ছোট গল্পের সন্ধানে || কলমে অয়ন


Best Bangla Books to Buy in 2024

#গল্পদিদার আসর#

গল্পদিদার আসর

অনেকদিন ধরেই মায়ের কাছে মামারবাড়ি যাওয়ার আব্দার করছে অভি। ৬ মাস হল ওরা পুরনো বাড়ি ছেড়ে এসে উঠেছে তথাকথিত সাউথ মানে গড়িয়া এলাকার একটা ফ্ল্যাটে। অভির আর কি দোষ, সারাদিন সুমন আর সুমি কাজের সুত্রে বাইরে। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতই হয়ে যায় প্রায়। ঘরে সন্ধ্যা মাসির কাছেই অভির দিন কাটে। পুরনো বাড়ির নোনা ধরা দেওয়াল থেকে সুমিরা মুক্তি পেলেও ফ্ল্যাটের জীবন যেন অভির কাছে খাঁচার পাখির জীবন। না আছে ঠাম্মার সাথে দুপুরে গল্প শোনা, না আছে দাদুর বিছানায় বসে রেডিওর খবর শোনা।

এমনিতে ওই উত্তর কলকাতার শরিকি বাড়িতে কোনোদিনই ভালো লাগত না সুমির। কিন্তু যতদিন শ্বশুর, শাশুড়ি ছিল তাও একটা মায়া ছিল বাড়িটায়। তথাকথিত শাশুড়ি বউমার জাঁতাকলে কোনোদিনই পড়তে হয়নি সুমিকে সেটাও বোধহয় ওই টানের আর একটা কারণ। ওর শাশুড়িরও ফ্ল্যাটের শখ ছিল খুব, তাই সুমিকে ইন্ধনও যোগাত মাঝে মাঝে। কিন্তু বছর খানেক আগে কিছুটা হঠাৎই প্রথমে শাশুড়ি আর তার কিছু মাসের মধ্যে শ্বশুর মারা যান। তারপর থেকেই আরও যেন এই বাড়িটা গিলে খেতে আসত ওকে। জন্ম ভিটের টানে হোক বা পাড়ার রবিবারের আড্ডা, সুমন খুব একটা ইচ্ছুক ছিল না অন্য কোথাও যেতে। যদিও ওর অফিসের বোস দার থেকে এই ফ্ল্যাটের খবরটা এনেছিল ওই। বেশ সস্তায় পেয়ে যাচ্ছিল বলে তাড়াতাড়ি লোন নিয়ে ব্যবস্থা করে ফেলে ওরা। এই ছমাস হল আস্তানা গেড়েছে এই নতুন পায়রার খোপে।

ক্রিং ক্রিং!! একদিন দুপুরের দিকে বেল বাজল ফ্ল্যাটের দরজায়।

সন্ধ্যা যথারীতি বিরক্ত হয়ে গেট খুলতে যায়। এ এক নতুন ঝামেলা হয়েছে, প্রায়শয়ই দুপুরের দিকে বিভিন্ন হকারের আনাগোনা। মনে মনে ভাবে, দাদা কে বলতে হবে এর কিছু ব্যবস্থা করতে। নাহলে সারাদিন খাটার পর দুপুরে অভি ঘুমোলে যে একটু রেস্ট নেবে, তার উপায় নেই। এই তো চারটে বাজলেই আবার শুরু হবে টিফিন করা, ছেলেকে তোলা। এরা বাপু পারেও বটে, সারাদিন অফিস করবি যদি, ছেলেমেয়ে করেছিস কেন। সন্ধ্যার তো সেই কোন জন্মে ছেলেটা বন্যায় জলে ডুবে মারা গেছে। তাও এখনো মাঝে মাঝে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে পুরনো স্মৃতির ভারে। বিশ বছর ধরে এভাবেই কাটিয়ে দিচ্ছে লোকের বাড়িতে কাজ করে। যদিও দাদা বউদি খুবই পছন্দ করে ওকে। কখনো কাজের লোক ভেবে উঁচু গলায় মেজাজ দেখায় না। তাই ও মনে মনে ভেবে নিয়েছে, এরা না তাড়ালে যাবে না কোনোদিন।

দরজা খুলে দেখে একটা বুড়ি, হাতে ময়লা একটা ব্যাগ।

“না না কিছু লাগবে না গো” দরজা টা বন্ধ করতে যায় ও।

“আরে ও মুখপুড়ি, তোর লাগবে কেন আমার লাগবে। মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে কেউ? বিয়ের আগে এই শিক্ষা পেয়েছিস? সমুর বউ এরকম জানলে কক্ষনো আসতাম না।”

“দাঁড়াও দাঁড়াও, কে সমু? এখানে ওই নামে কেউ থাকে না। দাদার নাম সুমন আর বউদির নাম সুমি। আর কি আজে বাজে বকছ?”

“আরে ওই হল, অত কি আর মনে থাকে আজকাল। নে ধরত দেখি আমার ব্যাগ খানা। এই বয়সে আর এত ভারী বওয়া যায়!” বলতে বলতেই চৌকাঠ পেরিয়ে সে ঢুকে পড়ল।

“আরে কি করছ টা কি? এখানে না বলে কেউ ঢুকতে পারে না। আমাকে দাদা বউদি কিছু বলে যায়নি।” বলতে বলতেই সুমিকে ফোন করতে থাকে সন্ধ্যা। দুপুরে এই বুড়ির বাতুনি শুনে মাথাটা ধরে গেল।

“ও, এবার বুঝেছি। তুই এদের ঝি। তাই বলি সমুর বউ কি এরকম হবে। সমুকে বল তোর গল্প দিদা এসেছে, তাহলেই বুঝবে।”

“বউদি, একজন এসেছে, বলছে দাদার গল্প দিদা। বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়েছে।“

“এরকম তো কারোর কথা শুনিনি? দাঁড়া, দাদা কে ফোন করি একবার।”

“ও, আর একটা কথা, দাদার ডাকনাম কি সমু? ও বুড়ি তো এই নামেই ডাকছে।”

“হুম! ওর মা ই বেশি ডাকত ওই নামে। আমি সুমনের সাথে কথা বলে ফোন করছি তোমাকে। ততক্ষণ ওনাকে ড্রয়িং এই বসিও। ভিতরে ঢুকতে দিও না, দিনকাল খুবই খারাপ।”

ফোন রেখে দেখে বুড়ি অলরেডি সোফায় গা এলিয়ে দিয়েছে। ওকে দেখে বলল, “যা বৃষ্টি পড়ছে, একটু চা কর তো দেখি, তা কি নাম তোর?”

“সন্ধ্যা।” বলতে বলতেই বউদির ফোন।

“শোনো, আমি ফিরছি তাড়াতাড়ি। ততক্ষণ পর্যন্ত যেমন বললাম করো। চা, জলখাবার দিও আর অভি কে বেশি কাছে যেতে দিও না। দাদার ওই নামে এক দিদা ছিল যদিও দাদা বহুয়ুগ তাকে দেখেনি বা ওদের সাথে কোন যোগাযোগ নেই। যাইহোক, একটু সাবধানে থাকো। আমি আসছি।”

“ঠিক আছে।” মনে মনে একটু অস্বস্তি হতে থাকে ওর। কি জানি কি মতলবে এসেছে। এদের রান্নাঘর টা ওপেন, তাই বসার জায়গা থেকে দেখতে পাওয়া যায়। চা করে নিয়ে এসে দেখে বুড়ি ঝিমোচ্ছে।

“ও দিদা, চা নাও।” শুনে একটু ঝেড়ে ওঠেন উনি। একথা ওকথার মধ্যে দিয়ে জেনে নেয় এদের বাড়ির সব তথ্য। সন্ধ্যার জীবনের গল্পও শোনেন মন দিয়ে। সন্ধ্যা বলে, তোমার নাম কি দিদা?

“পারুল বালা, আমার বাবা ডাকতেন পারুল বলে। অনেকদিন পর নিজের নাম টা বললাম, শেষ সেই বলেছিলাম ওই কিসব কার্ড বানাতে এসেছিল পাড়ায়।”

ইতিমধ্যে কখন যেন অভি ঘুম থেকে উঠে পড়ে দরজার আড়াল থেকে ওদের কথা শুনছিল। এবার এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করে, “তুমি কে গো? আগে তো দেখিনি কোনোদিন?”

“আমি গল্পদিদা। আমি তোমাদের পুরনো বাড়িতে যেতাম।”

“দাদুর বাড়িতে? যেখানে নিচে বেড়াল শুয়ে থাকতো?”

“হুম, যেখানে ছাদে যাবার ঘোরানো সিঁড়ি ছিল। বড় বারান্দা ছিল। একটা আরামকেদারাও ছিল তোমার দাদুর।”

একটু পরে সুমি বাড়ি ফিরে দেখে, মাটিতে বসে গল্পে মশগুল এক বয়স্ক মহিলা আর অভি। ও ঢুকতেই ওকে এসে জড়িয়ে ধরে বলে, মা এই হল গল্পদিদা। আমাদের পুরনো বাড়িতে যেত। কত গল্প শুনলাম ওর থেকে। তুমি দেখেছ ওকে আগে?

ততক্ষণে দিদা চলে এসেছে সুমির সামনে। থুতনির সামনে ধরে নতুন বউয়ের মত আদর করে বলে, “বাঃ, আমাদের সমুর পছন্দ আছে বলতে হবে। কি টুকটুকে বউ এনেছে।” অপরিচিত কারোর মুখে বিয়ের এত বছর পর এসব শুনে লজ্জায় রাঙ্গা হয়ে যায় সুমি।

টুক করে প্রণাম করে বলে, “দাঁড়ান, আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি।”

একটু পরে এসে অভিকে পড়ার ঘরে পাঠিয়ে দিদাকে একটু পুরনো জিনিস জিজ্ঞাসা করে জানার চেষ্টা করে ওনার আসার উদেশ্য। মোটামুটি যা জানতে পারে, কদিন আগে সন্ধ্যের দিকে সুমনকে ফ্ল্যাটে ঢুকতে দেখে চেনা চেনা লাগে ওনার। পিছন পিছন এসে ফ্ল্যাট টা দেখে যান উনি, ভাবেন একদিন এসে চমকে দেবেন।

আট টার পর সুমন ফিরলে দেখে সবাই মোটামুটি এক বয়স্ক মহিলা কে ঘিরে গল্পে মত্ত।

দিদা বলে। “কিরে সমু চিনতে পারছিস? তোর এই সন্ধ্যা থেকে শুরু করে বউ পর্যন্ত কেউ কিন্তু এখনো পুরোপুরি বিশ্বাস করেনি আমায়। তোর কাছেই শেষ চেষ্টা।”

“কেমন আছ?” মুখে বললেও মনে মনে সেই গল্প দিদার অবয়বটা যেন খুঁজেই পেল না ও। কিন্তু কথা বলার ভঙ্গিটা একইরকম মনে হল।

“তোদের কত গল্প শুনিয়েছি ছোটবেলায়। অভি, তোর বাবা তো আমি এলে তাড়াতাড়ি লেখাপড়া করে নিত যাতে বেশি করে গল্প শুনতে পারে।”

রাতে খাওয়ার পর গল্প দিদা বলল, “শোন সমু, কাল দুপুরে খেয়ে আমি চলে যাব। তোদের দেখে কি যে ভালো লাগছে। যেন আরও কটা দিন বাঁচার ইচ্ছে বেড়ে গেল।”

“সেকি? কালই চলে যাবে। কটা দিন থাকো না।” সঙ্গে সঙ্গে বায়না জুড়ল অভিও।

“নারে দাদুভাই। এবার যাই, এবার তো তোদের বাড়িটা দেখতে এসেছিলুম। পরের বার এসে এক মাস থেকে যাব। দেখ না এই ছোট ব্যাগে কি আর বেশি জিনিস আনা যায়?”

“ঠিক আছে, তোমার ঠিকানা টা এখানে লিখে রাখ, পরের বার আমি গিয়ে নিয়ে আসব।”

পরদিন সকালে উঠে যে যার মত টাইমে বেরিয়ে গেল। আজ ভোর থেকে উঠে দিদা ওদের জন্য রান্না করেছে শুনল। দুপুরের দিকে দিদাও চলে গেল কথামত। যাওয়ার আগে সন্ধ্যার হাত ধরে ওদের সবাইকে আগলে রাখতে বলল। একদিনের ঝটিকা সফরে ফ্ল্যাটে একটু দমকা হাওয়া এসে লেগেছিল। আবার সব চলবে নিজের গতিতে ঘড়ির কাঁটা ধরে।

কদিন পরেই মহালয়া। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে সুমন বলল গল্পদিদার জন্য একটা পুজোর শাড়ী কেনার কথা। সুমি বলল, আমিও এটাই ভাবছিলাম। কাল আমি অফিস ফেরতা কিনে আনব, তুমি পরের দিন ফেরার পথে দিয়ে এস। সেইমত দুদিন পর সুমন অফিস ফেরতা এল দিদার ঠিকানায়। শিয়ালদার ঠিকানা টা খুঁজে পেতে বেশ কালঘাম ছুটল ওর।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ওই ঠিকানায় এরকম কেউ কোনোদিনও ছিল না বলে শুনল। ফোনে কিছু না বলেই বাড়ি ফিরল ও। সুমিকে সব বলতে প্রথমে বিশ্বাস করতে চাইল না। তারপর সুমি চারদিক তন্য তন্য করে খুঁজতে থাকল কিছু হারিয়েছে কিনা বোঝার জন্য।

কিছু না হারালেও ড্রয়ারের মধ্যে সুমন পেল হাতে লেখা একটা চিরকুট, “ভালো থেকো তোমরা।” হাতের লেখা টা ওর খুব চেনা, ওর মায়ের। পিছনে এসে কাঁধে হাত রাখল সুমি।

কাল মহালয়া। পিতৃপক্ষের অবসান, দেবীপক্ষের সূচনা। গঙ্গায় তর্পণ করতে যাবে বলে মনে মনে স্থির করে সুমন।

©Ayan
 

Share:

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মোট পৃষ্ঠাদর্শন

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Blogger দ্বারা পরিচালিত.