#অলির মিঠে বুলি#
আমি অলি। আমার বয়স দশ। তাই বলে আমাকে ছোট ভাববে না। এই করোনার দেড় বছরে আমি আমার বয়সের তুলনায় অনেক বড় হয়ে গেছি। তবে আমার মনে হয় এই সময়ে আমরাই মানে বাচ্চারাই সব থেকে কষ্টে আছি। বড়রা তবু ভ্যাকসিন পেয়েছে, এদিক ওদিক কাজে অকাজে বেরোতে পারছে। আমরা তো পুরোপুরি গৃহবন্দী। প্রথম প্রথম বেশ ভাল লাগত জানো। পড়াশোনা নেই, বাবা মা ও সারাদিন আমার কাছে। আমাদের মত যাদের বাবা মা দুজনেই চাকরি করে, তাদের তো হাতে চাঁদ পাওয়ার মত ব্যাপার। সারাদিন বাবার সাথে কত মজার মজার খেলা, মায়ের ও বাড়ি থেকেই কাজ, কি যেন বলে ওয়ার্ক ফ্রম হোম। তারই মাঝে আমাদের জন্য অনেক ভাল ভাল খাবার দাবারের আয়োজন করত। দুপুরে একসাথে বসে তিনজনে লাঞ্চ করা, আগে যা রবিবার ছাড়া হতোই না, বেশ ভালোই কাটছিল দিন গুলো জানো। কিন্ত মাঝে মাঝে টিভিতে নিউজ দেখে মা বাবা যখন গম্ভীর মুখে বসে থাকত, আমি পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলে আবার হাসিমুখ হয়ে যেত দুজনের। কিন্তু আমি লুকিয়ে শুনেছি, এরকম বেশিদিন চললে বাবাকে নাকি অফিস থেকে বের করে দেবে। আমি একদিন শুয়ে শুয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করি, "আমরা কি তাহলে গরীব হয়ে যাব শেফালী পিসির মত।" ওহ! শেফালী পিসি কে চেনো না, আমার মাকে যে সকালে হেল্প করে। আমার ঠাম্মি কাজের লোক বলত, মা আমাকে শিখিয়েছে ডোমেস্টিক হেল্প বলতে। আসলে ও সকাল থেকে মাকে হেল্প করতো বলেই না মা বাবার অফিস যাওয়ার আগে খাবার বানিয়ে, আমার টিফিন গুছিয়ে সব রেডি করতে পারত। মা আমাকে আদর করে বলত, "দূর বোকা, তোর বাবা না গেলেও আমি চাকরি করি তো, তোকে ঠিক যত্নে রাখতে পারব।" প্রথম প্রথম আমার প্রিয় গান, নাচ, আবৃত্তি করতাম আর বাবা রেকর্ড করে ফেসবুক, ইউটিউবে দিত। সবাই কত প্রশংসা করতো আমার। খুব খুশি হয়ে যেতাম আমি। দাদান, দিদুনরা ফোন করলেও কত গল্প করতাম।
তখন তো আর শেফালী
মাসি আসত না। মায়েরও কিছুদিন পর থেকে কাজের চাপ বাড়তে লাগলো, আমার জন্য সময়
গেল কমে। আমারও আসতে আসতে অনলাইন ক্লাস শুরু হল। সকাল থেকে ক্লাস, তারপর স্কুলের
পড়া, খাওয়া দাওয়া করা, একঘেয়ে হয়ে যেতে
লাগলো সবকিছু। বন্ধুদের দেখতে পেলেও কথা বলা যাবে না, ম্যাম বলবেন, ডোন্ট শাউট। স্কুলের মত টিফিন ভাগ করা যাবে না, বাইরে খেলাধুলো করা যাবে না, আর এই সব কিছুতে
না শুনতে শুনতেই আসতে আসতে মন খারাপ হওয়া শুরু। বাবার অফিস শুরু হলে বাবা প্রায়
রোজ বেরতে লাগলো। মা সব কিছু করে আমার সাথে টাইম দিতে পারত না আর। আমাকে নিজে নিজে
খেলতে বলত। আচ্ছা বল তো, মা বাবা কি ছোটবেলায় একা একা খেলত? বাড়ির মধ্যে তাও
আবার বন্ধুদের ছাড়া খেলা যায় নাকি? তাও আবার কিছুদিন
নয় প্রায় মাস ছয়েকের বেশি। ধীরে ধীরে নিজের জন্য টাইম থাকলেও কিছু করার ইচ্ছাটাই
কমে গেল। আর কিছু করতেই ভাল লাগতো না কিছুদিন পর থেকেই। আমার প্রিয় আঁকা, গল্পের বই পড়া
সবই বন্ধ করে দিলাম। টিভির প্রতি আকর্ষণ বাড়ল কিছুদিন, কিন্তু সেটাও
বেশিদিন ভাল লাগলো না। মাঝে মধ্যেই জেদাজেদি করে বাবা মায়ের কাছ থেকে বকুনি খেতে
লাগলাম। কখনো কখনো জুটল মারও। আমিও আগের থেকে অনেক বেশি অভিমানী হয়ে গেলাম। বাবা
মার কবে যে অফিস খুলবে বা আমারই যে কবে স্কুল খুলবে সেই চিন্তা করতে লাগলাম। কখনো
আবার বলেও ফেললাম মাকে। আমার এটা বলে খুব কষ্ট হত জানো, কিন্তু তাও বলতাম যখন মা আমাকে অফিসের কাজের জন্য
টাইম দিতে পারত না। খুব রাগ করতাম মা বাবার ওপর। মুখে মুখে কথা বলতে শুরু করলাম, পড়াশোনায় একদম মন
বসত না আর। আমি বুঝতে পারছিলাম, বাবা মা আমাকে খুব খারাপ ভাবে এখন। সামনে না করলেও
অনেক সময় দাদু দিদানের কাছে মন খারাপ করে মা। আমাকে নিয়ে বাবা মায়ের মধ্যে ঝগড়াও
হয় মাঝে মাঝে। কখনো কখনো মাকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলি আজকাল। মা ও বোঝে আমার
মনের কথা, তাই সুযোগ পেলেই
বাবার সাথে ঝগড়া করেও এদিক ওদিক টুকটাক নিয়ে বেরোয় মাঝে মাঝে। তবে, আবার এই তৃতীয়
ঢেউয়ের আশঙ্কায় আমাকে আগলানোর জন্যই ওরা চারপাশ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে আমায়। এই পরিস্থিতি
আমাকে যেন বড় করে দিয়েছে অনেকটা, মানসিকভাবে। আসলে করোনা আমাদের শুধু যে শারীরিক ক্ষতি
করেছে তা তো নয়, বরং
মনের ক্ষতিই করেছে বেশি। ঠাম্মি বলে, যত বাঁধা আসবে তত তুমি কঠিন হবে, তত তুমি এগিয়ে
যাবে। তাই আমার মত ছোট্ট বন্ধুরা, আজ থেকে আর দুঃখ করব না আমরা। এই পরিস্থিতির মধ্যেই
এগিয়ে যেতে হবে আমাদের, খুশি থাকতে হবে, আনন্দ করতে হবে। ভেবে দেখ তো, আমাদের মত
অনেকেরই বাবা মা হয়ত করোনায় মারা গেছে, কারোর আপনজন হয়ত চলে গেছে পৃথিবী ছেড়ে, কেউ হয়ত আর
স্কুলে পড়তে পারছে না তাদের বাবার চাকরি চলে গেছে বলে। তাদের সবার থেকে তো অনেকগুণ
ভালো আছি আমরা। এই কিছুদিন তাই না পাওয়া গুলোকে ডায়রিতে লিখে রাখি, যাতে পরে যখন
এগুলো আবার সহজে পেয়ে যাব তখন তাদের কদর করবো আরও বেশি।
তাই আজ থেকে মন
খারাপ করলেই আমি আবার বাবা মা কে জড়িয়ে ধরবো, আদর করবো। কারণ যতই তাদের সঙ্গে রাগ করি, ঝগড়া করি, তবুও আমি এদের ছাড়া চলতে নাহি পারি।
©Ayan





সত্যিই এটা একটা বিশাল সমস্যা। শরীর ঠিক রাখতে গিয়ে আমরা বাচ্চাদের মনোজগতের দিকে খেয়ালই করছি না। কবে যে আবার সব ঠিক হবে?
উত্তরমুছুনধন্যবাদ
মুছুনখুব ই সুন্দর হয়েছে লেখাটা....খুব প্রাসঙ্গিক আর মনে হয় এখন প্রত্যেকটা বাচ্চার ই একই অবস্থা...
উত্তরমুছুনখুব ই সুন্দর হয়েছে লেখাটা....খুব প্রাসঙ্গিক আর মনে হয় এখন প্রত্যেকটা বাচ্চার ই একই অবস্থা...
উত্তরমুছুনKi korechis boss ...asadharan likhechis. Nostalgic hoe gelam. Fatafati guru.
উত্তরমুছুনধন্যবাদ বন্ধু
মুছুন