শরৎকাল আগত। চারদিকে সাজো সাজো
রব না থাকলেও প্রকৃতি যেন তার নিজের খেয়ালে সেজে উঠছে ধীরে ধীরে। এই দুর্বিষহ রোগ যন্ত্রণার
প্রাদুর্ভাবে সরকারি নির্দেশে এবছরেও হয়ত পুজো হবে বিশেষ সতর্কতায়। তবুও এরই মধ্যে
মানুষ আনন্দ করবে, ভুলে থাকার চেষ্টা করবে সব দুঃখ কষ্ট।
রথিন বাবু বৈঠকখানায় বসে গল্পের
বই পড়ছেন। আগেকার দিনের দোতলা বাড়ি, ফ্ল্যাট বাড়ির ড্রয়িং রুমের থেকে অনেকটাই আলাদা।
রিটায়ার্ড হবার পর থেকে সকাল বেলা চায়ের পর সময় কাটতো তিন-চার টি কাগজে মুখ গুঁজে,
এখন ছেলের নির্দেশে ও গিন্নির ভয়ে বাড়িতে নিউজপেপার নেওয়া বন্ধ। বিদেশ থেকে ছেলের
পাঠানো ট্যাবে কিছুটা নিউজপেপার পড়তে স্বছন্দ হলেও এতে ঠিক মন ভরে না ওনার। তাই
পুরনো গল্পের বই গুলোই ধুলো ঝেড়ে বের করে আজকাল পড়ছেন।
কিন্তু সারাদিন আর এই বাড়ির মধ্যেকার
জীবন ভালো লাগে না ওঁর। ওই সকাল বেলায় একবার দুধ আনতে বের হন। বাকি বাজার, মাছ,
মুদিখানার বেশিরভাগ টাই কাজের মেয়েটাকে দিয়ে অনন্যা মানে রথিন বাবুর স্ত্রী করিয়ে নেন।
আলে কালে কিছু আনতে বের হন, ওদিকে ছেলের কড়া নিষেধ যে অযথা উনি যেন বাড়ির বাইরে না
যান। পাসবুক আপডেটের অজুহাতে ব্যাঙ্ক যাওয়াটাও এখন বন্ধ। এদিকে রথিনবাবু চিরকালই ভ্রমণ
পিপাসু। চাকরী জীবনেও একদিনের সুযোগ পেলেই
গিন্নিকে বা বন্ধুবান্ধবদের পরিবার নিয়ে একসাথে ঘুরতে বেরিয়ে যেতেন। আর এখন তো সব
বন্ধুগুলোও ভয়েতে বেরতে চাইছে না, নিদেনপক্ষে কারোর বাড়ি আড্ডা মারার চল টাও আর নেই।
যারা একটু সাহস করে যাওয়ার চেষ্টা করছে বা ভাবনার মধ্যে আনছে, তাদের ছেলে মেয়েরা তাদেরকে
আটকে দিচ্ছে।
কিন্তু ছেলেমেয়েদের দোষ দিয়ে
লাভ কি? শেষ মে মাসে যা খারাপ পরিস্থিতি হয়েছিল, কে আর বাবা মা কে অকালে হারাতে চায়
! তাই দূর থেকে আঁকড়ে ধরে রাখে তাদেরকে। এদিকে বাবা মায়েরাও মাঝে মাঝে যে এই অতিরিক্ত
সাবধান বাণীর চোটে রুষ্ট হয়ে পড়েন না তা নয়, কিন্তু পরক্ষনেই আবার দূরে থাকা ছেলেমেয়ে
নাতি নাতনিদের কাছে পাবার তাগিদে নিজেদের গুটিয়ে নেন।
রথিনবাবুও সম্প্রতি হারিয়েছেন ওনার
এক বাল্যবন্ধুকে। ওনার ছেলে অর্কর বন্ধু সুজয় পুনে থেকে এসেছিল দেড় বছর পর বাবা মায়ের
করোনার খবর পেয়ে, তো বাবা মাকে সুস্থ করে নিজেই কবলে পরে এই রোগের। পুনেতে ফেরা আর
হয় না তার। এইসব খারাপ খবরে আজ জীবন বড়ই ভারাক্রান্ত। শুধু সকালে ওই দুধ আনতে এসে
রতনের দোকানে দুএকজন পরিচিতর সাথে দূর থেকে কুশল বিনিময় করা, এটুকুই বেঁচে থাকার অক্সিজেন।
মাস্কের ঘেরাটোপে মুখ দেখার উপায় নেই যে আর।
মনে মনে ভাবেন, যারা এই বিগত দু
বছরে জন্ম নিচ্ছে, তারা বোধহয় বড় হয়ে আগের স্বাভাবিক জীবনকে ছাপার অক্ষরে বা ক্যামেরার
ছবিতেই দেখবে। তাই গিন্নি মজেছে বেশি বেশি করে পুজো অর্চনায়, আর রথিনবাবু ডুবে গেছেন
বই পড়ার জগতে।
এভাবেই জীবন কাটছিল নিজের গতিতে।
হঠাৎই একদিন ঘুমোতে যাবার সময় অনন্যাকে বলে নিজের প্ল্যানটা।
“পাগল হয়েছ? এসব কথা ভাবাও পাপ,
ছেলেটার কথা একটুও ভাববে না?”
“আরে ছেলের জন্য সব রেডি আছে,
ওর কোন চিন্তা নেই। তোমার মত টা পেলেই এক্সিকিউট করব, এভাবে আর বেঁচে থাকার কোন মানে
হয় না।”
“তোমাকে ছাড়া তো আমার চলবে না।
এই চল্লিশ বছর কোনকিছুতে না বলিনি, এই শেষ বয়সে এসে যা করার একসাথেই করব।”
“ঠিক আছে, কাল মালতির যা পাওনাগণ্ডা
আছে দিয়ে দিও।”
মনে মনে ভাবল অনন্যা, মানুষটা চাপা
স্বভাবের হলেও এভাবে হুট করে কিছু ডিসাইড করবে ভাবেনি ও। তাহলে কি মনে মনে অনেকদিনই
কষ্ট পাচ্ছিল রথিন? আসলে কম কথার লোকদের ডিপ্রেশন কেউ সহজে বুঝতে পারে না। আর
মালতিও কিছুদিন ধরে ছুটি চাইছিল, ওকে সেটাই বলে দেবে বরং।
এরপর দিন তিনেক কেটে গেছে।
রতনের দোকানে কদিন দেখা পায়নি কেউ রথিনবাবুর। আজ চতুর্থ দিন, রবিবার। শঙ্করদা আজ
এসে রতনকে বলল,
“কি ব্যাপার বলত, রথিন তো কোনোদিন
এরকম করেনি এর মধ্যে? কিছু ভালো মন্দ হল না তো ওদের? ছেলেও তো এখানে থাকে না। চল
একবার যাওয়া যাক ওর বাড়ি।”
গলির শেষ প্রান্তে রথিনবাবুর বাড়ি।
ওরা এসে বেল বাজিয়েও কোন সাড়া পেল না। দরজা জানলা সব বন্ধ, কোলাপ্সিবল গেটের তালাও
ভিতর থেকে দেওয়া। কিন্তু কোন সাড়া শব্দ নেই। ওদের ডাকাডাকিতে আশপাশের কয়েকটা বাড়ির
লোক উঁকি মারলেও কেউই ওদের এর মধ্যে বাইরে বেরতে বা ঢুকতে দেখেনি। লোকজনকে তো
মেলামেশা করতেই ভুলিয়ে দিল এই মারন রোগ। ভিতরেই কোন খারাপ কিছু হল না তো?
রতন বলল, “শঙ্কর দা, চলো পুলিশে
খবর দি। রথিন জ্যেঠুর ছেলের কোন নাম্বার জানো নাকি?”
“তাই কর। দেখি কারোর থেকে নাম্বারটা
জোগাড় করতে পারি নাকি।”
একটু পরেই পুলিশ এসে আশেপাশে সব
লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে কাজের লোক কেউ আসে কিনা জানতে চাইল। একজনের মুখ থেকে মালতির খবর
পেয়ে তাকেও আনা হল এখানে।
মালতি বলল, “মাসীমা কে কদিন ধরেই
ছুটির কথা বলেছিলাম। সেদিন হঠাৎ নিজে থেকেই চারদিনের ছুটি দিল আর পাওনাগণ্ডা দিয়ে
দিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কাজে রাখবে না নাকি গো? বলল, না তুই ছুটিতে যাচ্ছিস, তাই
দিয়ে দিলাম, যদি কিছু খরচ লাগে করতে পারবি। এমনিতে তো দুজনে বেশ ভালো মানুষ ছিল…”
“ছিল মানে? কি বলতে চাইছিস? কি জানিস
তুই আর? খুন করে চলে যাসনি তো?” শাসিয়ে ওঠে ইন্সপেক্টর। নির্দেশ দেয় দরজা ভাঙ্গার।
“এই এই হচ্ছে টা কি? কে কোথায় আছিস?
সব গেল…” তারস্বরে আওয়াজ আসে একটা।
সবাই মুখ ফেরায় গলির মুখের
দিকে। রাস্তার দিক থেকে মাস্ক পড়া একজন লাফাতে লাফাতে আসছে, হাতে দুটো ব্যাগ। পিছনে
আরো একজনও আছে মাস্ক পরা।
কাছে আসতেই দেখা গেল, একি এ যে
রথিনবাবু আর ওনার স্ত্রী!!!
কথা বলার পর জানা গেল, গিন্নির
সাথে প্ল্যান করে কাউকে না জানিয়ে দিন তিনেকের জন্য চলে গিয়েছিলেন ঘুরতে, পাছে ছেলে
বা রিলেটিভরা কেউ বাঁধা দেয়। অনেকের মত চোরকে জব্দ করার জন্য গেটের চাবিটা ওইরকম
ভিতরের দিক দিয়ে দিতেন, যাতে কেউ বুঝতে না পারে যে বাড়িটা ফাঁকা। কিন্তু এভাবে শরতের
মিঠে হাওয়া খেয়ে মুক্তির স্বাদ অনুভব করে ফিরে যা কাণ্ডটাই হতে যাচ্ছিল, একটুর
জন্য বাড়ির সদর দরজা টা রক্ষা পেল পুলিশের ঘা থেকে।
যাক, ম্লান হলেও সামাজিকতা এখনো
পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি দেখে কিছুটা স্বস্তি পেলেন ওনারা।
©Ayan
রচনার তারিখ: ১২ই সেপ্টেম্বর ২০২১






0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন