটকে। শেষে শ্রাবন্তীকে মধুর চাহনিতে কাৎ করতে হতো কিছু
সৈন্য-সামন্ত কে। এভাবেই মঞ্চস্থ হত শ্রুতি নাটক।
একদল ব্যস্ত পুজোর জোগাড়ে। আরেকদল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। অনুষ্ঠানসূচি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়, এমন সময় প্রাচী মানে যমজ বোনের
একজন এসে বলল, “আমি অনুষ্ঠানে এন্ড করব একটা স্বরচিত পাঠ দিয়ে।"
অমনি সূচি মানে আরেক বোন এসে
বলে, “তাহলে আমিও অনুষ্ঠান শুরু করব রবীন্দ্র সংগীত দিয়ে।“ পাশ থেকে একজন ফুট কাটলো, “তাহলে
অনুষ্ঠানটা শুরু হবার আগেই শেষ হয়ে যাবে।“ শ্যামলা রঙের
সূচি একটা রাগত দৃষ্টি দিল ছেলেটার দিকে।
যাই হোক সকলের মন রেখে চূড়ান্ত হলো অনুষ্ঠানসূচি। প্রায় আটটার পর যে যার
বাড়ি ফিরল সকলে। সূর্য পৌঁছে দিয়ে এলো শ্রাবন্তী কে। ফেরার সময় শ্রাবন্তী সূর্য
কে বলল, "আজ প্রাচীকে লক্ষ্য করেছিস? কেমন যেন তোর প্রতি ফিদা লাগছিল।“
“ভাট বকিস না তো। কিছু না খেয়ে পেট গরম
হয়েছে তোর। কাল স্কুলে বেশি ছেলে না দেখে তাড়াতাড়ি চলে
আসিস এখানে। আর সবাইকে ড্রেসের কথাটা বলে দিলি তো?”
“চাপ নিও না বস। যতদিন শ্রাবন্তী আছে এই
প্রোগ্রাম ফেল হবে না।”
শ্রাবন্তী কে ছেড়ে দিয়ে আসার সময় সূর্য ভাবছিল একই কথা। আজকে যেন একটু অন্যরকমই
লাগছিল প্রাচীর হাবভাব। বেশি না মাথা ঘামিয়ে বাড়ির পথে হাঁটা দিল সূর্য। কাল আবার সকালে একবার স্কুলে ঢুঁ মারতে
হবে। যদিও আজকাল ওইদিনই সরস্বতী পুজোর খাওয়া-দাওয়া টা হয় না বলে রক্ষে।
আজ সরস্বতী পূজা। সকাল থেকেই কচিকাঁচাদের ভিড়। প্রায় সকলেরই পরনে বাসন্তীর আবরণ, বসন্ত আগত দুয়ারে। স্কুলের পর্ব মিটিয়ে সূর্যরা মিলিত হয় নাটা গণেশের
বাড়ি। ওখানে ওদের বাড়ির পুজোয় প্রতিবারের মতোই এবারেও
নিমন্ত্রণ থাকে পঞ্চপাণ্ডবদের। চোখ পড়ে প্রাচীর উপর, সবার
মধ্যেও একটু অন্যভাবে সাজিয়েছে নিজেকে। একরাশ বাসন্তীর
ভিড়ে আলাদা করে চোখে পড়ছে ও। হঠাৎ শ্রাবন্তীর কনুইয়ের খোঁচায় টনক নড়ে সূর্যর।
“ব্যাপারটা কি? মনটা কেমন গার্ডেন
গার্ডেন লাগছে তোর? হোঁচট খেয়েছিস নাকি?”
পাল্টা একটা চিমটি কেটে সূর্য নিচুস্বরে বলে, “নির্জলা উপবাস করেছিস নাকি ভরপেট?
একটু ওয়েট কর, খাবার এলো বলে।“ ওদের এই খুনসুটি চিরন্তন। শ্রাবন্তী ডাকসাইটে সুন্দরী হলেও কখনো ওদের
মধ্যে সেই প্রেমের ছোঁয়া লাগেনি। নিখাদ বন্ধুত্বেই বছর চারেক কাটছে ওদের।
কাকিমার আতিথিয়তায় খাওয়া দাওয়ার পর্ব মিটিয়ে বাড়ির পথে রওনা হয় সকলে।
বিকাল পাঁচটায় সবাই জড়ো হয় কোচিং সেন্টারে।
হাসির রোল উঠলো উদ্বোধনী রবীন্দ্র সংগীত শুনে। পরবর্তী অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে
সেটাকে ম্যানেজ করে নেয় শ্রাবন্তীরা। প্রত্যাশামতোই জোরদার হয় শ্রুতি নাটক। সবশেষে
শুরু হয় প্রাচীর ভাষ্যপাঠ। সবাইকে অবাক করে দিয়ে ভাষ্যপাঠ এর শেষে সূর্যকে প্রেম
নিবেদন করে প্রাচী। সবার মতই অপ্রস্তুত দিদি ও উপস্থিত কিছু গার্জেন। সাময়িক নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে মেসোমশাই মানে
দিদির বাবা বলে ওঠেন, “বেশ করেছে প্রেম করেছে করবেই তো। এখন না করে কি আমাদের মত বুড়ো বয়সে করবে? সকলের
অবাক হওয়ার কিছু নেই। লেট্স এনজয়।“ হাসির ফোয়ারা ছুটিয়ে
ব্যাপারটাকে একটু খানি লঘু করে দেন মেসোমশাই।
আড়চোখে শ্রাবন্তীর দিকে তাকিয়ে দেখে মিচকি মিচকি হাসছে ওর দিকে তাকিয়ে। সেটা দেখে আরো রেগে যায় সূর্য।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের এই সুন্দর উপস্থাপনার বাহবা দেয় সবাই
ওদের। কিন্তু এই ব্যাপারটার একটা
হেস্তনেস্ত করতে হবে আজকেই। খাবার পরিবেশনের ফাঁকে আড়চোখে দেখে ছাদের সিঁড়ি
দিয়ে উঠে যাচ্ছে ওই শ্যামলা রঙের হরিণ নয়নী। মুহুর্তের
মধ্যে পায়ে পায়ে পৌঁছে যায় সিঁড়ির গোড়ায়। পা টিপে টিপে উঠতে থাকে ছাদের
দিকে।
ছাদের কিনারায় দেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই ছায়ামূর্তি। ধীরে ধীরে পাশে গিয়ে
বলে, “সত্যিই এতটা
চাস আমাকে কবে থেকে? আমিও কিছুদিন ধরে তোর প্রতি কেমন যেন একটা হয়ে গেছি।“
মুখটা ওর দিকে ঘুরিয়ে সোজাসুজি জিজ্ঞাসা করে, “বলতো আমি কে?”
“প্রাচী, আবার কে?”
“এখনো চিনতেই পারিস না আমাকে, তুই নাকি ভালবাসবি আমায়?”
পাঁচিলের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে আরেক ছায়া মূর্তি। হালকা আলোয় সূর্য
বুঝতে পারে না পুরো একই মেকআপ আর পোশাকের কে যে প্রাচী আর কে যে সূচি। মাথা
টা বনবন করতে থাকে ওর। আবার কি কেস খেল ও?
শেষমেষ বলে ওঠে প্রথমজন। লেখাটা সূচির হলেও সবার সামনে নিজের মনের ভাষা ব্যক্ত করার সাহস ছিল না
ওর। তাই সদা হিংসুটে বলে পরিচিত বোন দুটি পরিচয় বদলে দিয়েছিল শুরু ও শেষের অনুষ্ঠানে।
“এরপর থাকলে আবার কিন্তু হিংসুটে হয়ে যেতে পারি,
তোদের হবে চাপ,
শুরু করো এবার তোমরা তোমাদের প্রেমালাপ।“
চোখের কোণটা চিকচিক করার আগেই নিজের মনকে দমিয়ে ঝুপ করে সিঁড়ির দিকে দৌড়ে চলে
গেল প্রাচী। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রইল একটুকরো ভালবাসা। ধীরে ধীরে সূর্যের হাত উঠে এল সূচির
হাতের ওপর। মাঝখান দিয়ে ওই যে উঠোনে দেখা যাচ্ছে দেবী মূর্তিকে।
©Ayan
রচনার তারিখ: ৫ই
ফেব্রুয়ারী ২০২২





0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন