একদা সেদিন ছিল। এক কামরা ঘর ছিল। অনেক আয়োজন ছিল। ঘর ভরা লোক ছিল। পরীক্ষার চাপ ছিল। তবুও আনন্দ ছিল। ছোট্ট একটা ছাদ ছিল। কুলুঙ্গিতে পায়রা ছিল। ভিয়েনে তৈরি মিষ্টি ছিল। পেট ভরে খাওয়া ছিল। চেপে চুপে শোয়া ছিল। দুয়ারে খিল ছিল। লোডশেডিং এর রাত ছিল।
এবছর বাড়ির অন্নপূর্ণা পুজোর ৩৫ তম বর্ষ যাপন ছিল। সময়ের অলিন্দে ফিরে গেলাম বছর পঁচিশ আগে। পুজোর আগের দিন থেকেই বাড়ি পুরো জমজমাট। শুধু আমার পিসি, মাসিরা নয়, আসত বাবার পিসি মাসি ও তাদের পরিবারও। বছরে সেটা ছিল যেন এক মহামিলন। বছরের পর বছর সেই অনিল দাদু আসত ছেলে বা নাতি কে নিয়ে গ্রাম থেকে ঢাক বাজাতে। চিরকালীন ফুটো কপালের দৌলতে আমার ঠিক একটা না একটা পরীক্ষা বাকি থাকতই অধিকাংশ সময়ে। এমনকি জয়েন্ট ও দিয়েছি পুজোর দুই দিনেই। কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও সকলকে একসাথে পাওয়ার আনন্দ ছিল অন্যরকম। যদিও আজকাল আর অনিল দাদুর পরবর্তী প্রজন্ম আসে না বাজাতে।
আমাদের ঘরের পাশে ছোট ছাদে বাউন ঠাকুর আগের দিন থেকেই রান্নাবান্না শুরু করে দিতেন। ভিয়েনে তৈরি হত গরম মিষ্টি। তাকেই দেখেছি জন্ম ইস্তক পুজোর রান্না করতে। যদিও অন্য কোনো অনুষ্ঠানে তাকে দেখা যেত না। বড় দাদু বলতেন, ও ব্যাটা শুধু নিরামিষ আর মিষ্টি রাধঁতে পারে। কিন্তু সত্যি বলছি ওর মতো ধোঁকার স্বাদ অন্য কোথাও পাইনি।
ভোর রাত থেকে পুজোর জোগাড়ে মা জ্যেঠিমারা ব্যস্ত হয়ে পড়ত। ঠাকুর মশাই আসত আমাদের দেশের বাড়ি থেকে। আজও আসে তাদেরই পরবর্তী প্রজন্ম। তখন পাড়ায় পাড়ায় এত অন্নপূর্ণা পুজো হতো না। তাই অনেক দূর থেকেও লোকজন আসত কুমারী পুজো করতে। আর এত লোকজনের পুজো সামাল দেওয়ার জন্য একাধিক ছোট্ট মিষ্টি কুমারীরা আসত, তাদের আবার সাজিয়ে গুছিয়ে রেডি করত কিছু সিলেক্টেড লোকজন, যারা তখনকার দিন অনুযায়ী সাজানোয় পারদর্শী ছিল। তারপর পুজো শেষে তাদের পাওনা গন্ডা বুঝিয়ে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার পালা। এই সময়ে আমাদের বোন দিদিদের বেশ হিংসা করতে দেখতাম। কুমারীদের পাওয়া সাজগোজের জিনিসে ওদের লোলুপ দৃষ্টি ছিল দেখার মত। আর মনে মনে কামনা করত পরের জন্মে ব্রাহ্মণ ঘরে জন্মানোর।
দুপুর গড়াতে না গড়াতেই দাদুর হাঁক ডাকে শুরু হয়ে যেত গরম লুচি ভাজা। সেই সুন্দর ঘিয়ের গন্ধে চারদিক মম করত। বাড়ির সব থেকে ছোট বাচ্চাদের পরিবেশনের কোচিং শুরু হত এখানেই, জল দেওয়া থেকে। তার মধ্যেই কারোর না কারোর ভাঁড় ফুটো থাকতই আর সেই জল গড়িয়ে বেরোত টেবিলের তলা দিয়ে। আর হ্যাঁ, এই ভাঁড় ফুটো আছে কিনা তার একটা চেকিং ও চলত জলের বালতিতে ভাঁড় ডুবিয়ে। বাড়ির বেশিরভাগ মেয়ে বউ দের থাকতো উপোস। তাই জ্ঞাতি পরিজনদের খাওয়া দাওয়া মিটতেই ঘড়ির কাঁটা দুপুর পেরিয়ে বিকেলের দিকে।
ইতিমধ্যেই আরেকটা জিনিস হত, যা এখনো হয় আমাদের বাড়িতে। ধুনো পোড়ানো, ঠাকুরের সামনে মালসা মাথায় আর দু হাতে নিয়ে আহুতি দেওয়া। তারপর বাড়ির ছোট্ট থেকে বড় সবাই কোলে বসে দেবী মাকে প্রণাম করে। তারপর শুরু হয় একশো আট টা প্রদীপ জ্বালিয়ে সন্ধ্যা পুজো। সব শেষে হয় সন্ধ্যা পুজোর আরতি। সারাদিনের পুজোর সমাপ্তি ঘটে হোমের মধ্যে দিয়ে।
পুজোর প্রণালী তে রকম ফের না হলেও সংখ্যাতত্ত্বের হিসাবে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আগে যেখানে দুশো তিনশো লোকের পাত পড়তো এই কদিনে, সেখানে এখন তা নগন্য মাত্র। সাথে সাথেই কমেছে লোকবল। তাই অনিচ্ছাকৃত কাটছাঁট করতে হয় অনেক উপকরণে। আগে পুজো হত দোতলার দালানে, আমাদের আর জ্যেঠুদের ঘরের মাঝে। আর এখন হয় নিচে পুজোর ঘরে। আর এই ঠাকুর আজীবন গড়ে এসেছে আমার জ্যেঠু নিজের হাতে। ছোট বেলায় আমাদের পাল বাড়ির ঠাকুর দালানে গড়তে থাকা দুর্গা প্রতিমা, যা পাল বাড়ির অভয়া মা নামেই বিখ্যাত। সেই ঠাকুর গড়া দেখতে দেখতেই ঠাকুর তৈরিতে নিপুণ হয়ে ওঠেন আমার জ্যেঠু। তাই বাড়ির পুজোর ঠাকুর এখনও জ্যেঠুই করেন।
যাইহোক, আবার ফিরে যাই সেই আগের সময়ে। সন্ধ্যায় সবার একটু মাঞ্জা দেওয়ার পালা। আত্মীয়দের সাথে সাথে নিমন্ত্রিত থাকত পাড়া প্রতিবেশী, বন্ধু বান্ধব ও তাদের পরিবার। একসাথে একটা সন্ধ্যে কিভাবে যে কেটে যেত কে জানে।
রাতের খাওয়া দাওয়ার পর আরেকটা পর্ব শুরু হত সব ঘরের মেঝেতে বিছানা পাতার। ঘরের অভাব থাকলেও সেই তেঁতুল পাতায় নজনের জায়গার অভাব হত না কোনোকালেই। কালের ব্যবধানে জায়গা বেড়েছে বটে, কিন্তু লোকজন কমে গেছে অগুন্তি। সময়ের জাঁতাকলে শুধু ছুটেই চলেছি সবাই।
পরের দিনের পর্ব শুরু হত দাদুর আনা জলখাবার দিয়ে। আর সেদিন টা থাকত মূলত খেলাধুলোর। মাঝে একবার পুজোর শেষে ঠাকুরের ফুল নিয়ে আসা।
দুপুরের পর্বে থাকতো মাছ ভাতের ব্যবস্থা। প্রতিবেশীরাও একসাথে থাকত এই জোগাড় যন্ত্রে। এরপর কিছু দূরের দলের ঠিক থাকত বাড়ি ফিরে যাওয়ার। আর আমাদের শুরু হতো জুতো লুকানো। কত লোকে যে আমাদের আব্দার মেনে থেকে যেতে বাধ্য হত আরো কয়েকটা দিন, তা আজকের এই ঘড়ি ধরে চলার যুগে যেন প্রাগৈতিহাসিক ঘটনা বলে মনে হয়। তবে তাতে প্রাণ ছিল অনেক বেশি।
সন্ধ্যার দিকে পাড়ার লোকজনের উপস্থিতিতে বাড়ির গুরুজনেরা মিলে শুরু হত বরণের পর্ব। "আবার এসো মা, আসছে বছর আবার হবে", এইসব বার্তায় মুখরিত হয়ে থাকত চারিদিক। আর গ্যাস লাইটের আলোয় ট্রলি ভ্যানে চেপে মা পারি দিতেন অমৃত ধামে। সাথে যেতাম আট থেকে আশির পুরো পরিবার।
বিসর্জনের বিদায় বেলায় মন খারাপ হয়ে যেত সকলের, তবু আজকের দিনে সেই মন খারাপকে দূরে সরিয়ে দেবী রেখে যেতেন আগামী বছরের অন্নের সংস্থান। আজ সেই সব সুখ স্মৃতি উস্কে দিলাম সকলেরই। হয়ত স্মৃতিলোপের জীবনে এগুলোই হয়ে উঠবে কালের ধারাবিবরণী।






0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন