ছোট গল্পের সন্ধানে || কলমে অয়ন


Best Bangla Books to Buy in 2024

অপত্য স্নেহ

 

apotyo-sneho

আজ রবীন্দ্রসদনে প্রথমবার নিজের একক অনুষ্ঠান শুরু করতে যাচ্ছে।
বছর ত্রিশেক আগের কথা কোন এক দুপুর বেলায় ছোট্ট শিশুটা ডিডি বাংলার পর্দায় নাচের তালে তালে নেচে উঠছিল নিজের খেয়ালে। ঘরের এক কোণে তার মায়ের চোখে জল। নিজের ছোটবেলায় অনেক সাধ থাকলেও কোনদিনই নাচ শেখা হয়ে ওঠেনি যে তার মায়ের। অনেক স্বপ্ন ছিল নিজের মেয়েকে মন প্রাণ ভরে নাচ শেখাবে ও। বাচ্চা হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত ওর চেহারার গঠন এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় দেখে পাড়ার পিসিমা মাসিমারা এমনকি নিজের দিদি শাশুড়ি পর্যন্ত বলেছিলেন এই ঘরে মেয়েই আসছে। কিন্তু ওই যে বলে না বেশি স্বপ্ন দেখলে সেই স্বপ্ন কোনদিন পূর্ণ হয় না। পরের দিন পুণ্য লগ্নে এক ফুটফুটে সন্তানের জন্ম দিয়েছিল সে। বাড়ির সকলের আনন্দের শেষ ছিল না। কিন্তু হসপিটাল থেকেই তার চোখের কোণ দিয়ে বয়েই চলেছিল অশ্রুধারা। এই কষ্ট যে কারোর সাথে ভাগ করার নয়। সবাইকে আশ্বস্ত করেছিল এটা ওর খুশির কান্না বুঝিয়ে। কিন্তু আজ সত্যিই রণকে নিজের খেয়ালে নাচতে দেখে কোথাও সেই চাপা পড়া স্বপ্নটা মনের আকাশে উঁকি দিতে শুরু করেছিল। কিন্তু ভুল ভাঙলো দিনের শেষে, বলা ভালো চুরমার হয়ে গেল জীবনটাই। জীবনের স্বপ্ন সবার যে পূরণ হওয়ার নয়।
“কি? ছেলেকে নাচ শেখাবে? মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি? এসব মন থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলো। যদি চাও আর একটা বাচ্চা দিতে পারি। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করো সে যেন মেয়ে হয়। তারপর তোমার এই আদিখ্যেতা দেখিয়ো। আমার বাড়িতে থেকে ছেলেকে নিয়ে এসব নাটক চলবে না।” এটাই ছিল অদিতির স্বামীর প্রথম এবং শেষ রিঅ্যাকশন।
আপাত নিরীহ অদিতির মাথায় যেন খুন চেপে গেল। পুরনো স্বপ্নের সলিল সমাধি হতে দেখে আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারল না সে। কোথা থেকে যে মনোবল পেল জানে না, পরের দিন এক কাপড়ে ছেলেকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো সে। অনেক কষ্টে অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে অনেক লাঞ্ছনা গঞ্জনা মুখ বুজে সহ্য করে ছেলেকে নাচ শিখিয়েছে সে। ছেলের নিজস্ব ইচ্ছা থাকলেও ওর বন্ধুদের ও পাড়া প্রতিবেশীদের ‘লেডিস লেডিস’ তকমা শুনতে শুনতে এক সময় হাল ছেড়ে দিয়েছিল। একদিন স্কুল থেকে ফিরে মাকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিল, “তুমি কি নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আমাকে এভাবে সকলের সামনে অপদস্থ করছ? ছোটবেলা থেকে বাবার স্নেহটুকু পর্যন্ত পেতে দিলে না।”
অদিতি কিছু বলেনি সেদিন। মনে মনে নিজের অদৃষ্টকেই দোষারোপ করেছিল সে। নিয়তির অদ্ভুত পরিহাসে এক মারণ রোগে জড়িয়ে পড়েছিল ধীরে ধীরে। আর রণর কাছেও পিছন ফেরার সুযোগ ছিল না। মা কে দোষারোপ করলেও নাচটাই যে ওর একমাত্র ভালোলাগার ভালোবাসার জায়গা। ছোট থেকে অনেক কিছু না পেয়ে এই নাচের মধ্যেই খুঁজে নিত নিজের শান্তি। তাই রক্তের দোষ গুণে নাচের তালেই ঘষটে ঘষটে নিজেকে তৈরি করেছে রণ। ধীরে ধীরে তৈরি করেছে নিজের একটি নাচের স্কুল। আজ
সেই নাচের স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়েই নিজের প্রথম একক অনুষ্ঠান।
স্টেজে উঠে নৃত্যগুরুদের নমস্কার করার আগে প্রথমেই মায়ের ছবিতে মালা দিয়ে প্রণাম করে রণ। আর মনে মনে বলে, মা, আমাকে মাফ করে দিও। তুমি আমাকে সব কিছু দিলেও আমি কিছুই দিতে পারলাম না। তাই ছোটবেলার থেকে যেভাবে আগলে রেখেছিলে সেভাবেই আগলে রেখো।
©Ayan

রচনার তারিখ: ২৯ শে এপ্রিল ২০২৩

Share:

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মোট পৃষ্ঠাদর্শন

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Blogger দ্বারা পরিচালিত.

ব্লগ সংরক্ষাণাগার