ছোট থাকতে মনে হত কবে বড় হব, কবে নিজে উপার্জন করব। কিন্তু বয়স যত বাড়ছে, ততই ফিরে যেতে ইচ্ছে করে স্কুল জীবনে। ফেলে আসা কত স্মৃতি যে ভিড় করে আসে।
বেশ মনে আছে, শিক্ষক দিবসের দিনে সব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত নিয়মিত। দিন পনেরো আগে থেকেই চলত রিহার্সাল। গান আবৃত্তি নাটক থেকে শুরু করে অনেক কিছুই হয়ে থাকত। একসাথে হল ঘরে বেঞ্চ জড়ো করে মঞ্চ তৈরি থেকে শুরু করে সব চলত ক্লাসের মধ্যে দিয়েই।
আর এর সাথে ছিল সেদিনের স্পেশাল টিফিনের আনন্দ। আর কিছু ছেলেপুলের রোল কলের খাতা দেখে উপস্থিতির কাউন্ট ইচ্ছে করে বাড়িয়ে দেওয়া, যাতে শেষে পাওয়া যায় বাড়তি টিফিনের ভাগ।
কিছু কিছু ঘটনা যা হয়তো ভোলা যাবে না কোনোদিন। যদিও ঘটনা না বলে দুর্ঘটনাই বলা বেটার। তখন বোধহয় এইট কি নাইন। স্যারদের টেবিল চেয়ার থাকতো একটা উঁচু ডায়াসের ওপর ঠিক ব্ল্যাক বোর্ডের সামনেই। কে যেন সঞ্জয়কে (নাম পরিবর্তিত, এই বয়সে তাদের আর বিব্রত করতে চাই না) উস্কে দিয়েছিল এই বলে যে ওই ডায়াস ভাঙতে পারে কিনা, আর সেও অটোবার মোডে সেই ধ্বংস লীলায় মেতে উঠল। কিছুক্ষণ পর ডায়াসের সলিল সমাধির সাথে সাথে স্যারের আগমন আর কালপ্রিট কে খুঁজে না পেয়ে সারা ক্লাস কে নীলডাউন করে দেওয়া। বেশ একটা বিপ্লবী বিপ্লবী হাবভাব লাগত যে শত্রু পক্ষের হাত থেকে উদ্ধার করা গেছে সহযোদ্ধা কে।
আরেকটা মনে পড়ে, সেই ইলেভেনে বোধহয়। স্যার অঙ্ক করাচ্ছেন, খুব ভালো অঙ্ক করাতেন উনি। মোটামুটি শান্ত ক্লাসরুম। হঠাৎ ওঁর হালকা টাকে গুলতির মত স্যাট করে পিছন থেকে উড়ে এলো একটা রাবারের গার্ডার। স্যার অঙ্ক করাতে করাতে ঘুরলেন, তীব্র গতিতে ছুঁড়লেন একটা চক। লাগল মাঝের সারির সমীরের (নাম পরিবর্তিত) হাতে। বেচারা শুধুমাত্র স্যারের ঘুরে দেখার সময়ে মুচকি হাসছিল। কিন্তু ওই টিপ করার নূন্যতম যোগ্যতা ওর ছিল না। এত বছরে কোনোদিন ক্রিকেটে চান্স পায়নি সে। তবুও সারা ক্লাস স্যারকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছিল সেই সত্যিটা। বেশ মনে আছে, অকারণে প্রচুর মার খেয়েছিল সে।
এরকমই আরেকটা, টেনের অ্যাডিশানাল ম্যাথের ক্লাসে আমরা মাত্র ছয়-সাত জন ছাত্র ছিলাম। যিনি ক্লাস নিতেন, নতুন এসেছেন স্কুলে। ওই স্যারকে বুঝিয়ে সুজিয়ে রাজি করানো হল ক্লাসের শেষে স্কুলের ঠিক বাইরেই থাকা ঝালমুড়িওলার থেকে আমাদের এই জনা সাতেককে ঝালমুড়ি খাওয়ানোর। সবাই মোটামুটি ভালই ছিলাম পড়াশোনায়। এই ক্লাস টা লাস্ট পিরিয়ডে হত। স্যার শুধু বললেন, দেখিস, ব্যাপারটা যেন পাঁচ কান না হয়। আমরাও ততোধিক শয়তান, স্যার কে বললাম, তাহলে চলুন একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাই। সেদিন রাজি হয়ে গেটের কাছে এসে জাস্ট উনি অর্ডার দিতে যাবেন, একজন বলে উঠল, স্যার ওর ওই কাটা জিনিস গুলো ভাল লাগছে না দেখতে। চলুন না, বাস স্ট্যান্ডে ওই কচুরির দোকান থেকে টাটকা ভাজা কচুরি খাই। নিমরাজি হয়েই স্যার চললেন আমাদের সাথে। দুশো মিটার দূরে বাস স্ট্যান্ড, পৌঁছতেই তৃতীয় তীর বেরোয়। স্যার, এই তেলের জিনিস খেলে না আমার শরীর ভালো লাগে না। তার চেয়ে বরং কোল্ডড্রিঙ্ক খাই, এই গরমে মন ও ভরবে সবার। বাকি সকলেই হ্যাঁ তে হ্যাঁ মেলায়। আসলে এটাই ছিল সেদিনের ত্রিস্তরীও প্ল্যান। স্যারই বা কি বলেন, হয়ত বাধ্য হয়েই খাওয়ালেন। কিন্তু গোলমাল বাঁধল এর পরেই। এসবের মাঝে স্কুলের ছুটি হয়ে গেছে। অন্যান্যদেরও ক্লাস শেষ, তারাও এসে পড়েছে বাস স্ট্যান্ডে। আর স্যারকে বলছে, কি স্যার শুধু এদেরকে খাওয়াতে আনলেন। কেউ কেউ আবার অন্য স্যারদের কোচিং এও এইসব গল্প করে বেড়ায়। আর গল্পের গরু তো কোল্ডড্রিঙ্ক থেকে ততক্ষণে মোগলাই এ পৌঁছে গেছে। আর সেইসব নিয়ে স্যারকেও হয়ত শুনতে হয়েছিল টিচারস রুমের হাসি মস্করা। তাই পরদিন আমাদের পিঠে পড়েছিল বেশ কিছু স্কেলের চিহ্ন। অঙ্কের কোন ফর্মুলায় যে সেই স্কেলাঘাত আর কোল্ডড্রিঙ্কের দামের যোগ ছিল, তা আজও সেই কজনের কাছে রয়ে গেছে অজানা।
এরই সাথে ছিল সরস্বতী পুজোর পরে খাওয়া দাওয়া বিশেষত উদ্দাম রসগোল্লা খাওয়ার কম্পিটিশন।
এইসব সুখ দুঃখ হাসি কান্নায় বারে বারে ফিরে আসে সেই স্মৃতির শিক্ষক দিবস।
শিক্ষক দিবসের প্রাক্কালে আমার সমস্ত শিক্ষকদের জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম।






0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন