ফেরার টাইম হয়ে গেছে, এখনো এলো না মেয়েটা। রোজ এই সময়ে জানলার পাশে ঘেঁষে বসে। উঁকি মেরে দেখে গলিতে ঢুকল কিনা। শারীরবৃত্তীয় প্রবৃত্তি গুলো আজ টাইম টেবিলে বন্দি। এত বড় হয়ে গেছে, এত দিন ধরে চাকরি করে একা হাতে সংসার টাকে ধরে আছে মেয়েটা, তবুও আশঙ্কা যায় না সুবীরের। আর যা দিনকালের অবস্থা আজকাল, বাড়িতে না ফেরা পর্যন্ত নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না। আগে যদিও সময়ে অসময়ে ফোন করে খবর নেওয়া যেত, কিন্তু যতদিন এই টাচ ফোন দিয়েছে কি যেন বলে ওরা, স্মার্ট ফোন না কি! এটা আরো অসহ্য হয়েছে ওর। আর তার ওপর মেয়েও আজকাল পছন্দ করে না ওই সব সময়ের তদারকি। তাই ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে।
একবার ওর জন্মদিনে মেয়েই দিয়েছিল এটা। ততদিনে ওর মা গত হয়েছে। বাপ মেয়ের এইসব আহ্লাদি মুহূর্ত দেখে যাওয়া হয়নি ওর মায়ের। আগে চিরকাল মেয়েকে আগলে রাখতে সোহাগের থেকে ওর বজ্র আঁটুনি ছিল যে মা মেয়ের চক্ষুশূল। সামনে রাগ দেখালেও বাবা না থাকলে মা কে সমঝে চলত মেয়ে। পাছে দু চার ঘা পড়ে যায় পিঠে, কারণ সেই সময়ে বাঁচানোর জন্যে বাবা যে থাকত না আশেপাশে। আর আজ পঙ্গু বাবার একমাত্র অবলম্বন সেই মেয়ে।
তখনও চাকরির অবসরের বছর দশেক বাকি। অফিস ফিরতি পথে একটা অ্যাক্সিডেন্টে পুরোপুরি শয্যাশায়ী হয়ে যায় সুবীর। কিছুদিনের মধ্যে হঠাৎ মারা যায় ওর স্ত্রীও। সদ্য গ্র্যাজুয়েট অন্য মেয়ে হলে হয়তো দিকভ্রান্ত হয়ে যেত। কিন্তু মেয়ে যে তার মায়ের মতই গুণবতী। প্রথমে টিউশন আর সুবীরের সঞ্চয়, তারপর ধীরে ধীরে একটা চাকরি। সাথে পার্ট টাইমে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া। মাস্টার্স কমপ্লিট করে এখন একটা বড় ফার্মে ঢুকেছে।
এভাবেই মেয়েকে আঁকড়ে বেঁচে থাকা। মাঝে মাঝে নিজেকে বড়ই অকর্মর্ণ মনে হয় সুবীরের। নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে করে, তারপর মেয়েটার মুখের কথা ভেবে নিজেকে সামলে নেয়। কদিন আগে রাগের মাথায় বলা মেয়ের কথা গুলো বুকে বাজে ওর।
"ছোট বেলায় যেমন শাসন করেছো তেমন অনেক উপহারও দিয়েছ। কিন্তু এখন দুটোই আর করার ক্ষমতা নেই তোমার।"
ও বেরিয়ে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ বসে ভেবেছে। সত্যি কথাই তো বলেছে মেয়ে। কিন্তু অভিমান কাটিয়ে শিখতে শুরু করেছে জীবনের নতুন ধারা।
আচমকা বেল বেজে ওঠে। কি আশ্চর্য, চাবি থাকে তো মেয়ের কাছে, নিজেই তো খোলে। আজ বেল বাজাচ্ছে কেন? তাহলে কি অন্য কেউ এলো? ভাবনার অবসান ঘটে স্বশব্দে।
"একটু দড়ির আংটা টেনে দরজা টা খুলতে পারো তো।"
"এত দেরী হল যে তোর!"
মেয়েই লোক ডাকিয়ে তৈরি করিয়েছিল এই দড়ি টেনে দরজা খোলার ব্যবস্থাটা এমার্জেন্সি সিচুয়েশনের জন্য। যাক, এইসব এখন বললে আরো খেপে যাবে। আসলে হাত ভর্তি জিনিস নিয়ে ঘরে ঢুকেছে যে।
টেবিলের সামনে সাজিয়ে দিয়েছে বাবার জন্য আনা শার্ট, ঘড়ি আরো কিছু। সঙ্গে দুজনের রাতের খাবার।
হুড়োহুড়ি করে বলে ওঠে, "তাড়াতাড়ি খাবে চলো, খুব খিদে পেয়েছে।"
টেবিলের নিচে থেকে মেয়েকে তুলে নিতে বলে বক্সটা। অনলাইন অর্ডার করার উপায় শিখে সদ্য কিনে আনা স্মার্ট ওয়াচটা তুলে দেয় মেয়ের হাতে।
"হ্যাপি ডটারস্ ডে"
দুজনেই জড়িয়ে ধরে দুজনকে। গড়িয়ে পড়তে থাকতে আনন্দের অশ্রুধারা।






0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন