নিরুদ্দেশ
অফিস থেকে বেরিয়েই মোটামুটি প্ল্যানটা সেরে নিয়েছিল সৈকত। রিমঝিমের অনেক দিনের আবদার মেটানোর এর থেকে ভালো সুযোগ আর পাবে না। সামনে তিন দিনের লং উইকেন্ড, আর দুদিন ছুটি নিয়েই ঘুরে আসা যায় বাঙালির দিপুদার পুরীতে। সদ্য কেনা গাড়ির ড্রাইভিং হুইলে বসার লাইসেন্স পেলেও এতখানি রাস্তা পাড়ি দেওয়ার মত কলজের জোর হয়নি। আর তাই ফোন করেছিল পাড়ার সনাতনদা কে।
মাঝবয়সী সনাতনদা পেশায় গাড়ি চালায় না নেশায়, তা বোঝা দায়। ড্রাইভার হিসেবে এবং ভদ্রলোক হিসেবে যতটা বিশ্বস্ত ততটাই অবিন্নস্ত হিসেবি আদব কায়দায়। তাই অনেক সময় খেটে খুটেও ঠিকঠাক টাকা-পত্তর পায় না। আবার কখনো কাজের জোগান থাকলেও, কোথায় যে নিরুদ্দেশ হয়ে যায় বাড়ির লোকও তার পাত্তা পায় না। এই সনাতনদার আবার কোন নেশা ভানের স্বভাব নেই, তা যেন ড্রাইভারি লাইনে দৈত্য কুলে প্রহ্লাদ এর মত ব্যাপার। তো সনাতনদাকে ফোন করাতে বলল, “ তোমার কোন চাপ নেই ভায়া। লাইফে বোধহয় একশো বার কলকাতা পুরী করেছি। তোমাদের দুজনকে নিয়ে যাওয়া আসা ছাড়াও লোকাল সাইট সিনের গাইডের কাজও করে দিতে পারব। তাহলে কি তোমার বাড়ি গিয়ে গাড়িটা একটু ধুয়ে মুছে রাখবো নাকি?”
তক্ষুনি ওর উৎসাহে কিছুটা জল ছিটিয়ে বিরত করি গাড়ি পরিষ্কার করতে, পাছে পুরো সারপ্রাইজটাই নষ্ট হয়ে যায়। মোটামুটি থাকা খাওয়া ছাড়া ওর সাথে গাড়ি ভাড়া বাবদ টাকার ব্যাপারে রফা হয়ে যায়। ফেরার পথে কিছু স্ন্যাকস আর ড্রাই খাবার দাবার নিয়ে বাড়ি ফিরল সৈকত।
সব কিছু শুনে রিমঝিমের তো আর মনে আনন্দ ধরে না, কিন্তু ম্যাডাম মুখে বললেন, “হঠাৎ করে এরকম প্ল্যান করলে, বাবা মাকে না নিয়ে যাবে। এটা কি ঠিক দেখাবে?” রিমঝিম আসলে আজকালকার গড়পরতা মেয়েদের তুলনায় অনেকটাই পারিবারিক। তাই শ্বশুর শাশুড়িকে চেষ্টা করে সব সময় আগলে রাখতে। ঘোরাঘুরির সময় সঙ্গে নিয়ে যেতে। সৈকতের তাতে আপত্তি না থাকলেও সব সময় এই প্রচেষ্টা মেনেও নিতে পারে না সে। তাতে ওদের নিজেদের জন্য নিজস্ব সময় যে বেশ কিছুটা ব্যয় করতে হয়। রিমঝিমের সাথে এই নিয়ে মাঝে মাঝে খিটিমিটি লাগে সৈকতের। তবে এবার আর বেশি কাঠ খড় পোড়াতে হয় না।
বাবা নিজেই আপত্তি জানায় সোমবার কিছু ব্যাংকের জরুরী কাজের অছিলায়। যদিও বাবার ব্যাংকের জরুরী কাজ বলতে হয় পাস বুক আপডেট, না হয় কেওয়াইসি জমা দেওয়া। তবে এবার মনে হয় বাবা ইচ্ছে করেই সৈকতের মনের কথা বুঝতে পেরে গিয়ে ওদের একটু স্পেস দিতে চাইলো। মনে মনে ভাবল সৈকত, “আফটার অল বাপ বাপই হতে হ্যয়।”
ঘড়িতে ভোর ছটা। একটু আগেই বেল বাজিয়ে খবরের কাগজটা বারান্দায় ছুঁড়ে দিয়ে গেছে রতন। রেডি হয়ে প্রায় বেরোতে যাবে আবার বেলটা বেজে উঠল। সৈকত গেটটা খুলে দেখে, পাশের বাড়ির বিকাশ জেঠু। “কিরে, নতুন গাড়ি কিনে জেঠুকে একবারও ঘুরতে নিয়ে গেলি না। আর এদিকে দুজনে ভোর ভোর উঠে পালিয়ে যাচ্ছিস।”
“আরে পালিয়ে কোথায় যাচ্ছি জেঠু, এই দুদিন ছুটি আছে বলে তোমার বৌমাকে নিয়ে একটু জগন্নাথ দর্শন করতে যাচ্ছি। তোমার জন্য কাকাতুয়ার জিভেগজা আনব তো? ভয় নেই জেঠিমাকে বলবো না তোমার ওই কার্তিকের দোকানে বিকেলে বসে বসে জিভেগজা সাঁটানোর কথাটা।” শুনে জেঠু একটু বিমর্ষ হয়ে ওদের সাবধানে যাবার উপদেশ দিয়ে হাঁটতে বেরোলেন।
কিছুক্ষণ পরেই সনাতন দা একদম ফিটফাট হয়ে হাজির। মুহূর্তে সব গাড়ির দিকে তুলে নিয়ে ওরা যাত্রা শুরু করল পুরীর উদ্দেশ্যে। প্ল্যান মত ঠিক হল প্রথম দিনে হল্ট করা হবে ভুবনেশ্বরে। সময় থাকলে ঘুরে নেওয়া হবে নন্দনকানন আর আশপাশের এলাকা। পরের দিন সকালে যাওয়া হবে পুরীর উদ্দেশ্যে।
এখন এন এইচ সিক্সটিন বেশ সুন্দর। অনায়াসে গতি উঠে যায় একশোর উপরে। তাই সরকার স্পিড লিমিটের গণ্ডিতে বেঁধে দিয়েছে দুর্বার গতিকে। কিছুটা হলেও কমানো গেছে দুর্ঘটনার প্রবণতা। যাত্রাপথ যতই এগিয়েছে ততই মনোরম হয়েছে প্রকৃতি। আর সাথে সাথে সনাতন দার অগাধ জ্ঞান। মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগছিল সৈকত রিমঝিমের। যদিও পরিচিত বয়ঃজ্যেষ্ঠ হওয়ার জন্য ওরা কিছু বলে না। নির্দিষ্ট দিনে পৌঁছে যায় সমুদ্র সৈকতে। এটাই ছিল ওদের পুরীর হোটেলের নাম। এই কটা দিন নিভৃতে কাটিয়ে ফেলে দুইজনায়। দেখতে দেখতে এসে যায় ওদের ফেরার দিন।
কাল সকালে ওদের বাড়ি ফেরার পালা। রিমঝিম বলে, “সত্যিই সেই হানিমুনের পর এবার বোধহয় প্রথম দুজনে ঘুরতে এলাম। তোমার কথা না শুনলে খুব মিস করতাম।” সৈকত বলে, “এই কটা দিন আমাদের জীবনের অক্সিজেন। আবার ফিরে গিয়ে সেই এক দৈনন্দিন জীবন।”
পর দিন ভোরবেলা মোটামুটি দুজনে রেডি। হোটেলের ম্যানেজারকে আগে থেকে বলে রাখায় ওদের জন্য প্যাক ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করে রেখেছে। কিন্তু পাংচুয়াল সনাতনদার কি হল? এখনো এসে পৌঁছয় নি কেন? অন্য দিন তো আধঘন্টা আগে এসে গাড়ি ফাড়ি পরিস্কার করে ওদের হাঁকাহাঁকি করে। ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসা করাতে বলল, “ওই সামনের দিকের ড্রাইভার্স ডরমেটরিতে আছে আপনাদের ড্রাইভার। একবার গিয়ে দেখতে পারেন।”
ওখানে গিয়ে সৈকত পড়লো মহা বিপদে। ডাকাডাকি সত্বেও সনাতনদার ঘুম কিছুতেই ভাঙ্গে না, যেন পুরো অচৈতন্য। একটু স্পর্শেই বুঝল, পুরো নিস্তেজ। জলের ঝাপটায় সংজ্ঞা ফিরলেও কেমন যেন চোখ মুখ অসাড়। ম্যানেজারকে বলাতে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে লোকাল হসপিটালে একবার নিয়ে যেতে বলল। ততক্ষনে হোটেলে থেকে চেক আউট হয়ে গেছে। রিমঝিমকে হোটেলের রিসিপশনে বসিয়ে সৈকত ছুটল হসপিটালে। সরকারি হাসপাতালে আউটডোরের টিকিট করিয়ে ডাক্তারকে একটুখানি রিকোয়েস্ট করল গাড়িতে এসে পেশেন্টকে দেখে দেওয়ার।
অনেক টালবাহানার পর প্রায় আধ ঘন্টা কেটে গেছে। ফোনে এক বন্ধুর সাথে ইতিমধ্যেই পরামর্শ সেরেছে সৈকত। তার কথামতো অ্যাম্বুলেন্সেরও একটা ব্যবস্থা করেছে। আর ফোন করেছে সনাতন দার বাড়ির লোককে। সনাতনদার ছেলেটি সদ্য কলেজে ঢুকেছে। খবরটা শুনেই বেরিয়ে পড়েছে ওখানকার উদ্দেশ্যে। ইতিমধ্যে খানিকটা দয়াপরাবশ হয়ে লোকাল ডাক্তার বাবু ফাইনালি সৈকতের সাথে এলেন গাড়ির কাছে। গাড়ির ড্রাইভারটা বনেটের পাশে বসে মনের সুখে বিড়ি খাচ্ছে। ডাক্তার বাবু নাড়ি দেখে বললেন, “হি ইজ নো মোর।”
শুনে কিছুটা যেন ভেবলে গেল সৈকত। এইমাত্র বাড়ির লোককে খবর দিয়েছে যে লোকটা বেঁচে আছে। কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না সে। এদিকে রিমঝিমও অস্থির হয়ে পড়েছে। অ্যাম্বুলেন্সের লোকটা এসে বলছে দাদা কখন যাবেন। তাকেই বা কি বলবে সৈকত? পেশেন্ট এখন ডেড বডি হয়ে গেছে, অ্যাম্বুলেন্সের বদলে দরকার শববাহী গাড়ি! আর ডাক্তার যা শুনিয়ে গেল এ তো পোস্টমর্টেমের কেস। এবার তো পুরোপুরি ফেঁসে যাবে সৈকত। ইতিমধ্যেই মাছিরা ভনভন করতে শুরু করে দিয়েছে চারিদিকে। কেউ বলছে দাদা আপনাকে তো থানায় যেতে হবে। ড্রাইভারটাও এক্সট্রা হাজার খানেক টাকা চাইছে। ডেড বডি আছে, তাই ওকে নাকি পুরো গাড়িটাই ধুতে হবে। সৈকত পুরোপুরি পাস্ল। ইতিমধ্যে যেন ভগবানের দূতের মতো উদয় হয় এক হাসপাতাল কর্মচারীর। সৈকতকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে বলে ওর সাথে ভিতরে যেতে। লোকটার কথায় কি যেন একটা ছিল। অগ্র পশ্চাদ না ভেবে লোকটার পিছু ধরে সৈকত। ভিতরে কারো সাথে কথা বলে একটা ট্রলি বেড নিয়ে বেরিয়ে আসে সে। তারপর ওকে নিয়ে আবার যায় গাড়ির কাছে। সৈকতের সাহায্য নিয়ে বডিটাকে বের করে নিয়ে আসে ট্রলিতে। তারপর ঠেলতে ঠেলতে ঢুকিয়ে দেয় ভিতরে। পিছন পিছন যেতে যেতে সৈকত বুঝতে পারে পৌছে গেছে মর্গে। কিছু টাকার বিনিময়ে সনাতনদার বডি ঢুকে যায় মর্গের খোপে। একটু আগের জলজ্যান্ত লোকটা কিভাবে যেন পরিণত হয় একটা লাশে। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে থাকে সৈকতের।
এদিকে সনাতনদার ছেলেও করে চলেছে ক্রমাগত ফোন। কি জবাব দেবে তাকে? ইশারায় কার ফোন জেনে সৈকতের কাঁপা কাঁপা হাত থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নেয় ওই লোকটা। আর স্বাভাবিক গলায় ফোনের ওপারে জানিয়ে দেয় সেই অমোঘ সত্যি। এরপর সৈকতকে বলে, “আপাতত ঘন্টা তিন চারেক আপনার এখানে কোন কাজ নেই। আপনি বরং হোটেলে চলে যান। আমি আপনার নাম্বারটা নিয়ে রাখছি। ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়ার টাইমে আপনাকে ডেকে নেব।
এরপর কেটে গেছে প্রায় চব্বিশ ঘন্টা। হোটেলের ম্যানেজারের ঠিক করে দেওয়া ড্রাইভারকে সাথে নিয়ে ওরা ফিরছে বাড়ির পথে। দেবদত্ত নামের ওই মানুষটিকে ফিরে আসার আগে কিছু টাকা দিতে যায় সৈকত। কিছুতেই রাজি হয় না সে, “বলে, আপনি আমার জায়গার অতিথি। এই জিনিস আপনার রাজ্যে ঘটলে আপনিও কি একইভাবে সাহায্য করতেন না আমাকে?”
খটকা লাগল সৈকতের। সত্যিই কি এরকম নিঃস্বার্থ উপকার করতে পারত সে। ধীরে ধীরে সন্ধ্যে নেমে আসে। ওরা ঢুকে পড়ে রাজ্যের সীমানায়।
©Ayan
মাঝবয়সী সনাতনদা পেশায় গাড়ি চালায় না নেশায়, তা বোঝা দায়। ড্রাইভার হিসেবে এবং ভদ্রলোক হিসেবে যতটা বিশ্বস্ত ততটাই অবিন্নস্ত হিসেবি আদব কায়দায়। তাই অনেক সময় খেটে খুটেও ঠিকঠাক টাকা-পত্তর পায় না। আবার কখনো কাজের জোগান থাকলেও, কোথায় যে নিরুদ্দেশ হয়ে যায় বাড়ির লোকও তার পাত্তা পায় না। এই সনাতনদার আবার কোন নেশা ভানের স্বভাব নেই, তা যেন ড্রাইভারি লাইনে দৈত্য কুলে প্রহ্লাদ এর মত ব্যাপার। তো সনাতনদাকে ফোন করাতে বলল, “ তোমার কোন চাপ নেই ভায়া। লাইফে বোধহয় একশো বার কলকাতা পুরী করেছি। তোমাদের দুজনকে নিয়ে যাওয়া আসা ছাড়াও লোকাল সাইট সিনের গাইডের কাজও করে দিতে পারব। তাহলে কি তোমার বাড়ি গিয়ে গাড়িটা একটু ধুয়ে মুছে রাখবো নাকি?”
তক্ষুনি ওর উৎসাহে কিছুটা জল ছিটিয়ে বিরত করি গাড়ি পরিষ্কার করতে, পাছে পুরো সারপ্রাইজটাই নষ্ট হয়ে যায়। মোটামুটি থাকা খাওয়া ছাড়া ওর সাথে গাড়ি ভাড়া বাবদ টাকার ব্যাপারে রফা হয়ে যায়। ফেরার পথে কিছু স্ন্যাকস আর ড্রাই খাবার দাবার নিয়ে বাড়ি ফিরল সৈকত।
সব কিছু শুনে রিমঝিমের তো আর মনে আনন্দ ধরে না, কিন্তু ম্যাডাম মুখে বললেন, “হঠাৎ করে এরকম প্ল্যান করলে, বাবা মাকে না নিয়ে যাবে। এটা কি ঠিক দেখাবে?” রিমঝিম আসলে আজকালকার গড়পরতা মেয়েদের তুলনায় অনেকটাই পারিবারিক। তাই শ্বশুর শাশুড়িকে চেষ্টা করে সব সময় আগলে রাখতে। ঘোরাঘুরির সময় সঙ্গে নিয়ে যেতে। সৈকতের তাতে আপত্তি না থাকলেও সব সময় এই প্রচেষ্টা মেনেও নিতে পারে না সে। তাতে ওদের নিজেদের জন্য নিজস্ব সময় যে বেশ কিছুটা ব্যয় করতে হয়। রিমঝিমের সাথে এই নিয়ে মাঝে মাঝে খিটিমিটি লাগে সৈকতের। তবে এবার আর বেশি কাঠ খড় পোড়াতে হয় না।
বাবা নিজেই আপত্তি জানায় সোমবার কিছু ব্যাংকের জরুরী কাজের অছিলায়। যদিও বাবার ব্যাংকের জরুরী কাজ বলতে হয় পাস বুক আপডেট, না হয় কেওয়াইসি জমা দেওয়া। তবে এবার মনে হয় বাবা ইচ্ছে করেই সৈকতের মনের কথা বুঝতে পেরে গিয়ে ওদের একটু স্পেস দিতে চাইলো। মনে মনে ভাবল সৈকত, “আফটার অল বাপ বাপই হতে হ্যয়।”
ঘড়িতে ভোর ছটা। একটু আগেই বেল বাজিয়ে খবরের কাগজটা বারান্দায় ছুঁড়ে দিয়ে গেছে রতন। রেডি হয়ে প্রায় বেরোতে যাবে আবার বেলটা বেজে উঠল। সৈকত গেটটা খুলে দেখে, পাশের বাড়ির বিকাশ জেঠু। “কিরে, নতুন গাড়ি কিনে জেঠুকে একবারও ঘুরতে নিয়ে গেলি না। আর এদিকে দুজনে ভোর ভোর উঠে পালিয়ে যাচ্ছিস।”
“আরে পালিয়ে কোথায় যাচ্ছি জেঠু, এই দুদিন ছুটি আছে বলে তোমার বৌমাকে নিয়ে একটু জগন্নাথ দর্শন করতে যাচ্ছি। তোমার জন্য কাকাতুয়ার জিভেগজা আনব তো? ভয় নেই জেঠিমাকে বলবো না তোমার ওই কার্তিকের দোকানে বিকেলে বসে বসে জিভেগজা সাঁটানোর কথাটা।” শুনে জেঠু একটু বিমর্ষ হয়ে ওদের সাবধানে যাবার উপদেশ দিয়ে হাঁটতে বেরোলেন।
কিছুক্ষণ পরেই সনাতন দা একদম ফিটফাট হয়ে হাজির। মুহূর্তে সব গাড়ির দিকে তুলে নিয়ে ওরা যাত্রা শুরু করল পুরীর উদ্দেশ্যে। প্ল্যান মত ঠিক হল প্রথম দিনে হল্ট করা হবে ভুবনেশ্বরে। সময় থাকলে ঘুরে নেওয়া হবে নন্দনকানন আর আশপাশের এলাকা। পরের দিন সকালে যাওয়া হবে পুরীর উদ্দেশ্যে।
এখন এন এইচ সিক্সটিন বেশ সুন্দর। অনায়াসে গতি উঠে যায় একশোর উপরে। তাই সরকার স্পিড লিমিটের গণ্ডিতে বেঁধে দিয়েছে দুর্বার গতিকে। কিছুটা হলেও কমানো গেছে দুর্ঘটনার প্রবণতা। যাত্রাপথ যতই এগিয়েছে ততই মনোরম হয়েছে প্রকৃতি। আর সাথে সাথে সনাতন দার অগাধ জ্ঞান। মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগছিল সৈকত রিমঝিমের। যদিও পরিচিত বয়ঃজ্যেষ্ঠ হওয়ার জন্য ওরা কিছু বলে না। নির্দিষ্ট দিনে পৌঁছে যায় সমুদ্র সৈকতে। এটাই ছিল ওদের পুরীর হোটেলের নাম। এই কটা দিন নিভৃতে কাটিয়ে ফেলে দুইজনায়। দেখতে দেখতে এসে যায় ওদের ফেরার দিন।
কাল সকালে ওদের বাড়ি ফেরার পালা। রিমঝিম বলে, “সত্যিই সেই হানিমুনের পর এবার বোধহয় প্রথম দুজনে ঘুরতে এলাম। তোমার কথা না শুনলে খুব মিস করতাম।” সৈকত বলে, “এই কটা দিন আমাদের জীবনের অক্সিজেন। আবার ফিরে গিয়ে সেই এক দৈনন্দিন জীবন।”
পর দিন ভোরবেলা মোটামুটি দুজনে রেডি। হোটেলের ম্যানেজারকে আগে থেকে বলে রাখায় ওদের জন্য প্যাক ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করে রেখেছে। কিন্তু পাংচুয়াল সনাতনদার কি হল? এখনো এসে পৌঁছয় নি কেন? অন্য দিন তো আধঘন্টা আগে এসে গাড়ি ফাড়ি পরিস্কার করে ওদের হাঁকাহাঁকি করে। ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসা করাতে বলল, “ওই সামনের দিকের ড্রাইভার্স ডরমেটরিতে আছে আপনাদের ড্রাইভার। একবার গিয়ে দেখতে পারেন।”
ওখানে গিয়ে সৈকত পড়লো মহা বিপদে। ডাকাডাকি সত্বেও সনাতনদার ঘুম কিছুতেই ভাঙ্গে না, যেন পুরো অচৈতন্য। একটু স্পর্শেই বুঝল, পুরো নিস্তেজ। জলের ঝাপটায় সংজ্ঞা ফিরলেও কেমন যেন চোখ মুখ অসাড়। ম্যানেজারকে বলাতে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে লোকাল হসপিটালে একবার নিয়ে যেতে বলল। ততক্ষনে হোটেলে থেকে চেক আউট হয়ে গেছে। রিমঝিমকে হোটেলের রিসিপশনে বসিয়ে সৈকত ছুটল হসপিটালে। সরকারি হাসপাতালে আউটডোরের টিকিট করিয়ে ডাক্তারকে একটুখানি রিকোয়েস্ট করল গাড়িতে এসে পেশেন্টকে দেখে দেওয়ার।
অনেক টালবাহানার পর প্রায় আধ ঘন্টা কেটে গেছে। ফোনে এক বন্ধুর সাথে ইতিমধ্যেই পরামর্শ সেরেছে সৈকত। তার কথামতো অ্যাম্বুলেন্সেরও একটা ব্যবস্থা করেছে। আর ফোন করেছে সনাতন দার বাড়ির লোককে। সনাতনদার ছেলেটি সদ্য কলেজে ঢুকেছে। খবরটা শুনেই বেরিয়ে পড়েছে ওখানকার উদ্দেশ্যে। ইতিমধ্যে খানিকটা দয়াপরাবশ হয়ে লোকাল ডাক্তার বাবু ফাইনালি সৈকতের সাথে এলেন গাড়ির কাছে। গাড়ির ড্রাইভারটা বনেটের পাশে বসে মনের সুখে বিড়ি খাচ্ছে। ডাক্তার বাবু নাড়ি দেখে বললেন, “হি ইজ নো মোর।”
শুনে কিছুটা যেন ভেবলে গেল সৈকত। এইমাত্র বাড়ির লোককে খবর দিয়েছে যে লোকটা বেঁচে আছে। কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না সে। এদিকে রিমঝিমও অস্থির হয়ে পড়েছে। অ্যাম্বুলেন্সের লোকটা এসে বলছে দাদা কখন যাবেন। তাকেই বা কি বলবে সৈকত? পেশেন্ট এখন ডেড বডি হয়ে গেছে, অ্যাম্বুলেন্সের বদলে দরকার শববাহী গাড়ি! আর ডাক্তার যা শুনিয়ে গেল এ তো পোস্টমর্টেমের কেস। এবার তো পুরোপুরি ফেঁসে যাবে সৈকত। ইতিমধ্যেই মাছিরা ভনভন করতে শুরু করে দিয়েছে চারিদিকে। কেউ বলছে দাদা আপনাকে তো থানায় যেতে হবে। ড্রাইভারটাও এক্সট্রা হাজার খানেক টাকা চাইছে। ডেড বডি আছে, তাই ওকে নাকি পুরো গাড়িটাই ধুতে হবে। সৈকত পুরোপুরি পাস্ল। ইতিমধ্যে যেন ভগবানের দূতের মতো উদয় হয় এক হাসপাতাল কর্মচারীর। সৈকতকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে বলে ওর সাথে ভিতরে যেতে। লোকটার কথায় কি যেন একটা ছিল। অগ্র পশ্চাদ না ভেবে লোকটার পিছু ধরে সৈকত। ভিতরে কারো সাথে কথা বলে একটা ট্রলি বেড নিয়ে বেরিয়ে আসে সে। তারপর ওকে নিয়ে আবার যায় গাড়ির কাছে। সৈকতের সাহায্য নিয়ে বডিটাকে বের করে নিয়ে আসে ট্রলিতে। তারপর ঠেলতে ঠেলতে ঢুকিয়ে দেয় ভিতরে। পিছন পিছন যেতে যেতে সৈকত বুঝতে পারে পৌছে গেছে মর্গে। কিছু টাকার বিনিময়ে সনাতনদার বডি ঢুকে যায় মর্গের খোপে। একটু আগের জলজ্যান্ত লোকটা কিভাবে যেন পরিণত হয় একটা লাশে। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে থাকে সৈকতের।
এদিকে সনাতনদার ছেলেও করে চলেছে ক্রমাগত ফোন। কি জবাব দেবে তাকে? ইশারায় কার ফোন জেনে সৈকতের কাঁপা কাঁপা হাত থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নেয় ওই লোকটা। আর স্বাভাবিক গলায় ফোনের ওপারে জানিয়ে দেয় সেই অমোঘ সত্যি। এরপর সৈকতকে বলে, “আপাতত ঘন্টা তিন চারেক আপনার এখানে কোন কাজ নেই। আপনি বরং হোটেলে চলে যান। আমি আপনার নাম্বারটা নিয়ে রাখছি। ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়ার টাইমে আপনাকে ডেকে নেব।
এরপর কেটে গেছে প্রায় চব্বিশ ঘন্টা। হোটেলের ম্যানেজারের ঠিক করে দেওয়া ড্রাইভারকে সাথে নিয়ে ওরা ফিরছে বাড়ির পথে। দেবদত্ত নামের ওই মানুষটিকে ফিরে আসার আগে কিছু টাকা দিতে যায় সৈকত। কিছুতেই রাজি হয় না সে, “বলে, আপনি আমার জায়গার অতিথি। এই জিনিস আপনার রাজ্যে ঘটলে আপনিও কি একইভাবে সাহায্য করতেন না আমাকে?”
খটকা লাগল সৈকতের। সত্যিই কি এরকম নিঃস্বার্থ উপকার করতে পারত সে। ধীরে ধীরে সন্ধ্যে নেমে আসে। ওরা ঢুকে পড়ে রাজ্যের সীমানায়।
©Ayan
রচনার তারিখ: ২১শে জুলাই ২০২৪






0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন