দৃশ্য ১
আবার একবছর পর বাবার দোকানে বিক্রি হচ্ছে ভালই। আসলে বাবার দোকান বলতে, বাবা
ওই দোকানের কর্মচারী মাত্র। অনলাইন ক্লাসের দৌলতে আর পাড়ার ক্লাবের দাদাদের
সাহায্যে নতুন মোবাইল ও ইন্টারনেট এসেছে হাতে। এবার বাবাকে আর জামা দিতে বলব না,
বরং মায়ের জন্য আনতে বলব একটা লাল পাড় কাপড়। আগেরবারে আব্দার করেছিল মা। কিন্তু
গতবারের মন্দার কারণে বাবার আর দেওয়া হয়নি ওটা।
তাই এবার ওই শাড়িটাই পরিয়ে দেব মায়ের ছবিতে। মা ও যে অভিমানে হঠাৎ চলে গেল
পঞ্চমীর ভোরেই।
দৃশ্য ২
ঠাকুমা বলেছিল, মেয়েদের জন্মদিন পালন করতে নেই। কিন্তু মা বাবা ওসব কথায়
পাত্তা দেয়নি কোনোদিন। প্রথম থেকেই পালন করেছে এই শুভ দিনটা। এবার আবার আঠারো
হাওয়ার পালা। কিন্তু এই প্রথম ষষ্ঠীর দিনে পড়েছে মেয়েটার জন্মদিন। ওই দিন তো ছেলে
মেয়ের কল্যানের জন্য উপোষ করতে হবে মা কে। আর মাকে ছাড়া পালন করবে কিভাবে এই
দিনটা।
বাবার সাথে প্ল্যান করে ষষ্ঠীর ভোরেই সদলবলে রওনা হয় মুকুটমনিপুর। বাড়ির বাইরে
ষষ্ঠীর নিয়ম চলবে না যে।
দৃশ্য ৩
সেজে গুজে ঘুরতে যাওয়া ছিল মেয়েটার প্রতি বছরের সপ্তমীর নিয়ম। এই দিনটা ছিল
অনির্বাণের জন্য বরাদ্দ। আজও এই মধ্য চল্লিশে এই নিয়মের ব্যাতয় হয় না কোনো। কেউ
কেউ আড় চোখে তাকালেও কিছু বলার সাহস পায় না।
কাউকে না পেলে একলাও বেরিয়ে পড়ে অন্তত এই দিনটায়, শুধু অনির্বাণ সাথে থাকে না আর।
দৃশ্য ৪
রায় বাড়ির দুর্গা মন্ডপ। চারিদিকে হইহল্লা, আনন্দের আয়োজন। মাঝখানে চলছে
অঞ্জলির প্রস্তুতি। রায় মশায় আজ বড়ই অবসন্ন। বাড়ির একমাত্র ছেলে প্রতিবার এই সময়
বিদেশ থেকে এলেও এবার আসতে পারবে না জানিয়েছে, প্রথমবার।
অঞ্জলির আগেই ট্যাবে আসে ছেলের ফোন। “ঠাকুরের দিকে ক্যামেরা টা ধরো, অঞ্জলি
দেব তো।” রাশভারি রায়মশায়ের আনন্দাশ্রুর সাক্ষী থাকে গোটা পরিবার।
দৃশ্য ৫
সারাবছর গাধার খাটুনি খাটলেও পুজোর সময় অনুপমকে ব্যাঙ্গালোরে আটকাতে পারত না
কেউই। কিন্তু এবার আরথির টানে রয়ে গেছে দুদিন, পাড়ি দিয়েছে মুম্বাই। মুম্বাইয়ের
আরথির সাথে মাস ছয়েকের প্রেম শুরু।
নবমীর দিন উবের করে এয়ারপোর্ট থেকে বাড়ি ফিরছে ও। সিগনালে দাঁড়ানো বাচ্ছা টার
কাছ থেকে পুরো শিউলির ডালাটাই কিনে নিয়ে এগিয়ে দেয় আরথির দিকে, বানিজ্য নগরী থেকে
লুট করা সৌন্দর্য কে সাজিয়ে দেয় শরতের উপহার। আর বাড়িতে অপেক্ষা করে আছে নবমীর
পাঁঠার মাংস, নবমীর আপ্যায়নে কোন ত্রুটি থাকে না আর।
দৃশ্য ৬
দশমীর বিকেলে তীব্র হুড়োহুড়ি। ভাসানের জন্য মুটে পাওয়া যাচ্ছে না। এখনো অনেক
পুরনো বাড়ির রীতি অনুযায়ী ঠাকুর বিসর্জন হয় এই মুটেদের কাঁধে চেপেই। শেষকালে পাওয়া
যায় একদলকে, তাড়াতাড়ি নতুন গামছা কাঁধে দিয়ে তুলে ধরে প্রতিমাকে।
যাওয়ার পথে টুক করে বলি, কি ব্যাপার তোমাদের আজকাল পাওয়া যাচ্ছে না কেন?
হাসিমুখে বলে, এবার ভালোই আমদানি হয়েছে। আগেরবার তো দুবেলা খাবারও জুটত না ঠিক
করে, এবার সেখানে দুবেলাই ভোজ পেয়েছে পরিবার।
মাথা নত হয়ে আসে নিজেদের কামনা বাসনার প্রতি ঘৃণায়। বিদায় বেলায় দেবী অল্পেতে
সন্তুষ্ট হওয়ার শিক্ষা দিয়ে যান।
©Ayan






0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন